২০১৯-০১-১২ ১৯:৫৮ বাংলাদেশ সময়

গত আসরে আমরা একটি পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমরা বলেছি যে, ধর্মীয় বিধি-বিধান চর্চা পরিবারের সকল সদস্যের মানসিক ও আত্মিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে বলে মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত। গর্ভবতী হবার পর থেকে জীবনের সকল পর্যায়ে আল্লাহর স্মরণ এবং আধ্যাত্মিকতার চর্চা মানুষের অন্তরাত্মায় গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গবেষণায় দেখা গেছে যেসব পরিবারে ধর্মীয় বিধি-বিধান চর্চা হয় সেসব পরিবারে নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিপর্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। আর যদি ধর্মীয় চর্চা সুষ্ঠুভাবে না থাকে তাহলে দেখা দেয় বিচিত্র অবক্ষয়। বিশেষ করে নেশা জাতীয় দ্রব্য তথা মাদকের প্রতি আসক্তি দেখা দেয় মারাত্মকভাবে। বলাবাহুল্য আজকাল পরিবারগুলোতে মাদকাসক্তির প্রবণতা এতো ভয়াবহ যে তা খুবই উদ্বেগজনক।

বর্তমান সময়ে সামাজিক একটি অবক্ষয় হলো মাদকাসক্তি। মাদকের কারণে প্রতি বছরই মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাপী এই সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশ্বের নামকরা একজন বিষ-বিশেষজ্ঞ 'লুদউইং' বলেছেন: খাদ্যকে যদি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পৃথিবীর বুকে মাদক ছাড়া অন্য কোনো বস্তু নেই যা এতো বিপুল পরিমাণে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। ২০১৫ সালের ২৫ জুনকে জাতিসংঘ মাদক বিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওইদিনই জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে বিশ্বে বর্তমানে চব্বিশ কোটি ষাট লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে দুই কোটি সত্তর লাখের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও এক বিবৃতিতে বলেছেন: দু:খজনকভাবে প্রতি তিনজন মাদকাসক্তের মধ্যে একজন মহিলা।

কিন্তু কেন মানুষ মাদকে আসক্ত হয়? বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এর কারণ বিচিত্র।  কৌতূহল থেকে কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে। কেউ মজা নেয়ার জন্য, কেউ দু:খ ভুলে থাকার জন্য, কেউ ব্যথা থেকে মুক্তির জন্য, কেউ আবার হাসতে হাসতে বা মজা করতে গিয়েও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। অনেকে আবার জাতে ওঠার জন্য কিংবা নির্দিষ্ট কোনো দলে নিজেকে যুক্ত করার জন্যও মাদকে আসক্ত হয়। এ কারণগুলো যদিও তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় তারপরও বাস্তবতা হলো এইসব কারণেই কোটি কোটি মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। এটা একটা সামাজিক সমস্যা। মাদকে আসক্তির কারণে সমাজে ব্যক্তির ইমেজ নষ্ট হয়, ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। পারিবারিক ব্যবস্থার ওপর যেমন আঘাত হানে মাদকাসক্তি তেমনি একটি পরিবার এবং সমাজের আয়-উন্নতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা মাদকাসক্তির কিছু কারণ উল্লেখ করেছি। কিন্তু বিশেষজ্ঞগণ ভিন্ন মতও দিয়েছেন। তাদের মতে মাদকে আসক্ত হবার ক্ষেত্রে পরিবারের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবার হলো ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠা এবং আচার ব্যবহার শেখার প্রাথমিক জায়গা। বাবা-মায়ের সঙ্গে যদি সন্তানদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক সুন্দর ও আন্তরিক না থাকে তাহলেই মাদকে আসক্ত হওয়াসহ বিচিত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে তরুণ যুবকরা যে মাদকে আসক্ত হয় তার পেছনে একটা কৌতূহল কাজ করে। এই কৌতূহলটা তৈরি হয় আগেই যারা মাদকাসক্ত হয়েছে তাদের দেখে কিংবা কখনো কখনো পরিবারেই মাদক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে তারা কৌতূহলী হয়।

ঘরে কেউ মাদক ব্যবহার করলে সন্তানেরা যে-কোনো অজুহাতেই হোক তার স্বাদ গ্রহণ করতে চায় এবং সুযোগমতো মাদকের স্বাদ নেয়। পরিবারে সীমাহীন স্বাধীনতাও মাদকাসক্তির আরেকটি কারণ। আর এই স্বাধীনতাটি আসে বাবা-মায়ের ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা এবং অসচেতনতা থেকে। সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব সচেতন না হলে এই ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে সন্তান। এই সীমাহীন স্বাধীনতা যেমন মাদকাসক্তির কারণ আবার ঠিক তার বিপরীত মানে অতিরিক্ত কঠোরতাও সমানভাবে দায়ী। সন্তানের যৌক্তিক ও সঠিক চাওয়াগুলোর প্রতি বাবা-মা যদি গুরুত্ব না দেন কিংবা বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের চিন্তাচেতনাগত বৈষম্য বা বৈপরীত্য যদি থাকে তাহলে  সন্তানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাবে না কিংবা তার সঙ্গে অশোভন ও কঠোর আচরণ করা যাবে না। করলে সন্তান বিপথে চলে যাবার আশঙ্কা থেকে যায়।

সন্তানের চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের কথা যদি তারা পরিবারে অবাধে প্রকাশ করতে না পারে কিংবা তাদের বিকাশের সময় যদি তাদের আত্মবিশ্বাস বিঘ্নিত হয় তাহলে ছোটোখাটো প্রতিকূল পরিস্থিতিও তারা মোকাবেলা করার শক্তি ও মনোবল হারিয়ে ফেলে। আর তখনই তাদের মাঝে মাদকের প্রতি আসক্তি জন্মাতে শুরু করে। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে অনীহা কিংবা পরিবারে দৃঢ় ঈমানের চর্চা না থাকলে সন্তানের মাঝে আর অনৈতিকতার চর্চা করার ক্ষেত্রে কোনোরকম বাধা-প্রতিবন্ধকতা থাকে না। আর তখনই মাদকে আসক্তির উপযুক্ত পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায়। সুতরাং বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই সন্তানদেরকে মাদকাসক্তি থেকে ফিরিয়ে রাখার মোক্ষম উপায়।

একথা যেমন ঠিক তেমনি বাবা-মাকেও হতে হবে আদর্শস্থানীয় শিক্ষক। বাবা-মা যদি নিজেরাই মাদকাসক্ত হন তাহলে তারা যতই তাদের সন্তানদের প্রশিক্ষণ দেন, কোনো কাজেই আসবে না। তাই বাবা-মাকে সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করতে হবে। তাদের মধ্যে থাকতে হবে সততা, ভারসাম্য ও ইতিবাচক যাবতীয় গুণাবলি। বাবা-মা যদি যা-কিছু বলেন, তার বিপরীত কাজ নিজেরা করেন তাহলে নিজেদের সন্তানদের কাছ থেকে কিছুতেই কাঙ্ক্ষিত ফল আশা করতে পারেন না। মাদকাসক্ত বাবা-মা'র পক্ষে কি তাদের সন্তানকে মাদক-বিরোধী সবক দেওয়া সাজে? সুতরাং পারিবারিক সুস্থতার স্বার্থে বাবা-মাকে আগে সঠিক ও আদর্শ জীবনযাপন করতে হবে তারপর নিজ সন্তানদেরকে যথাযথ নির্দেশনা দিতে হবে। সকল বাবা-মা-ই এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠবেন এই প্রত্যাশায় আজ এ পর্যন্তই। কথা হবে আবারও পরবর্তী আসরে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১২

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য