২০১৮-১২-১৫ ১৯:২১ বাংলাদেশ সময়

বিশ্বব্যাপী আজ পরিবারের ভিত কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। আগের সেই মজবুত ভিতটা যেন নেই আর। পরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা তো একটি পরিবারকে বাইরে থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়ই, এর বাইরেও নৈতিক এবং আচরণগত সমস্যাও রয়েছে যা একটি পরিবারকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক প্রথাগুলো এসবের প্রভাবে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। সৌখিনতা ও বিলাসিতা এখন সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং এমন সব নতুন নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে যেগুলো নিয়ে আগে কেউ ভাবতোও না। আজকের আসরে আমরা পরিবারে বই এবং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। একটি শিশু ৬ বছর বা তারও বেশি বয়সে বই পড়তে শুরু করে। তবে বাসায় বই পড়ার চর্চা থাকলে বিশেষ করে বাবা-মা অন্তত ঘুমোনোর সময় কিংবা বিশ্রাম নেয়ার সময়ও যদি বই পড়েন তাহলে শিশুরা আরও আগে থেকেই বই পড়ার অভ্যাস করে ফেলতে পারে।

বাবা মায়ের উচিত এমন ধরনের বই নির্বাচন করা যা সন্তানদের বয়সের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এবং তাদের পছন্দসই হয়।সেইসঙ্গে যেসব বই বাচ্চারা পড়েছে সেগুলোর সঙ্গে বাবা-মায়ের পরিচয় থাকা ভালো। পাঁচ বছর বয়সের কম শিশুদের ক্ষেত্রে বিচিত্র রঙীন ছবিযুক্ত এবং রোমাঞ্চকর বই নির্বাচন করলে তাদের ভালো লাগবে। এগুলোর মাধ্যমে শিশুরা গাছপালা, পশুপাখিসহ বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠবে।কাপড় কিংবা হার্ডবোর্ডের বইগুলো এ বয়সের বাচ্চাদের জন্য উপযোগী। ছয় থেকে নয় বছরের শিশুদের জন্য অ্যাডভেঞ্চারধর্মী ও গল্পের বই উপযোগী। বাবা-মা সন্তানদের জিজ্ঞেস করে করে তাদের ভালো লাগা বা পছন্দগুলোও জেনে নিতে পারেন। তাদের আগ্রহ ও পছন্দ জানতে পারলে বাবা মা যদি তাদেরকে সে বিষয়ে উৎসাহী করে তুলতে পারেন সেটা গল্পের বই পড়তে দেয়ার চেয়েও কার্যকর হবে।

এক্ষেত্রে বাবা মা বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রগুলো সম্পর্কে বাচ্চাদের ধারনা দিতে পারেন। বিখ্যাত মনীষীদের গল্প শোনাতে পারেন যাতে তারাও তাদের মতো হয়ে ওঠার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। বাবা মা শিশুদের কাছ থেকে তাদের নিজেদের ভাষায় সেইসব গল্প শুনতে পারেন। এভাবে শিশুরা যৌক্তিকভাবে যেমন চিন্তা করতে শিখবে তেমনি তাদের স্মৃতি ও প্রজ্ঞা সেই শৈশব থেকেই বেড়ে উঠতে শুরু করবে। রঙীন ছবিও শিশুদেরকে সাহায্য করে গল্প বুঝতে এবং মনে রাখতে। দশ বছর এবং তার পরবর্তী বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আমরা একটু পরেই কথা বলার চেষ্টা করবো। চলুন এখন মিউজিক বিরতি দেয়া যাক।

দশ বছর কিংবা তারচেয়ে বড় শিশুদের জন্য বই নির্বাচনটা একটু জটিল। কারণ এ বয়সের শিশুদের পছন্দের বইয়ের বিষয়-আশয় তাদের বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। নিজস্ব পছন্দের ব্যক্তিত্বকে তারা খুঁজতে চায় এবং তার পছন্দের ব্যক্তিত্বের লেখা বই-ই তাদের ভালো লাগে। এর কারণ হলো তাদের ভেতরের যেসব চাহিদা রয়েছে ওই লেখকদের বই পড়ে তারা সেইসব চাহিদার খোরাক পেয়ে যায়। এই ভালো লাগার মধ্য দিয়ে বিশ্ব সম্বন্ধে তাদের মন ও মননে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়। নৈতিকও হতে পারে এই ধারণা, হতে পারে আধ্যাত্মিকও। এভাবে শিশুরা যতই বাড়তে থাকে তাদের বই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তারা স্বাধীন হয়ে ওঠে। তবে বাবা-মায়ের উচিত তাদের সন্তানেরা যেসব বই পড়ে সেসব বই সম্পর্কে লক্ষ্য রাখা।

কখনো যদি বাচ্চারা অশোভন বা তাদের জন্য অনুপযোগী কোনো বই নির্বাচন করেই বসে তাহলে ওই বইয়ের বিষয়বস্তু কিংবা তার ভালো-মন্দ দিক নিয়ে বাবা-মার উচিত তাদের সঙ্গে কথা বলা। বইটি পড়তে নিষেধ করা হলে কোনো লাভ হবে না বরং তাদের কৌতূহল আরও বেড়ে যেতে পারে। গল্পের বইয়ের পরিবর্তে সন্তানদেরকে সমকালীন ইতিহাস, ভৌগোলিক ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞান বিষয়ক মজার মজার বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা বই পড়ার অভ্যাস করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এর ফলে সন্তানেরা অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়ে উঠবে এবং তার চারপাশের বিশ্বকে তারা আবিষ্কার করতে শিখবে এবং বুঝতে চেষ্টা করবে।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বই মেলা হয়। এসব বই মেলায় বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া ভালো। মেলা গিয়ে বাবা-মা বই প্রকাশক কিংবা বই বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে বই সংক্রান্ত ধারণা নিতে পারেন। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়েও পেতে পারেন গ্রন্থ বৈচিত্র্য। এরফলে উপযোগী বইয়ের তালিকাটা বাবা-মার কাছে একটু বড় হয়ে উঠবে। তখন বাবা-মা যথাযথ বই নির্বাচন করার ব্যাপারে তাদের শিশু কিশোরদেরকে পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দিতে পারবেন। তাদের পড়ার সঠিক পন্থাও বাতলে দিতে পারবেন এবং এটা খুবই জরুরি। একথা তাদের পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর একটা উপায় হলো বই পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো লিখে রাখা। শিক্ষণীয় কোনো বিষয় নজরে পড়লে সেটা নিজের মতো করে লিখে রাখা। এর ফলে দ্বিতীয়বার পড়ার সময় পুরো বই না পড়লেও চলবে। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো এবং লিখে রাখা নোটগুলো দেখলেই মনে পড়ে যাবে।

মনে রাখার আরও একটি উপায় হলো টীকা লেখা। বইয়ের কোণে ছোট ছোট অক্ষরেও অনেকে টীকা লেখে। বইয়ের মূল টেক্সট পড়ার পর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটিকে টীকার মতো লিখে রাখলে সহজেই তা স্মরণে পড়ে যায়। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো 'মূল শব্দ' লিখে রাখা। কোনো একটি লেখা পড়ার পর তার মূলভাষ্যটিকে এমন একটি শব্দ দিয়ে টীকা লিখে রাখা যে শব্দটি চোখে পড়তেই বক্তব্য বুঝে এসে যায়, মূল টেক্সট আর পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। এটা পড়ার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। এইসব পদ্ধতিতে পড়া হলে বই পড়ার আনন্দটা পাওয়া যায় এবং জ্ঞানের ব্যাপ্তি ঘটে। হজরত আলি (আ) বলেছেন: "যারা বই পড়ে প্রশান্তি লাভ করে সুখ শান্তি তাদের সঙ্গ ছাড়বে না।"

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/   ১৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য