২০১৯-০১-২৬ ২০:৩৭ বাংলাদেশ সময়

গত আসরে আমরা জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রের যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমরা সিফফিনের যুদ্ধ এবং হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাত নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

হযরত আলী (আ.) কুফায় বসে শামের গভর্নর মুয়াবিয়ার কাছে পত্র লিখে তাকে জানান, কিছু লোক আমার সঙ্গে পরামর্শ না করেই তৃতীয় খলিফাকে হত্যা করেছে। এরপর জনগণ আমার হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে। আমার এ চিঠি পাওয়া মাত্র আমার নামে জনগণের বায়াত গ্রহণ করবে এবং তোমার দরবারের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদেরকে আমার কাছে পাঠাবে। কিন্তু মুয়াবিয়া এ চিঠির প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে উষ্ট্রের বাহিনীর মতো উসমানের হত্যাকাণ্ডের বিচারকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে বলেন, যতক্ষণ উসমান হত্যার বিচার না হচ্ছে ততক্ষণ শান্ত হবো না। একইসঙ্গে মুয়াবিয়া আলী (আ.)কে পরাজিত করে নিজে খলিফা হওয়ার জন্য তার বাহিনী প্রস্তুত করতে থাকেন। মুয়াবিয়া নিজের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিজেকে খলিফা ঘোষণা করে নিজের নামে জনগণের বায়াত গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় হযরত আলী (আ.) ও মুয়াবিয়ার মধ্যে কয়েক দফা পত্র বিনিময় হয়। আমিরুল মুমিনিন বেশ কয়েকবার সিরিয়ায় প্রতিনিধি পাঠান।

মুসলমানদেরকে একটি ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে হযরত আলীর এ প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় এবং সিফফিনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, হযরত আলী (আ.)-এর কাছে মালিক আশতার এবং আম্মার ইয়াসিরের মতো অনুগত ও অকুতোভয় সেনা কমান্ডার থাকা সত্ত্বেও সাধারণ সেনা ও জনগণ ছিল আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন।

সিফফিনের ময়দানে দু’পক্ষ ঘাঁটি স্থাপন করার পর হযরত আলী (আ.) অনুগামী সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা আগে যুদ্ধ শুরু করবেন না। আক্রান্ত হলেই কেবল যুদ্ধ করবেন এবং তাতে আপনাদের কোনো দোষ থাকবে না। পলায়নরত শত্রুদের ওপর হামলা করবেন না। যার হাতে অস্ত্র নেই তাকে আঘাত করবেন না এবং আহত ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না।  এক পর্যায়ে হিজরি ৩৬ সালের জিলহজ্ব মাসে সিফফিনের যুদ্ধ শুরু হয়। ওই মাস শেষ হয়ে মহররম শুরু হলে নিষিদ্ধ মাস হওয়ার কারণে একমাসের জন্য যুদ্ধ স্থগিত রাখে দু’পক্ষ। এই একমাসে যুদ্ধের আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। সফর মাস শুরু হলে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আলী (আ.) ও তাঁর অনুগত সৈন্যদের অকুতোভয় যুদ্ধে মুয়াবিয়ার বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সিরিয় বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

এ সময় মুয়াবিয়ার চতুর সেনা কমান্ডার আমরু আস সম্ভাব্য পরাজয় প্রতিরোধ করার জন্য বর্ষার মাথায় কুরআন বিদ্ধ করে একদল সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়ে দেয়। এসব সেনা কুরআনের দোহাই দিয়ে আলী (আ.)-এর অনুগত সৈন্যদের মাঝে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে দেয়।

আমরু আসের এ কূটকৌশল কাজে লাগে। আলী (আ.)-এর অনুগামী একদল সৈন্য তাঁর কাছে এসে ঘোষণা করে, তারা আর যুদ্ধ করবে না।  তারা শুধু কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করবে। এ সময় আমীরুল মুমিনিন তাদের এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, মুয়াবিয়ার বাহিনীর সেনাদের বর্শার মাথায় যা দেখা যাচ্ছে তা ছেঁড়া কাগজ ছাড়া আর কিছু নয়। কুরআনের মর্মার্থ আমি ভালো জানি। কিন্তু আলী (আ.)-এর নির্বোধ ও অদূরদর্শী সৈন্যরা তা উপলব্ধি করার চেষ্টা না করে সমস্বরে বলতে থাকে, যুদ্ধ বন্ধ না করলে তারা আমীরুল মুমিনিনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করবে না।

ঠিক এ সময় আলী (আ.)-এর সেনাপতি মালিক আশতার মুয়াবিয়ার তাবুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমিরুল মুমিনিন তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন।

আলী (আ.) যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও খলিফা নির্ধারণের জন্য দুই পক্ষ থেকে একজন করে বিচারক নিয়োগের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানান। আলী (আ.) চেয়েছিলেন মালিক আশতার বা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের যেকোনো একজনকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেবেন। কিন্তু নিজ বাহিনীর সেই বিদ্রোহীরা প্রচণ্ড আপত্তি তুলে আবু মুসা আশআরীকে আলী (আ.)-এর পক্ষ থেকে বিচারক নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করে যাতে আমিরুল মুমিনিনের সম্মতি ছিল না। অন্যদিকে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া হয় কূটচালে অভ্যস্ত আমরু আসকে। দু’পক্ষের এই দুই বিচারক নিজেদের মধ্যে আলোচনা শেষ করতে কয়েক মাস সময় নেন। এরপর একদিন উৎসুক জনতার সামনে বেরিয়ে আসেন তারা। আমরু আসের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর আবু মুসা আশআরী ঘোষণা করেন, আমি যেমন করে আমার আঙুল থেকে এই আংটিটা খুলে নিচ্ছি ঠিক তেমনিভাবে আলীকে খেলাফতের পদ থেকে সরিয়ে দিলাম।

এরপর কথা ছিল আমরু আস একইভাবে মুয়াবিয়াকে খেলাফতের অযোগ্য ঘোষণা করবেন। কিন্তু তিনি তা না করে বলেন, আবু মুসা যেমনটি বলল আমিও এই আংটি খোলার মতো আলীকে খেলাফতের পদ থেকে সরিয়ে দিলাম এবং আবার এই আংটিটা আঙুলে পরার মতো মুয়াবিয়াকে খলিফা নিযুক্ত করলাম।

একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত বিদ্রোহীদের একাংশ যারা পরবর্তীতে খারেজি হিসাবে কুখ্যাতি লাভ করে তারা স্লোগান দেয়- আল্লাহর বিচার ছাড়া আর কারো বিচার মানা যাবে না। তারা খেলাফতের ফয়সালা করার লক্ষ্যে বিচারক নিয়োগ দেয়ার জন্য তওবা করে এবং আলী (আ.)-এর কাছে এসে তাঁকেও তওবা করার আহ্বান জানায়। তারা বলে, তওবা না করলে আলী (আ.) কাফের হয়ে যাবেন। এ সময় আমিরুল মুমিনিন বলেন, আমি তো কোনো অপরাধ করিনি যে তওবা করব। তোমরাই বরং একটি সম্ভাব্য বিজয় থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছ।এরপর খারেজিরা আলী (আ.)-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে নয়া তৎপরতা শুরু করে। তারা কুফার মসজিদে প্রবেশ করে কুরআনের কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে হযরত আলীকে কাফের ঘোষণা করে।

এ অবস্থায় আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) একদিন খারেজিদের একত্রিত করে তাদের উদ্দেশে উপদেশমূলক ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণ শুনে ১২ হাজার খারেজির মধ্যে আট হাজার সঠিক পথে ফিরে আসে এবং বাকি চার হাজার তাদের বিদ্রোহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। হযরত আলী (আ.) এই চার হাজার খারেজিকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তাদের সঙ্গে ইরাকের নাহরাওয়ান এলাকায় আলী (আ.)-এর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া বাকি সব খারেজি নিহত হয়। মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আমিরুল মুমিনিন কুফায় ফিরে যান। ওদিকে নাহরাওয়ান যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া তিন খারেজি আলী (আ.), মুয়াবিয়া ও আমরু আসকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদের মধ্যে দু’জন তাদের কাজে ব্যর্থ হলেও ৪০ হিজরির ‌১৯ রমজান ইবনে মুলজাম নামের তৃতীয় খারেজি হযরত আলী (আ.)কে বিষমাখা তরবারীর আঘাতে আহত করতে সক্ষম হয়। এর তিনদিন পর আমিরুল মুমিনিন শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২৬

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য