২০১৯-০১-০৬ ১৯:১৯ বাংলাদেশ সময়

প্রখ্যাত ইরানি সুফি সাধক খাজা ইউসুফ হামেদানির পুরো নাম হল খাজা আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিন হাসান বুযানজিরদি হামেদানি।

তার জন্ম হয়েছিল হিজরি ৪৪০ বা ৪৪১ সনে তথা খ্রিস্টিয় ১০৪৯ সনে হামেদান অঞ্চলের বুযানজিরদি গ্রামে। এই গ্রামটি মোঙ্গলদের আধিপত্যের প্রথম দিকেও ছিল বেশ সমৃদ্ধ। অবশ্য মোঙ্গলরা এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর কিছুকাল না যেতেই এই গ্রামটি ধ্বংস করে দেয় ।

খাজা ইউসুফ হামেদানি নানা বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৮ বছর বয়সে বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং সেখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চ্যান্সেলর শেইখ আবু ইসহাক শিরাজির কাছে ফিক্‌হ বা ইসলামী আইন,হাদিস ও কালাম বা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেন। শেইখ আবু ইসহাক শিরাজি ছিলেন সে যুগের একজন প্রখ্যাত ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদ। খাজা ইউসুফ হামেদানির বয়স কম হওয়া সত্ত্বে তিনি শেইখ আবু ইসহাকের কাছে তার অনেক সঙ্গী ও ছাত্রদের তুলনায় অনেক বেশি সম্মান ও স্নেহ পেতেন।

খাজা ইউসুফ হামেদানি ও শেইখ আবু ইসহাক শিরাজির যুগ ছিল নানা মুসলিম মাজহাবের ফকিহদের মধ্যে তুমুল তর্ক-বিতর্কের যুগ হিসেবে খ্যাত। বিশেষ করে সে যুগে সুন্নি হাম্বালি ও শাফেয়ি মাজহাবের পণ্ডিতদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হত। বিতর্কের সেইসব জমজমাট আসর ইউসুফ হামেদানিকে ইসলামী আইন বা ফিক্‌হের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে খ্যাত ‘খালাফ ও নাযার’ শাস্ত্রে পারদর্শী করে তুলেছিল। বহু বছর পরে ৬৫ বছর বয়সে একজন পরিপক্ক পণ্ডিত,সুফি ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় বক্তা হিসেবে বাগদাদে এসেছিলেন ইউসুফ হামেদানি এবং এই নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই অনুষ্ঠিত হয় তার ওয়াজ মাহফিল ও ছাত্রদের জন্য দারসের মজলিস বা ক্লাস।

খাজা ইউসুফ হামেদানি বাগদাদের বিখ্যাত অধ্যাপকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের পর ইস্ফাহান,সেমনান ও খোরাসান সফর করেন। এইসব সফরে তিনি সে যুগের প্রখ্যাত আলেম ও মাশায়েখ শেইখ আবু আবদুল্লাহ জুয়াইনি,শেখ হাসান সেমনানি ও বিশেষ করে শেইখ আবু আলী ফারমাদির মত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসেন।  

সুফিদের ইতিহাসে শেইখ আবু আলী ফারমাদিকেই খাজা ইউসুফের মূল শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর খাজা ইউসুফ সফর করেন সমরকন্দ,বোখারা,মার্ভ ও হেরাত। এইসব অঞ্চলে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। মার্ভে থাকার সময় খাজা ইউসুফ মুরিদদের প্রশিক্ষণ ও দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য 'নজিরবিহীন' কিছু খানকাহ গড়ে তোলেন। এইসব খানকায় বহু মুরিদ সংযম ও আত্মশুদ্ধির সাধনায় মশগুল থাকতেন।

ইবনে খাল্লিকান খাজা ইউসুফ হামেদানির খানকাহকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। ইরানি ঐতিহাসিক সামআনি খাজা ইউসুফ সম্পর্কে সবচেয়ে পুরনো তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে খ্যাত। তিনি মার্ভে খাজা ইউসুফের খানকায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী প্রখ্যাত ইরানি মরমি কবি সানায়ি ছিলেন খাজা ইউসুফেরই শিষ্য বা মুরিদ। সানায়ি তার বিখ্যাত দ্বিপদী বা মসনভি কাব্য ‘হাদিকাতুল হাক্বিক্বাহ’ লেখার পর কিছুকাল মার্ভে শেইখ ইউসুফ হামেদানির খানকায় খোদাপ্রেমের সাধনায় মশগুল ছিলেন বলে বর্ণনা দেখা যায়।

শেইখ ইউসুফ হামেদানির জীবনের শেষের বছরগুলো মূলত কেটেছে মার্ভ ও হেরাত অঞ্চলে। তিনি ৫৩৫ হিজরিতে তথা ১১৪১ খ্রিস্টাব্দে মার্ভের জনগণের আমন্ত্রণে হেরাত থেকে মার্ভের দিকে রওনা হন। কিন্তু এই সফরের সময় হেরাত ও বাগশুর অঞ্চলের মাঝামাঝি বাগদিস অঞ্চলের বামিয়ান শহরে ইন্তেকাল করেন। আর সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। পরবর্তীকালে ইবনে নাজ্জার নামক খাজা ইউসুফ হামেদানির এক অনুরাগী খাজার লাশ মার্ভে নিয়ে আসেন এবং এই অঞ্চলেই তাকে দাফন করেন। বর্তমান মার্ভ শহর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে বৈরাম আলী নামক এলাকাটি শেইখ ইউসুফ হামেদানির মাজার হিসেবে খ্যাত। জ্ঞানী-গুণীসহ সব ধরনের মানুষের জিয়ারতগাহে পরিণত হয়েছে খাজা ইউসুফের মাজার। 

খোদা-প্রেমের পথে চলতে ইচ্ছুক মুরিদ ও সাধারণ মানুষদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য খাজা ইউসুফ তার বিখ্যাত শিষ্যদের মধ্য থেকে চার ব্যক্তিকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি তার বিখ্যাত শিষ্য আবদুল খালেক গিজদুভানিকে নিয়ে সুফিবাদে এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এ ধারা পরবর্তীতে বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় ও সেই থেকে তা নাকশাবান্দিয়া সুফি তরিকা হিসেবে খ্যাত। খাজা ইউসুফের প্রবর্তিত এই তরিকা আজও এশিয়া ও আফ্রিকার নানা অঞ্চলে চালু রয়েছে।

খাজা ইউসুফের লেখা একটি বইয়ের নাম 'রুতবাতুল হায়াত' বা 'জীবনের নানা পর্যায়'।  প্রশ্ন ও উত্তরের আঙ্গিকে সহজ ও সাবলিল ভাষায় লেখা হয়েছে এই বইটি। এ বইয়ের বক্তব্য অভিনব ও শব্দ আর ব্যাখ্যার মধ্যেও দেখা যায় অভিনবত্ব। ফার্সি সুফি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর অন্যতম এই বই। অনেকেই মনে করেন খাজা ইউসুফই ফার্সি ভাষায় এ জাতীয় বই লেখার পথিকৃৎ। কোনো কোনো গবেষকের মতে মানাজিলুসায়িরিইন ও মানাজিলুসালিকিন নামের দু'টি বইও খাজা ইউসুফেরই লেখা। কিন্তু এ দুই বইয়ের কোনো কপি আজও পাওয়া যায়নি।

খাজা ইউসুফের যুগে হিজরি পঞ্চম শতকে সুফিদের মধ্যে ধর্মান্ধতা ছিল সাধারণ ব্যাপার। আশআরি মতবাদও সে যুগে ধর্মান্ধতা ও সংকীর্ণতা জোরদারে ভূমিকা রেখেছিল।  হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের   বায়েজিদ বোস্তামি  ও মনসুর হাল্লাজের মত স্বাধীন সুফি চিন্তাবিদরা এই যুগে আর ছিলেন না। শেইখ জাম, খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ও ইমাম মুহাম্মাদ গাজ্জালির মত সুফিবাদী ছিলেন খাজা ইউসুফের সমসাময়িক যুগের গোঁড়া সুফি ধারার তিন প্রধান স্তম্ভ। আর এমনই এক পরিবেশে খাজা ইউসুফ অত্যন্ত উদার ও উঁচু মনের অধিকারী এবং পরিশীলিত, স্বাধীন ও আকর্ষণীয় সুফি চিন্তাবিদ হিসেবে আবির্ভূত হন। অনেক গবেষক তার ব্যক্তিত্বকে আবুল হাসান খারাকানি, আবু সায়িদ আবুল খাইর এবং বাবা তাহের হামেদানির মত মহান সুফি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে অনেকেই খাজা ইউসুফের ব্যক্তিত্বকে গাজ্জালির ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি পর্যায়ের বলে মনে করেন। কারণ তারা দু'জনই ছিলেন বিখ্যাত আরেফ আবু আলী ফারমাদির ছাত্র। তারা দু'জনই সহজ ভাষায় ও সরাসরি তাসাওউফকে তুলে ধরতেন সুশৃঙ্খল নীতিমালার আওতায় এবং ইসলামী শরিয়তের আলোকে। গাজ্জালি বেশি সংখ্যক বই লেখার কারণে বেশি পরিচিত হলেও খাজা ইউসুফ হামেদানি গাজ্জালির চেয়ে অনেক বেশি মুরিদকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি সুফি তরিকতগুলোর প্রবর্তক হিসেবে ইরফানের ক্ষেত্রে গাজ্জালির চেয়ে সামগ্রীকভাবে অনেক বেশি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৬

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য