২০১৮-১২-২২ ২০:২৭ বাংলাদেশ সময়
  • দেখব ঘুরে ইরান এবার:  কেরমানশাহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবহুল কিছু নিদর্শন

কেরমানশাহ শহরের ত্রিশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি টিলার ওপর প্রাচীন শিলালিপি এবং নকশা দেখতে পাওয়া যায়। পাহাড়ের বুক কেটে অত্যন্ত নিপুণ হাতে ওই শিলালিপিগুলো খোদাই করা হয়েছে। এই পাহাড়ের নাম হলো বিস্তুন কিংবা বিসুতুন। ইরানের ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সমৃদ্ধির চমৎকার একটি নিদর্শন এই শিলালিপি।

পর্যটক, শিল্পবোদ্ধা কিংবা খননবিদ যাঁরাই এই শিলালিপি বা খোদাইশিল্প দেখেছেন তাঁরা নিজ নিজ ভ্রমণ কাহিনীতে এ সম্পর্কে না লিখে পারেন নি। একটি খোদাই শিল্পের মধ্যে সব ধরনের শিল্প উপকরণ রয়েছে গবেষণা করার মতো। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছিল এই বিস্তুন পাহাড়ে। তারপর থেকে বহু গবেষক এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মের নানা দিক আবিষ্কার করেন।

পুরো বিস্তুন এলাকাটাই ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এলাকাটির দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটার আর প্রস্থ তিন কিলোমিটার। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শুরু করে ইসলামী শাসনকাল পর্যন্ত সময়ের বিচিত্র প্রাচীন নিদর্শন এই কমপ্লেক্সে দেখতে পাওয়া যাবে। হাখামানেশিয় বাদশা দারিয়ুশের খোদাই করা ছবি, হেরাক্লিয়াসের ভাস্কর্য, আশকানি রাজা-বাদশাদের ছবি, পার্ত রাজাদের উপাসনালয়ের ছবি, পার্তসহ হাখামানেশিয়দের প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ, শাসনীয়দের সময়কার বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ, পাহাড় খননকারী ফারহাদের প্রস্তরলিপি, শাসানি সেতুর ধ্বংসাবশেষ, এইলখানিদের নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা, সাফাভি আমলের বিচিত্র সরাইখানা, বিস্তুন সেতু এবং শিকারিদের গুহা ইত্যাদি বিচিত্র নিদর্শন এখনো শোভা পাচ্ছে এই বিস্তুন কমপ্লেক্সে।

ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশারদদের বক্তব্য অনুযায়ী এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মাঝে বিস্তুন শিলালিপিই সবচেয়ে বড়ো এবং গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে বিশ্বব্যাপী যত শিলালিপি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে বিস্তুনের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। এ দিকটি লক্ষ্য করেই হয়তো ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো তাদের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় বিস্তুন শিলালিপিকে স্থান দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় যে এই শিলালিপিটি কেবল ইরানের মধ্যেই নয় বরং সারা বিশ্বেই নজিরবিহীন। তিনটি ভাষায় শিলালিপিটি খোদাই করা হয়েছে: প্রাচীন ফার্সি ভাষা, এইলামি ভাষা এবং বাবেলি ভাষা। কেবল প্রাচীন ফার্সি ভাষাতেই লেখা হয়েছে ৪১৪ লাইন। ছয় মিটার লম্বা এবং ৩.২০ মিটার উঁচু ক্যানভাসে লেখা হয়েছে এগুলো। লেখার পাশে চমৎকার নকশা ও কারুকাজ করা হয়েছে।

কিন্তু কী লেখা রয়েছে এসব শিলালিপিতে? নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে। বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়টি খতিয়ে দেখে বলেছেন যুদ্ধের বর্ণনা বা ইতিহাস লেখা রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫২২ সালে হাখামানেশিয় বাদশা দারিয়ুস সিংহাসন দখলের উদ্দেশ্যে আড়াই বছর ধরে যে যুদ্ধ করেছিলেন সেই কাহিনী এই পাথুরে পাহাড়ের দেয়াল খুঁড়ে লেখা হয়েছে। দেয়ালের গায়ে লেখা ছাড়াও কমপ্লেক্সের এক শ’ মিটার চাতালে হাখামানেশিয় বাদশা দারিয়ুসসহ আরো অন্তত নয় জন বাদশার প্রতিকৃতি খোদাই করা হয়েছে। ওই নয় জনই পরাজিত বাদশা ছিলেন। এদের সবাই বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তারা ভেবেছিল কেন্দ্রীয় রাজা দুর্বল হয়ে পড়েছে তাই এরা বাদশার সাথে নাফরমানি করে নিজেদেরকে বাদশা বলে ঘোষণা করেছিল। যাদের ছবি এখানে খোদাই করা হয়েছে তাদের মাথার উপরে নিজ নিজ নাম এবং বিদ্রোহ যেখানে শুরু হয়েছিল সেই স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

বিস্তুন পাহাড়ের উপরের অংশে যে সিঁড়ি লক্ষ্য করা যায় তা সম্ভবত পাথরকাটা শিল্পীরা তাদের কাজের সুবিধার্থে কেটেছিল। পরে যখন কাজ শেষ হয়ে গেছে তখন তারাই আবার সেগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে যাতে কেউ ওই সিঁড়ি ব্যবহার করে শিল্পকর্মটিকে নষ্ট করতে না পারে। এমনকি খোদাইকর্ম শেষ করার পর শিল্পকর্মটি যাতে দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ণ থাকে সেজন্য পুরো শিল্পকর্মের ওপর আলাদা প্লাস্টিারিং করা হয়েছে অর্থাৎ একটা আস্তরের প্রলেপ দিয়ে লেখাটিকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ওই প্রলেপটি যে কীসের তা আজও কেউ উদ্ধার করতে পারে নি।

কেরমানশাহ শহরের প্রাচীন আরেকটি নিদর্শন হলো ‘মুআভেনুল মুল্‌ক’ হোসাইনিয়া। কাজারি শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা এটি। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের জন্য ১৩২০ হিজরিতে হোসাইন খান মইন আররায়িয়া কেরমানশাহ শহরের প্রাচীন অংশে এই স্থাপনাটি গড়ে তোলেন। কিন্তু ১৩২৭ হিজরিতে যুদ্ধের ডামাডোলে এই সুন্দর স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে যায়। হোসাইন খান মইন আররায়িয়া ‘মুআভেনুল মুল্‌ক’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত হোসাইনিয়াটি আবারো নির্মাণ করেন। এজন্য তাঁর নামানুসারেই স্থাপনাটি পরিচিতি পায়।

‘মুআভেনুল মুল্‌ক’ হোসাইনিয়াটি তিন ভাগে বিভক্ত। একটি হলো হোসাইনিয়া। দ্বিতীয় অংশে পড়েছে যেইনাবিয়া এবং তৃতীয় অংশ হলো আব্বাসিয়া। রাস্তার সমতল থেকে প্রায় ছয় মিটার নীচে কমপ্লেক্সটি গড়ে তোলা হয়েছে। হোসাইনিয়াতে ঢুকতে হলে ১৭টি সিঁড়ি পার হতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশ করার পথে পানি পানের ব্যবস্থা রয়েছে। এই স্থানটিকে সবাই ভীষণ সম্মানের চোখে দেখে এবং অনেকেই সওয়াবের আশায় অনেক দান খয়রাত করে। প্রবেশপথসহ পুরো সিঁড়িজুড়ে টাইলসের মনোরম কারুকাজ করা হয়েছে।

হোসাইনিয়া অঙ্গনটি মূলত খুব বেশি বড়ো নয়। হোসাইনিয়ার চারপাশে দোতলা হুজরাখানা রয়েছে। হুজরাখানার দেয়ালগুলো টাইলস দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। হুজরাখানার ভেতরেও বড়ো বড়ো ক্যানভাসে টাইলসের মনোরম কাজ করা হয়েছে। আজাদারি অর্থাৎ শোকানুষ্ঠানের বিভিন্ন দৃশ্যসহ ইরানি বাদশাদের এবং খলিফাদের বহু ছবি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে হযরত সোলায়মানের দরবারের দৃশ্য। হোসাইনিয়া মেরামত করার সময় আয়নার কারুকাজ করা হয়েছে। আরও করা হয়েছে চকের বিচিত্র নকশা। দেখে মনে হয় প্রথম যে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল সে সময় এই আয়নার কারুকাজ এবং চকের কাজগুলো করা হয়েছিল।

মুআভেনুল মুলকের মাঝখানের অংশেও বেশ কিছু রুম হয়েছে। মহিলাদের শোকানুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুবিধার্থে এই রুমটি বানানো হয়েছে। এখানেও ১৮টি চিত্র শোভা পাচ্ছে। কারবালার বিভিন্ন দৃশ্যসহ নবীজীর ঊর্ধ্বাকাশ গমন, ইব্রাহিম (আ) এর হাতে ইসমাইল (আ) এর কুরবানির দৃশ্য, হযরত মূসা (আ) এর মাধ্যমে ফেরাউনের যাদু অকেজো করে দেওয়ার দৃশ্যসহ আরো বহু ঐতিহাসিক চিত্র বিভিন্ন মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আব্বাসিয়ার দেয়ালগুলোতেও একই ধরনের দৃশ্যময় ছবি শোভা পাচ্ছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ২২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য