২০১৯-০১-০৬ ১৮:৫০ বাংলাদেশ সময়

সুরা মুলক্‌ পবিত্র কুরআনের ৬৭তম সুরা। মক্কায় নাজিল-হওয়া এ সুরায় রয়েছে মোট ত্রিশ আয়াত। মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব এ সুরার কেন্দ্রীয় বিষয়।

মহান আল্লাহর নানা গুণ, সৃষ্টির সূচনা এবং আকাশ, তারকা-জগত ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিসহ সৃষ্টি-জগতের বিস্ময়কর নানা বিষয় এ সুরার কয়েকটি আলোচ্য বিষয়।  বিস্ময়কর প্রাণী পাখি, ভূমণ্ডলে থাকা নানা নেয়ামত, প্রবহমান পানি, চোখ আর কানসহ জানা ও বোঝার নানা মাধ্যম, পরকাল ও দোযখের শাস্তি, দোযখিদের সঙ্গে দোযখের প্রহরীদের সংলাপ নিয়ে বক্তব্য রয়েছে সুরা মুলক্-এ। এ ছাড়াও জালিমদের প্রতি ইহকাল ও পরকালে নানা শাস্তির হুমকি এবং সতর্কবাণী রয়েছে এ সুরায়।                      

সুরা মুলক্‌ গোটা বিশ্ব জগতের ওপর মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ প্রভুত্বের কথা তুলে ধরে। কাফিরদের কেউ কেউ বলত যে বিশ্ব জগতের নানা অংশের ভিন্ন ভিন্ন প্রভু রয়েছে! এই প্রভুদের কেউ কেউ ফেরেশতা অথবা অন্য কোনো সৃষ্টি! কিন্তু মহান আল্লাহই যে গোটা বিশ্ব জগতের,সৃষ্টি জগতের ও অস্তিত্ব-জগতের প্রভু তা বোঝানোর জন্য এ সুরায় মহান আল্লাহর নানা বিস্ময়কর সৃষ্টি,নেয়ামত ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

 

সুরা মুলক্-এর প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ ও চিরস্থায়ী মালিকানা, প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন:

বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব। তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি মহাপরাক্রান্ত ও ক্ষমাশীল।

 

এখানে বলা হয়েছে: তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুল্‌ক্‌ ... এই 'তাবারাক' শব্দের অর্থ সর্বশক্তিমান ও অক্ষয় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উৎসারিত বিপুল পরিমাণ বরকত, কল্যাণ বা প্রাচুর্য।  পরম করুণাময় ও মহান দাতা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন জীবন ও মৃত্যু যাতে পরীক্ষা করা যায় মানুষকে। পরীক্ষা বলতে এখানে এক ধরনের প্রশিক্ষণকে বোঝানো হচ্ছে। জীবনের নানা অঙ্গনে ও কর্মক্ষেত্রে মানুষ যাতে দক্ষ হয়, সক্ষম হয় পরীক্ষাগুলোয় উৎরে যেতে ও পবিত্র হয় তার আত্মা। অন্য কথায় মানুষ যাতে হয় সৎকর্মশীল, তার মধ্যে বিকাশ ঘটে বিবেক ও প্রজ্ঞাযুক্ত জ্ঞানের, তার কাজকর্ম আর ইচ্ছা বা নিয়তগুলো যেন হয় বিশুদ্ধ তথা একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।

 

মানুষের জন্য যেসব পরীক্ষার পথ থাকে তাতে অনেক সময়ই অনেকের পা পিছলে যেতে পারে। বার বার পথচ্যুত বা বিচ্যুত হতে হতে কেউ কেউ হতাশও হয়ে উঠতে পারেন। ভাবতে পারেন যে আত্ম-সংশোধনের চেষ্টা করেও আর লাভ নেই। তাই এ সুরাতেই আল্লাহ সাহায্যের ওয়াদা দিয়েছেন ও ক্ষমার অঙ্গীকার করেছেন। মহান আল্লাহ অপরাজেয় ও ক্ষমাশীল- এ কথা বলে তিনি তার উদারতা ও কঠোরতার খানিকটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

 

এরপর সুরা মুলক্‌-এর তিন নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

'তিনি সাত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিতে কোন ত্রুটি দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফেরাও;কোন ফাটল দেখতে পাও কি?'

-এখানে নিখিল বিশ্ব সম্পর্কে গবেষণার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এমন সুন্দর ও সুমিষ্ট ভাষায় দাওয়াত দেয়ার দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআন ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি,এর স্থিতি, ক্রমবিকাশ ও ক্রমন্নোতি-এসবই সুবিন্যস্ত, সুপরিকল্পিত, সুদৃঢ় ও সুসংহত এবং এভাবেই গোটা বিশ্ব চলছে নিখুঁত ঐশী নিয়ম আর বিধানের আওতায়।

সৃষ্টি জগতের এমন কিছু নেই যেখানে আপনি নিয়মের রাজত্ব খুঁজে পাবেন না। বস্তুর অতি ক্ষুদ্র অংশ তথা অনু-পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন, বিশাল ভূমণ্ডল ও পৃথিবী, মহাকাশ, সৌর-জগত, ছায়াপথ ও মহাবিশ্ব- এসবই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত নিয়ম মেনে চলছে। এ বিশ্ব-জগতের কোথাও যদি বিন্দুমাত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিত তাহলে ধ্বংস হয়ে যেত এ জগত। তাই মহান আল্লাহ মানুষকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন: খুবই মনোযোগ দিয়ে বার বার তাকাও। কিন্তু বিশ্ব-জগতের দিকে যতই তাকাও না কেন বা গবেষণার সর্বাধুনিক সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যতই পর্যবেক্ষণ কর না কেন কোথাও মহান আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে পাবে না। তাই মহান আল্লাহ বলছেন:

 

অতঃপর তুমি বার বার তাকিয়ে দেখ-তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে।

সুরা মুলক্‌-এর ছয় নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ কাফির-মুশরিকদের সতর্ক করে দিচ্ছেন এই বলে যে  যারা মহান আল্লাহর নানা নিদর্শন দেখার পরও সেসবকে উপেক্ষা করে এবং কুফর ও শির্ক তথা খোদাদ্রোহীতার পথ বেছে নেয় তারা সত্যের পথ ছেড়ে দিয়ে বেছে নিচ্ছে খোদায়ি মহাশাস্তির পথ। মহান আল্লাহ বলছেন:

'যারা তাদের পালনকর্তাকে অস্বীকার করেছে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। সেটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান। যখন সেখানে তাদের ছুঁড়ে ফেলা হবে,তখন তারা তার উৎক্ষিপ্ত ভয়ানক গর্জন শুনতে পাবে (ফলে তারা খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে)। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে-(কারণ, সব সময় এভাবেই তা টগ্‌বগ্‌ করতে থাকে)। যখনই তাতে ছুঁড়ে ফেলা হবে কোনো সম্প্রদায়কে-তখন তাদেরকে দোযখের সেনারা প্রশ্ন করবে: তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'

 

-বিশাল অগ্নিকুন্ডের অত্যন্ত উত্তপ্ত আগুনে কখনও কোনো ক্ষুদ্র পাত্র ফেলা হলে তা যেমন ফুটে ও গলে ছিন্ন-ভিন্ন হওয়ার উপক্রম হয় জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত পাপীদের অবস্থাও হবে অনেকটা সেরকম। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি অর্জনের যোগ্যতা দান করুন।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ৬

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য