২০১৯-০১-০৩ ২০:৫৫ বাংলাদেশ সময়

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ১৮ থেকে ২১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ১৮ ও ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِيَ وَأَيَّامًا آَمِنِينَ (18) فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (19)

“তাদের এবং যেসব জনপদের লোকদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান (ও পরস্পরের কাছাকাছি) অনেক জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং সেগুলোতে প্রয়োজনমতো ভ্রমণ নির্ধারিত করেছিলাম। তোমরা এসব জনপদে রাত্রে ও দিনে নিরাপদে ভ্রমণ কর।” (৩৪:১৮)

“অতঃপর তারা (অকৃতজ্ঞতাভরে) বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের ভ্রমণের মাঝখানের দূরত্ব বাড়িয়ে দাও। তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। ফলে আমি (অন্যদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য) তাদেরকে গল্পের উপাখ্যানে পরিণত করলাম এবং সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞের জন্য (শিক্ষামূলক) নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (৩৪:১৯)  

গত আসরের আয়াতগুলোতে ইয়েমেনে বসবাসকারী সাবা জাতির ইতিহাস সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। আজকের দুই আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ এই জাতিকে এতটা নিয়ামতের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলেন যে, কোনো কিছুতেই তাদের অভাব ছিল না। উর্বর কৃষিজমি, অনুকূল আবহাওয়া, সবুজ শ্যামল প্রান্তর, ফলমূলের বাগান, প্রবাহমান নদী, পাহাড়, ঝর্ণাধারা ইত্যাদি কোনো কিছুরই কমতি তাদের ছিল না। পাশাপাশি, দেশের জনগণ নিরাপত্তার দিক দিয়েও সুখে-শান্তিতে শঙ্কামুক্ত জীবনযাপন করছিল। একটি আদর্শ, সুখী ও সমৃদ্ধ দেশের অধিকারী ছিল সাবা জাতি। কিন্তু যার দয়ায় তারা এত সুখ উপভোগ করছিল সেই আল্লাহকে তারা ভুলে গিয়েছিল। তারা সম্পদের প্রাচুর্যে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে উদাসিন হয়ে যায়। চরম ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অর্থ-সম্পদের অহংকারে মত্ত হয়ে যায়। দৃশ্যত, অতিরিক্ত সুখভোগ করতে করতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একটির পরে একটি করে সাজানো গ্রামগুলোর অধিবাসীরা ভাবল, এভাবে আর চলে না। পরিবর্তন দরকার। তাই তারা তাদের গ্রামগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়ার চিন্তা করল এবং আল্লাহর কাছে তাই চেয়ে বসল।

আল্লাহর দেয়া নেয়ামতে সন্তুষ্ট না থাকার কারণে সে নেয়ামত অভিশাপে রূপান্তরিত হয়। তাদের এই ভ্রান্ত দাবির কারণে পাহাড়ের যে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এতদিন সাবা জাতির পানির চাহিদা মিটত সেই বাধ ধসে পড়ে। ফলে প্রবল বন্যায় গোটা এলাকা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। উর্বর সবুজ-শ্যামল প্রান্তর কাঁটাযুক্ত গুল্ম ও অন্যান্য আগাছা-পরগাছায় ভরে যায়। বহুদিন পর্যন্ত আশপাশের জনপদের মানুষ সাবা জাতির এই দুঃখজনক পরিণতির কথা বলাবলি করতে থাকে এবং তা অন্যান্য জনপদের মানুষের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:

১. নেয়ামতের শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায় না করলে তা হাতছাড়া হয়ে যায় অথবা তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২. যেসব পাপের শাস্তি আল্লাহ মানুষকে দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন তার মধ্যে অকৃতজ্ঞতার শাস্তি অন্যতম। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি এই শাস্তি ভোগ করে।

৩. পবিত্র কুরআন অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে চলার পথ নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে।  

সূরা সাবার ২০ ও ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (20) وَمَا كَانَ لَهُ عَلَيْهِمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يُؤْمِنُ بِالْآَخِرَةِ مِمَّنْ هُوَ مِنْهَا فِي شَكٍّ وَرَبُّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ (21)  

“আর তাদের উপর ইবলিস তার অনুমান সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। ফলে তাদের মধ্যে মুমিনদের একটি দল ব্যতীত সকলেই তার পথ অনুসরণ করল।” (৩৪:২০)     

“তাদের উপর ইবলিসের কোন ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তবে কে পরকালে বিশ্বাস করে এবং কে তাতে সন্দেহ করে, তা প্রকাশ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আপনার পালনকর্তা সব বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক।” (৩৪:২১)

হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়াকে ধোঁকা দেয়ার পর ইবলিস শয়তানকে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত করা হয়। ইবলিস এ সময় শপথ করে যে, সে যুগে যুগে আদম সন্তানদেরও পথভ্রষ্ট করবে এবং তার ধারণা ছিল এ কাজে সে সফল হবে। এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, ইবলিস সাবা জাতির জীবনে তার সেই ধারণার বাস্তবায়ন দেখতে পায়। কারণ, ওই জাতির বেশিরভাগ মানুষ আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় না করে ইবলিসের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করেছিল। তবে শুধুমাত্র হাতে গোনা কিছু ঈমানদার ব্যক্তি শয়তানের ধোঁকায় পড়েনি।

আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে, কেউ যেন এটা না ভাবে যে, মানুষের ওপর শয়তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা রয়েছে এবং সে মানুষকে গুনাহ’র কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। মানুষকে বাধ্য করার কোনো ক্ষমতা ইবলিসের নেই। তবে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ তাকে এজন্য দিয়েছেন যাতে তিনি পার্থিব জীবনেই মানুষকে পরীক্ষা করতে পারেন। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা দেখতে চান, কে পরকালের প্রতি বিশ্বাসস্থাপন করে শয়তানের ধোঁকা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে কিয়ামতের প্রতি যাদের সন্দেহ আছে তারা শয়তানের সামান্য প্ররোচনায় পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।

স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল ঈমানের মানুষেরা অতি দ্রুত তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণের কাজে লিপ্ত হয় এবং শয়তানের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে। এ ধরনের মানুষ কুমন্ত্রণার মোকাবিলায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। 

মানুষের প্রতিটি কর্ম সম্পর্কে আল্লাহ পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন তিনি শুধুমাত্র নিজের জ্ঞান দিয়ে মানুষের বিচার করবেন না বরং মানুষ নিজের আমলনামা অনুযায়ী বিচার পাবে।

কেউ কোনো কাজ করার আগেই তাকে ওই কাজের জন্য শাস্তি দেয়া আল্লাহর বিধান নয়। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের কথা উল্লেখ করা যায়। শিক্ষক ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো নম্বর আশা করেন। কিন্তু সেই মেধাবী শিক্ষার্থীটি যতক্ষণ পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় ঠিকমতো প্রশ্নের উত্তর না লিখবে ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু মেধাবী হওয়ার কারণে শিক্ষক তাকে নম্বর দেবেন না।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. মানুষ যেসব কাজ করলে শয়তানের কুমন্ত্রণা লাভের উপযুক্ত হয়ে যায় তার মধ্যে আল্লাহর নেয়ামতের নাশুকরি করা বা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অন্যতম। সাবা জাতি যখন আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি তখনই শয়তান তাদেরকে ধোঁকা দিতে পেরেছে।

২. মহান আল্লাহ একদিকে মানুষকে যা খুশি তাই করার ক্ষমতা দিয়েছেন। অন্যদিকে তাকে বুদ্ধি ও মেধা দিয়েছেন যা দিয়ে সে সঠিক ও ভ্রান্ত পথের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে পারে। নবী-রাসূলগণ মানুষকে সত্য ও সুন্দর পথের দিকে আহ্বান জানালেও শয়তান ও তার অনুসারীরা তাকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির দিকে আমন্ত্রণ জানাতে থাকে।  মানুষকে এই দু’য়ের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়।#

 

ট্যাগ

মন্তব্য