২০১৯-০১-২৭ ২০:৪৪ বাংলাদেশ সময়

গত পর্বে আমরা জেনেছি হিজরি পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি আরেফ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও সাহিত্যিক খাজা আবদুল্লাহ আনসারি বড় বড় শিক্ষকদের কাছ থেকে ইসলামী জ্ঞান ও ইরফান বা বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সে সময় নিশাপুরে একজন বড় শাফেয়ি আলেম ও ফকিহ বসবাস করতেন। ওই আলেম মক্কা ও মদিনার মসজিদের ইমাম হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তিনি আশআরি মতবাদের যুক্তিবিদ্যা-ভিত্তিক শাস্ত্রের তথা আশআরি কালাম শাস্ত্রের ক্লাস নিতেন।

কিন্তু এ সময়  যুক্তি-ভিত্তিক ইসলামী কালাম বা ধর্মতত্ত্ব শাস্ত্রের বিরোধিতা করে খাজা আবদুল্লাহ আনসারি বিপাকে পড়েছিলেন। কালাম শাস্ত্রের বিরোধিতা করে খাজা আবদুল্লাহ বইও লিখেছিলেন। ফলে তাকে কয়েক বার হত্যার হুমকি দেয়া হয়।

সে যুগের সালজুক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী খাজা নিজামুল মুলকের নির্দেশে খাজা আবদুল্লাহকে নিশাপুর থেকে নির্বাসন দেয়া হয় যদিও তিনি খাজার জ্ঞান ও ধার্মিকতার কারণে তার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন। খাজা আবদুল্লাহর বিরোধীরা যাতে তার ওপর হামলা চালাতে না পারে সে জন্য তিনি তাকে সুরক্ষাও দিতেন। কিন্তু নিজামুল মুলক এটা চাননি যে খাজার উপস্থিতিরি কারণে নিশাপুরে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠুক।

গত পর্বে আমরা এও বলেছিলাম যে খোরাসানের সুফি-ঘরানার অন্যতম তারকা খাজা আবদুল্লাহ আনসারি খোদাপ্রেমের ইরফানি শিক্ষার পর্যায়গুলোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস বা সুবিন্যস্ত করেছিলেন যাতে ইরফানের প্রভাব  যেন কেবল আধ্যাত্মিক বিষয়েই সীমিত না থাকে বরং মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ ও আদব-কায়দায়ও ইরফান বা খোদাপ্রেমের আলোকিত জ্ঞানের প্রভাব পড়ে। এভাবে তিনি সুফি-ঘরানায় তরিকতকে শরিয়তের মধ্যে সমন্বিত করেছেন।

খাজা আবদুল্লাহর ইরফান ছিল শরিয়তের সঙ্গে সমন্বিত। তিনি শরিয়তের মাধ্যমেই হাকিকাত বা ইসলামী জ্ঞানের  আসল তাৎপর্যের অনুসন্ধান করতেন এবং নিজ ছাত্রদেরও তা-ই শেখাতেন।

খাজা আবদুল্লাহ ধর্মের মূলনীতি বা মৌলিক বিষয় এবং অমৌলিক বিষয়গুলো- এ উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর ছিলেন। তার জীবনীকাররা লিখেছেন খাজা সব  সময়ই সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজে নিষেধ করায় মশগুল থাকতেন। তার মতে খোদাপ্রেম অর্জনের মূল শর্তই হল শরিয়তের বিধি-বিধান মেনে চলা। যেসব সুফি ধর্মের বিধানগুলোকে অস্পষ্ট রাখতেন খাজা আবদুল্লাহ তাদের সঙ্গে কঠোর সংগ্রাম করতেন।

তিনি নিজেই এ প্রসঙ্গে তার গদ্য কবিতায় বলেছেন,সুপ্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা  মারেফাতকে ফাঁস করাটা হচ্ছে পাগলামি। কারামাত দেখিয়ে আকৃষ্ট করার বিষয়টা হাল্কা চাল আর সত্যের পথে চলা হচ্ছে সাফল্য এবং তাসাওউফ বা সুফিবাদে পেশাদার হওয়া কুফুরি।

খাজা আবদুল্লাহ তাসাওউফ ও তার মূল নীতিমালার ক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণ ও বুদ্ধিবৃত্তিকে পরিহার করতেন এবং তিনি হাকিকাত বা আসল তাৎপর্যকে প্রমাণের জন্য যুক্তি ও ধর্মীয় দর্শন ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। তিনি পবিত্র কুরআনকেই একমাত্র দলিল-প্রমাণ ও মুসলমানদের একমাত্র নেতা বলে মনে করতেন।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি গদ্য-কবিতা তথা পদ্যময় গদ্য রচনায় পারদর্শী ছিলেন। এমনকি অনেকে তাকেই ফার্সি দারি ভাষায় প্রথম গদ্য-কবিতার রচনাকারী বলে মনে করেন। খাজাই প্রথমবারের মত গদ্যের মধ্যে কবিতা ব্যবহারের প্রথা চালু করেন। তার পরে এক্ষেত্রে শেখ সাদি আরও বেশি দক্ষতা দেখিয়েছেন। ফরাসি গবেষক হারম্যান লিখেছেন:

খাজা আবদুল্লাহর গদ্য সাহিত্য গজল ও চতুর্পদী কবিতার সঙ্গে মিশ্রিত। সুফি-ধারার কবিতায় তিনিই প্রথম এই নতুনত্ব আনেন এবং এভাবে তিনি বাস্তবে  ফার্সি সাহিত্যে হাকিম সানায়ি’র মত বড় কবির জন্য পথ তৈরি করে দেন যিনি ছিলেন ইরফানি কবিতার পথিকৃত। ধারণা করা হয় যে খাজা আবদুল্লাহ এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করেছিলেন আরবদের সংস্কৃতি থেকে। আনুমানিক ৪৭৫ হিজরি সনের দিকে 'কাবুসনামেহ' নামক বইয়ের লেখক লিখেছিলেন: আরবি গদ্য সাহিত্যে গদ্য-কবিতা শিল্প ও জনপ্রিয় আনন্দজনক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়,কিন্তু ফার্সি গদ্য সাহিত্যে গদ্য-কবিতাকে সমাদর করা হয় না।

অধ্যাপক মুহাম্মাদ তাকি বাহারের মতে খাজার গদ্য-সাহিত্য এক ধরনের বিশেষ ছন্দ-রীতির কবিতা যা সাসানিয় যুগেও ছিল প্রচলিত। আরবদের প্রাচীন গানেও এই স্টাইলের অনুসরণ করা হত।

বিশিষ্ট গবেষক হোসাইন অ'হির মতে খাজা আবদুল্লাহ আনসারির গদ্য সাহিত্য আসলে সুফি ও ধর্ম-বিষয়ক বক্তাদের ওয়াজ-নসিহতেরই অনুরূপ যার মাঝে মধ্যে কবিতার মতো ছন্দময় ভাষা ও বাক্য দেখা যায়।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি কবিতাও লিখতেন। তবে তার সুশৃঙ্খল কবিতার কোনো নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বলা হয় তার মোনাজাত জাতীয় কিছু কবিতা রয়েছে । তবে এই কবিতাগুলোর মৌলিকতা নিয়ে কোনো কোনো গবেষক সন্দিহান । কিন্তু এটা স্পষ্ট যে খাজা আবদুল্লাহ কবিতা লিখতেন। তিনি নিজেই বলেছেন যে শৈশবেই কবিতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল এবং কবিতা রচনার প্রতিভাও তার ছিল। এ প্রসঙ্গে 'রিয়াদুল আরিফিন' গ্রন্থে রেজা কুলি হেদায়াত  লিখেছেন: 'খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ফার্সি ও আরবি ভাষার একজন কবি। তিনি কারো কাছে আনসারি ও কারো কাছে হেরাতের পির হিসেবে খ্যাত।' 

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির  সুশৃঙ্খল কোনো কবিতা দেখা না গেলেও তার কিছু বিক্ষিপ্ত কবিতা দেখা যায়।  আর এই কবিতাগুলোর মাধ্যমেই তার কবিতা সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব। অবশ্য সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন মূলতা কবিতা মেশানো গদ্য রচনার জন্যই। তদ্রুপ তার আসল ব্যক্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায় হাদিস শাস্ত্র বিশারদ হিসেবে। কবি হিসেবে খাজা আবদুল্লাহ সে যুগের বড় কবিদের সারিতে স্থান না পেলেও তার কবিতাগুলো পাঠক ও শ্রোতাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে বলে বেশিরভাগ সাহিত্য সমালোচকরাই স্বীকার করে থাকেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

মন্তব্য