২০১৮-১২-০৭ ১৭:২৩ বাংলাদেশ সময়

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আল্লাহর সৃষ্ট ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ বাদে যেসব প্রাণি সবচেয়ে বুদ্ধিমান হিসেবে প্রমাণিত তাদের মধ্যে ডলফিন, ওরাংওটাং, পিঁপড়া, শিম্পাঞ্জি, কাক ও কুকুরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এসব প্রাণির বাইরে বুদ্ধিমান ও ধূর্ত প্রাণি হিসেবে শিয়ালকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেকেই শিয়ালকে ‘পণ্ডিত হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। এই শিয়ালের পাণ্ডিত্য নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত রয়েছে। আজকের আসরে আমরা শিয়াল ও মুরগিকে নিয়ে দুটি গল্প শোনাব। এরপর থাকবে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরের এক নতুন বন্ধুর গানসহ সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্প শোনা যাক।

এক বাগানের একটি খাঁচায় একপাল মুরগিছানা থাকত ওদের মায়ের সঙ্গে। ওরা ছিল বেশ শান্ত-সুবোধ। কেউ কারো সঙ্গে কখনই ঝগড়া করত না। বাগানের কাছে একটি গাছের গুহায় থাকত এক ধূর্ত শিয়াল। মুরগি ও তার বাচ্চাগুলোকে যখনই দেখত, তখনই তার খুব লোভ হতোমনে মনে ভাবত, 'ইস, যদি ওদেরকে খেতে পারতাম!

একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাচ্চাগুলো দেখল, ওদের মা খাচায় নেই। প্রথমে ওরা ভাবল, মা বুঝি ওদের জন্য খাবার আনতে বাইরে গেছে। কিন্তু অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও মুরগি ফিরে না আসায় বাচ্চারা চিন্তিত হয়ে পড়ল। এরপর তারা দল বেঁধে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু বাগানের কোথায় মাকে খুঁজে পেল না। মাকে না পেয়ে কাঁদতে লাগল বাচ্চাগুলো।

ওদের কান্না শুনে রাস্তার পাশের গাছের পাতার নিচে ঘুমন্ত বুড়ো বাদুড়ের ঘুম ভেঙে গেল। সে নিচে তাকিয়ে মুরগির বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে বলল : ‘তোমরা যখন ঘুমিয়ে ছিলে তখন ওই শিয়ালটা বোধহয় তোমাদের মাকে ধরে নিয়ে গেছে। কাল শিয়ালটাকে বাগানের চারপাশে ঘুর-ঘুর করতে দেখেছি।'

বাদুরের কাছ থেকে এসব শোনার পর মুরগির বাচ্চারা বুঝতে পারল- শিয়ালই ওদের মাকে ধরে নিয়ে গেছে। তাই তারা ঠিক করল এক্ষুণি শিয়ালের গুহায় হানা দেবে।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। সবাই একটা করে লাঠি নিয়ে রওনা হলে শিয়ালের আস্তানার দিকে। পথে এক ভীমরুলের সঙ্গে ওদের দেখা হল। ভীমরুলটি জিজ্ঞেস করল: 'লাঠিসোটা নিয়ে এত হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছো তোমরা?' 

মুরগির বড় বাচ্চাটি জবাব দিল : 'পাঁজি শিয়ালটা আমাদের মাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা মাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি। তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে?' 

ভীমরুল বলল: ‘তোমাদের এ বিপদের দিনে আমি কি দূরে থাকতে পারি? ঠিকাছে চল- শিয়ালটাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে তোমাদের মাকে নিয়ে আসি।'

এরপর সবাই মিলে রওনা হলো শিয়ালের গুহার দিকে। পথে একটি বানমাছও ওদের সঙ্গী হল। ওরা যখন গুহায় পৌঁছুল তখন শিয়ালটি সেখানে ছিল না। ফলে বিনা বাধায় ওরা গুহায় ঢুকল। কিন্তু মুরগিকে সেখানে দেখা গেল না।

মাকে না পেয়ে মুরগির বড় বাচ্চাটি বলল : 'শিয়ালের সঙ্গে লড়াই করার ছাড়া মাকে খুঁজে পাব না আমরা। ভাই বানমাছ, তুমি দরজার পেছনে থেকো। আর বোন ভীমরুল, তুমি থাকবে গুহার কোণায়। আর আমরা সবাই বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে থাকব। শিয়াল এলেই ওকে আক্রমণ করব আমরা।'

মুরগির বড় বাচ্চার নির্দেশমতো সবাই যার যার জায়গায় অবস্থান নিল। কয়েক মিনিট পর শিয়াল এসে হাজির হলো গাছের কাছে। মুরগির গোশত খাওয়ার কথা ভাবতেই ওর জিভে পানি এসে গেল। গুহার দরজা খুলে ভেতরে পা বাড়াল সে। কিন্তু বানমাছের গায়ে পা পড়তেই পিছলে পড়ে গেল। তারপর যেই উঠে দাঁড়াতে চাইল অমনি ভীমরুল এসে তাকে হুল ফুঁটিয়ে দিতে লাগল সারা গায়ে। এ সময় মুরগিছানারা বেরিয়ে এসে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে মারতে লাগল শিয়ালকে।

মার খেয়ে শিয়ালের অবস্থা এমন হল যে, সে ঠিকমতো নড়তেও পারছিল না। সে মিনতি জানিয়ে বলল : 'তোমাদের অনুরোধ করছি, আমাকে আর মেরো না। তোমাদের মা ওইদিকের একটা খাঁচায় আছে। আমি কথা দিচ্ছি এমন কাজ আর কোনোদিন করব না। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও।'

শিয়াল অনেক কাকুতি-মিনতি করলেও কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না। সবার মার খেয়ে এক সময় শিয়ালটি মরে গেল। এরপর বাচ্চারা খাঁচা থেকে তাদের মাকে বের করে আনল। শিয়ালের হাত থেকে বেঁচে আসতে পেরে মুরগি খুব খুশি হল। বাচ্চাদের কাজে গর্বে তার বুক ভরে উঠল। মা আর তার বাচ্চারা বানমাছ ও ভীমরুলকে ধন্যবাদ জানাল ওদের সাহায্যের জন্য। তারপর সবাই খুশি মনে বাড়ি ফিরে গেল।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা শিয়াল ও মুরগিকে নিয়ে আরেকটি গল্প শুনব।

এক চাষি তার বাড়িতে মুরগি পালত। ওই বাড়ির পাশেই বাস করত একটি শিয়াল। মুরগি দেখলেই শিয়ালের জিভে পানি এসে যেত। আর তাই ধূর্ত শিয়াল প্রতিদিন মাঝরাতে চুপিসারে খাঁচায় ঢুকে একটি মুরগি খেয়ে ফেলত। অবশ্য আরও বেশি খেতে যে ওর লোভ হতো না তা নয়। কিন্তু মনে মনে ভাবত, যদি বেশি বেশি খেয়ে ফেলি তাহলে চাষি টের পেয়ে যাবে। আর তখনই আমাকে ধরার জন্য ফাঁদ পাতবে। তার চেয়ে বরং একটি করেই খাই। কথায় বলে না- অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। 

এভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর একদিন সকালে চাষি গেল খাঁচা থেকে মুরগি ছেড়ে দিতে। কিন্তু আশপাশে তাকিয়ে মাটির ওপর শিয়ালের পায়ের ছাপ দেখতে পেল। তার মনে সন্দেহ হলো, শিয়াল নিশ্চয়ই তার মুরগি খেয়ে ফেলেছে। তারপর সে খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে এক এক করে মুরগি গুনতে লাগল। কিন্তু একি? অনেক মুরগি কমে গেছে! চাষির আর বুঝতে বাকি রইল না যে, রাতের অন্ধকারে শিয়াল এসে মুরগি খেয়ে যাচ্ছে।

ওই দিনই চাষি শিয়ালকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাঁচার চারপাশে জালের ফাঁদ বিছিয়ে দিয়ে চাষি একপাশে ওঁৎ পেতে বসে রইল। এদিকে প্রতি রাতের মতো আজও শিয়াল এলো মুরগি ধরতে। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সে খাঁচার দিকে পা বাড়াল। আর অমনি চাষি ফাঁদ ধরে দিল টান।  মুহূর্তেই শিয়াল জালের ভেতর আটকা পড়ে গেল। শিয়ালকে হাতের মুঠোয় পেয়ে রাগে চাষির গা রি রি করতে লাগল। চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য সে শিয়ালের লেজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। তেলের পাত্রে একটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে শিয়ালের লেজে বেঁধে তারপর আগুন ধরিয়ে দিল। দেখতে দেখতে লকলক করে জ্বলে উঠল আগুন। শিয়াল সেখান থেকে পালানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। মুহূর্তে আগুন লেগে গেল ফাঁদ পাতা জালে। জাল পুড়ে যেতেই শিয়াল ছাড়া পেয়ে গেল।

এরপর প্রাণ বাঁচানোর জন্য দিশেহারা শিয়াল দিল ভোঁ দৌড়। লেজের আগুন নেভানোর জন্য সোজা চাষির ধানক্ষেতের মাঝ বরাবর দৌড়াতে লাগল। পাকা ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় শিয়ালের লেজের আগুন মুহূর্তেই লেগে গেল ধান গাছে। আর অমনি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। শিয়াল কোনোমতে জ্বলন্ত মাঠ থেকে বাইরে গিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর শিয়ালের লেজের আগুন নিভে গেল। পেছনে তাকিয়ে শিয়াল দেখতে পেল মাঠজুড়ে আগুন আর আগুন

অসহায় চাষি দূর থেকে তার ধানক্ষেত পুড়ে যেতে দেখে হতাশ হয়ে পড়ল। ধপ করে মাটিতে বসে সে বলতে লাগল : 'হায় হায়! শিয়ালকে শাস্তি দিতে গিয়ে আমার এতবড় শাস্তি হলো! আহা! শিয়ালটাকে এতবড় শাস্তি না দিয়ে যদি দু'চার ঘা লাগিয়ে দিতাম তাহলেই তো চুরি করে আমার মুরগি খেতে আসত না। লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিতে গিয়েই তো আমার এতবড় ক্ষতি হলো।'

বন্ধুরা, এ গল্প থেকে আমরা শিখতে পারলাম যে, লঘু পাপে গুরু দণ্ড ভালো নয়, এতে দণ্ডদাতারও ক্ষতি হতে পারে #

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য