২০১৯-০১-০৫ ২০:৪৪ বাংলাদেশ সময়

গত আসরে আমরা বিশ্বনবী (সা.)-এর ওফাত, এরপর সাকিফায়ে বানি সা’দায় প্রথম খলিফা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলিফার মৃত্যুর সময় যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব।

১২ বছর শাসনকাজ পরিচালনার পর হিজরি ২৩ সালে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব নিজের একজন বিরোধীর তরবারির আঘাতে আহত এবং কয়েকদিন পর প্রাণ হারান। তিনি মৃত্যুসজ্জায় নিজের উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। উমর বলেন, আজ যদি মুয়াজ বিন জাবাল, আবু উবায়দা জাররাহ কিংবা সালিম হুজাইফা জীবিত থাকত তাহলে তাদের যেকোনো একজনের কাছে খেলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তর করতাম। কিন্তু তারা আগেই ইন্তেকাল করার কারণে উমর খলিফা নির্বাচনের জন্য নতুন পন্থা চালু করেন। তিনি রাসূলের ছয় জন সাহাবীর মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে খলিফা নির্বাচন করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ওই ছয়জনকে আগামী তিন দিনের মধ্যে আলোচনা করে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে এই পদের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

এর আগে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর ওসিয়ত উপেক্ষা করে বিশেষ করে গাদিরে খোমে দেয়া ঐতিহাসিক খুতবা উপেক্ষা করে একদল সাহাবী আবুবকরকে প্রথম খলিফা নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবার পরামর্শ গ্রহণের এই পদ্ধতি বাদ দিয়ে উমর বিন খাত্তাবকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান আবুবকর। উমর এই দু’টি পদ্ধতির কোনোটি অনুসরণ না করে ছয় সদস্যের শুরা গঠন করে দেন এবং তাদেরকে বলেন পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করতে। এই শুরার ছয় সদস্য ছিলেন, আলী ইবনে আবি তালেব (আ.), ওসমান বিন আফফান, জুবায়ের বিন আওয়াম, তালহা বিন আব্দুল্লাহ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুর রহমান বিন আউফ।

দ্বিতীয় খলিফার ইচ্ছা ছিল ছয় সদস্যের শুরার অধিকাংশের ভোটে তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হবেন। তিনি এও বলেছিলেন, যদি ছয় জনের মধ্যে তিনজন এক পক্ষে এবং তিনজন অন্য পক্ষে রায় দেন তাহলে আব্দুর রহমান যে দলে থাকবেন সেই দলের রায় চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এ অবস্থায় শুরার বৈঠকের শুরুতে আব্দুর রহমানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস। পাশাপাশি জুবায়ের বিন আওয়াম হযরত আলী (আ.)-এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে খেলাফতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এদিকে আব্দুর রহমান ঘোষণা করেন তিনি খলিফা হতে চান না। অন্যদিকে উসমান বিন আফফানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন তালহা। ফলে শেষ পর্যন্ত ছয় জনের মধ্যে আলী (আ.) ও উসমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।

এ অবস্থায় মৃত্যু শয্যায় শায়িত দ্বিতীয় খলিফার নির্দেশ অনুযায়ী আব্দুর রহমান বিন আউফের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি হযরত আলী (আ.)কে প্রস্তাব দেন, তিনি যদি শাসনকাজ পরিচালনায় পবিত্র কুরআন, রাসূলের সুন্নাহ এবং প্রথম দুই খলিফা আবুবকর ও উমরের পন্থা অনুসরণ করেন তাহলে তাঁকে খলিফা নির্বাচিত করা হবে। এ প্রস্তাবের জবাবে হযরত আলী (আ.) প্রথম দুই খলিফার পন্থা অবলম্বন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন: আমি কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাপারে আমার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা ও ইজতেহাদ অনুসরণ করে শাসনকাজ পরিচালনা করব। এ অবস্থায় আব্দুর রহমান একই প্রস্তাব উসমানের সামনে তুলে ধরলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা কবুল করে নেন এবং বিন আউফ তার হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। ফলে উসমান বিন আফফান তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হন।

কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণ করার পর উসমান ইবনে আফফান রাসূলের সুন্নাহ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেননি, এমনকি প্রথম দুই খলিফার পদ্ধতি অনুসরণ করতেও ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামের অনেক দিকনির্দেশনা ও মূল্যবোধ উপেক্ষা করেন এবং তার কথা ও কাজে অনেক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় মদীনা থেকে নির্বাসনে পাঠানো দুই ব্যক্তি মারওয়ান ও তার পিতা হাকামকে মদীনায় ফিরিয়ে আনেন। এই কাজটি উসমান প্রথম দুই খলিফার শাসনামলে করতে চাইলেও তারা এর বিরোধিতা করেছিলেন এই বলে যে, যাদেরকে আল্লাহর রাসূল মদীনা থেকে বের করে দিয়েছেন তাদেরকে ফিরিয়ে আনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উসমান নিজের চাচাতো ভাই মারওয়ান বিন হাকামকে নিজের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং এক সময় মারওয়ান খলিফার মন্ত্রীর পদমর্যাদা পেয়ে যায়। সে নিজের ইচ্ছাকে খলিফা নির্দেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা অর্জন করে।

তৃতীয় খলিফার ব্যক্তিত্বের এই দুর্বলতার কারণে শাসনকাজে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে তাঁর সুন্নাহ বিরোধী কার্যক্রম, প্রথম দুই খলিফার পন্থা অনুসরণে অস্বীকৃতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের সরিয়ে দিয়ে অযোগ্য স্বজনদের নিয়োগ দানসহ আরো নানা অনিয়মের কারণে তৃতীয় খলিফার বিরুদ্ধে গণ অসন্তোষ দেখা দেয়। একদল বিদ্রোহী তাঁর বাসভবন অবরোধ করে। হযরত আলী (আ.) বিদ্রোহীদের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তারা ৪০ দিন অবরোধ করে রাখার পর উসমান ইবনে আফফানকে হত্যা করে। এবার চতুর্থ খলিফা নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়।  সাধারণ জনতা হযরত আলী (আ.)-এর কাছে এসে তাঁকে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দিতে থাকে। এ সম্পর্কে হযরত আলী (আ.) পরবর্তীতে বর্ণনা করেন: হঠাৎ দেখি চারদিক দিয়ে মানুষ আমার দিকে ছুটে আসছে। তাদের ধাক্কাধাক্কিতে আমার জামার দুই পাশ ছিঁড়ে যায় এবং হাসান ও হোসেইন ওদের চাপে পদদলিত হওয়ার উপক্রম হয়।

হযরত আলী (আ.) প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে জনগণের অনুরোধে সাড়া দিতে রাজি হন। কিন্তু এই মানুষগুলোর মধ্যে ছিল অনেক সুযোগসন্ধানী লোক। এ সম্পর্কে আমিরুল মুমেনিন বলেন: তাদের বায়াত গ্রহণের পর যখন শাসনব্যবস্থায় সংস্কার আনার কাজে হাত দেই তখন একদল তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, আরেকদল ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায় এবং আরেকদল অন্যায় আচরণ করতে শুরু করে।

হযরত আলী (আ.) জানতেন, এই মানুষগুলোই গাদিরের ঐতিহাসিক ঘটনা উপেক্ষা করে সাকিফায় খলিফা নির্বাচন করেছিল। এ কারণে তিনি সম্মিলিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন: আমি আপনাদের খলিফা ও শাসক হওয়ার চেয়ে শাসকের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হয়ে থাকাকে বেশি প্রাধান্য দিতে চাই। আপনারা যদি আমাকে ত্যাগ করে অন্য কাউকে খলিফা নির্বাচন করেন তাহলে আমি তার বিরুদ্ধাচরণ করব না। কিন্তু খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য হাজার হাজার মানুষ এত বেশি চাপাচাপি করে যে, হযরত আলী (আ.)-এর পক্ষে তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। তিনি বাধ্য হয়ে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য