২০১৮-১২-২৯ ২২:২৬ বাংলাদেশ সময়

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড.বদিউল আলম মজুমদার। তিনি রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন এবারের নির্বাচন হবে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ঘটনায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। নির্বাচন আগ মুহূর্তে তার এই বক্তব্য কেন?

জ্যেষ্ঠ কমিশনার মাহবুব তালুকদার

বদিউল আলম মজুমদার: কেন ঠিক নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জ্যেষ্ঠ কমিশনার মাহবুব তালুকদার ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ঠিক আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের ধারনা হয়তবা উনি এইসব বিষয়ে কমিশনে কথা বলেছেন ওনার সহকর্মীদের সাথে কিন্তু তাদের কাছ থেকে হয়ত সমর্থন পাননি। আর সে কারণে তিনি প্রকাশ্যে ওই বক্তব্য দিয়েছেন ওনার নিজের বক্তব্য হিসাবে।

রেডিও তেহরান: কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করেছেন তো বাস্তবতা কী আসলে এরকম নাকি এটি কথার কথা!

বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, আমরা গণমাধ্যমের সুবাদে এরকম জানতে পারছি। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে  আমরা যাচ্ছি। সেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা আছেন। তাদের কাছ থেকেও শুনতে পাচ্ছি- সহিংসতা হচ্ছে। আক্রমণ হচ্ছে বিরোধীদলের প্রার্থীদের ওপর। তাদেরকে বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হয়েছে। আমরা সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি এবং এটাই বাস্তবতা।

রেডিও তেহরান:  প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনে ভোটের পরিবেশ এখনো সুষ্ঠু আছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা

বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার বক্তব্য আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। হয়ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার যা দেখছেন আমরা সেটা দেখছি না অথবা আমরা যেটা দেখছি সেটা উনি দেখছেন না, শুনছেন না। অথবা আমরা ভিন্ন জগতে আছি। যারফলে আমরা যেটা দেখছি আর শুনছি সেটা আমাদের কাছে ভিন্ন বার্তা বহন করছে। আবারও বলছি আসলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে বলছেন ভোটের পরিবেশ এখনো সুষ্ঠু আছে-তাঁর এই বক্তব্য আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।  

রেডিও তেহরান: অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশে এমন নির্বাচন এর আগে কখনো দেখা যায় নি। নির্বচনকে কেন্দ্র করে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আপনি কী বলবেন?

আহত গয়েশ্বর চন্দ্র রায়

বদিউল আলম মজুমদার: অনেকে যে বলছেন নির্বচনকে কেন্দ্র করে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যেখানে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়ার কথা, আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা এবং জনসম্মতিতে অথ্যাৎ ভোটের মাধ্যমে সরকার রদ-বদল হওয়ার কথা। সেপথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আর এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। এগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচনের একদম কাছাকাছি সময়ে এসে অনেকেই বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যে সুখকর হবে না বিদ্যমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আপনার মন্তব্য কী?

বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের দেশে অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচনে দলীয় সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছে। তারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহারের মাধ্যমে সেটি করেছে। যদিও ২০১৪ সালে দলীয় সরকারের মাধ্যমে একটা একতরফা নির্বাচন হয়েছিল এবার আবারও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনের তফাৎটা হচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত আমরা যা দেখেছি তাতে নির্বাচনের ফলাফল সুখকর হবে না। এবারের নির্বাচনে জনগণের সম্মতির প্রতিফলন ঘটবে না। জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না। দলীয় সরকার প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারবে এবং করবে এটা এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট। 

রেডিও তেহরান: নির্বোচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের একটা উচ্ছ্বাস থাকে। এর কারণ কী?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মাঠে

বদিউল আলম মজুমদার: সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখে। তাদের ওপর জনগণের ব্যপাক আস্থা রয়েছে। সেইজন্যেই উচ্ছ্বাস। তবে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সেরকম কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাইনি। এর অন্যতম কারণ হলো সেনাবাহিনীর ভূমিকা ভিন্ন ধরনের। আমার জানা মতে সেনাবাহিনীর যে ভূমিকা দেয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে স্ট্রাইকিং ফোর্স। তাঁরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যারাকে নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করবে। দরকার হলে সেনাবাহিনীকে ডাকা হবে। আর ডাকা-না ডাকা নির্ভর করবে প্রশানসনিক কর্মকর্তাদের ওপর যারা নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। দুর্ভাগ্যবশত তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। আর জন্য নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে এটা আশা করাটাই দূরাশা বলে আমি মনে করি। কারণ তাদের সেই ভূমিকা রাখারই সুযোগ হবে না এইজন্য যে তারা থাকবে ব্যারাকে। নির্দিষ্ট এলাকায় তারা অবস্থান করবেন। তাদেরকে যদি কাজে লাগানো হয় সেক্ষেত্রেই তারা কাজে লাগবে বলে শুনেছি।

রেডিও তেহরান: ড.বদিউল আলম মজুমদার, সবশেষে আপনার কাছে যে বিষয়টি জানতে চাইব, সেটি হচ্ছে আপনার সংগঠন সুজনের পক্ষ থেকে কাজ করছেন। তো সামগ্রিক বিবেচনায় নির্বাচন কেমন হবে বলে মনে করছেন।

নির্বাচন কমিশন

বদিউল আলম মজুমদার: আমার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক -সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে যেমনটি দেখেছি-সেখানে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়েছে। সেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের আরো ভয়াবহ রূপ দেখতে পাব এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ফলে নির্বাচনের বিষয়ে যা কিছু লক্ষ করছি তার ভিত্তিতে আমি মনে করি একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হবে। এতে জনমতের প্রতিফলন পাওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। তবে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি সেটি হচ্ছে আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিশীলিত করা। 

নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা যাতে মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটে একইসাথে মানুষের ভোট দিতে পারার সুযোগ সৃষ্টি করা। ভবিষ্যতে ভোট দেয়ার গ্যারান্টি তৈরি করাই আমাদের জন্য বড় ইস্যু। অথ্যাৎ আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে যদি কার্যকর করতে পারতাম এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যদি ক্ষমতার রদ-বদল হওয়াটা নিশ্চিত করতে পারতাম তাহলে হয়তবা একটা ভালো অবস্থার দিকে যেতাম। তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা কার্যকর হতো। আমাদের গণতান্ত্রিক অবস্থাটা একটা শক্ত ভীতের ওপর দাঁড়াত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেত। আমাদের প্রক্রিয়াটা যদি সঠিক না হয়, মানুষের ভোট দেয়ার অধিকার যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটা ভেঙে পড়বে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা অকার্যকর হয়ে যাবে। এরফলে উন্নয়নের দিক থেকে আমাদের যে অগ্রগতি সেটাকে টেকশই করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বলে আমি মনে করি। অর্থাৎ গণতন্ত্র শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন অব্যাহত রাখা ও টেকশই করা দুরূহ হবে।#

পার্সটুডে গাজী আবদুর রশীদ/২৯

ট্যাগ

মন্তব্য