২০১৯-০২-০৩ ২০:১২ বাংলাদেশ সময়

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এতটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে এই ফলাফল মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করানো কঠিন কাজ। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন যে ভাব প্রদর্শন করলেন তাতে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে তোলা খুবই কঠিন কাজ হবে।

আর এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলেছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান।

তিনি আরও বলেন, এ নির্বাচনে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে দলীয় সরকারের অধীনে আদৌ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আর এ বিষয়টি আবার জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

কমরেড খালেকুজ্জামান বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে অনিয়ম ঘটেছে তার নিষ্পত্তির জন্য দেশের ভেতরের জনসাধারণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি কাজ।

রেডিও তেহরান: জনাব খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তবে সরকার এ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, আমরা গত ১১ জানুয়ারি বাম গণতান্ত্রিক জোটের ১৩১ টি সংসদীয় আসনে যেসব প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য একটা গণ শুনানীর আয়োজন করেছিলাম। আমাদের প্রার্থীরা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বর্ণনায় যে বিষয়গুলো সামনে এনেছেন তার সাথে টিআইবির রিপোর্টের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আমরা সেই গণ শুনানী অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকেও দাওয়াত করেছিলাম। তাছাড়া যারা নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অনেককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। নির্বাচন কমিশন আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি। তারা আসেননি। তাছাড়া নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রার্থীরা যেসব বর্ণনা দিয়েছেন সে ব্যাপারে কোনোভাবেই আমরা নির্বাচন কমিশনের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারিনি।

রেডিও তেহরান:  টিআইবির রিপোর্ট সম্পর্কে প্রধান নিবাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, এ রিপোর্ট লজ্জাকর। তিনিও রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছেন। সিইসির বক্তব্য এবং বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

টিআইবির প্রতিবেদন

কমরেড খালেকুজ্জামান: নির্বাচন নিয়ে টিআইবির রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে। এটা অনুচিত হয়েছে। এটি জনগণের মধ্যে সন্দেহকে আরও দৃঢ় করেছে যে টিআইবি যা বলেছে এবং নির্বাচন নিয়ে জনগণের যে অভিজ্ঞতা এই দুইয়ের মাঝে কোনো তফাৎ নেই। টিআইবির রিপোর্টে নির্বাচনের বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে বলে মনে করে জনসাধারণ। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল টিআইবির রিপোর্টের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা, খতিয়ে দেখা বা টিআইবির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করা। কিন্তু যেভাবে নির্বাচন কমিশন টিআইবির রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যান করল তাতে জনগণের মনে সন্দেহটা আরও দৃঢ় হয়েছে যে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন কোনো অস্তিত্ব বা সত্ত্বা সেভাবে নেই। এর আগেও যখন জনগণ দেখল বিভিন্ন কেন্দ্রে সুনির্দিষ্টভাবে বহু অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন যেভাবে পিঠা উৎসব করলেন মানুষ সেটাকে ভালোভাবে নেয়নি। তারপর টিআইবির রিপোর্ট যখন আসল সেক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবে কোনো মনোযোগ না দিয়ে বা সে বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে এবং তদন্ত না করে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করায় নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা আগে যতখানি ছিল সেটা আরও বদ্ধমূল হয়ে গেছে। এরমধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি।

রেডিও তেহরান: টিআইবির রিপোর্টের পরপরই মার্কিন দৈনিক ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ সম্পাদকীয় ছেপেছে। তাতেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেকেই বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা একে ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা বলে মনে করছেন। আপনার মূল্যায়ন কী?

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়

কমরেড খালেকুজ্জামান: সরকার বাইরে যেভাবে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করছেন এবং সাফল্য ও জয় দাবি করছেন ভেতরে ভেতরে তারা একটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। শাসকদলের একটা বড় অংশের মধ্যে এমন ধারনা বিরাজ করছে যে এতখানি করা হয়তো ঠিক হয়নি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল এতটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটা মানুষকে বিশ্বাস করানেটা এতটা কঠিন যে জয় পরাজয়ের পার্থক্যটা যেভাবে আসল এবং বিষয়গুলো যেভাবে সম্পাদিত হলো তাতে আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করে যে এই ফলাফল মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করানোটাও কঠিন কাজ। ফলে টিআইবি যখন রিপোর্ট পেশ করল তখন নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল একটা তদন্ত করা বা তাদেরকে আশ্বস্ত করা যে আমরা বিষয়টি দেখছি। তারা বলতে পারতেন টিআইবি কিভাবে তথ্যগুলো পেলেন বা এর যথার্থতা কতটুকু। সেসব কোনো কিছুই না করে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করাটা ঠিক হয়নি।

ফলে সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলা হচেছ কিন্তু নির্বাচন কমিশন গত জাতীয় নির্বাচনের পর যে ভাব প্রদর্শন করলেন তাতে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে তোলা খুবই কঠিন কাজ হবে। আর এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বিষয় সামনে আসছে যে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠ হবে না সেটাও আবার জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গেল।

রেডিও তেহরান:  বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক উঠলেও চীন, রাশিয়া, ভারত-পাকিস্তানসহ বহু দেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ছে। একে আপনি কীভাবে দেখছেন?

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, এইসব অভিনন্দনের তেমন গুরুত্ব নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ব্যাপারে সত্যাসত্য নিরুপণ করা বা সঠিকভাবে পরিমাপ করা তাদের কাজ নয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করাসহ নানা কারণে বিভিন্ন  দেশ অভিনন্দন জানায় বা সাধুবাদ জানায়। শুধু বাংলাদেশ নয় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় এগুলো আমরা দেখেছি। সামরিক শাসকদেরকেও বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়ে থাকে। যেসব দেশে রাজতন্ত্র চলছে তাদের সঙ্গেও বিশ্বের দেশগুলো সম্বন্ধ রক্ষা করে চলে। ফলে অভিনন্দনের বিষয়টি অত গুরুত্ব দেয়ার বিষয় নয়।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচনের পর জাতীয় ঐলক্যফ্রন্টের নেতারা বলেছিলেন, নির্বাচনের নানা অনিয়ম জানাতে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাবেন। পরিকল্পনাটি দেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য?  

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, জাতীয়ভাবে বিষয়টি জনগণের কাছে তুলে ধরা বা প্রতিভাত করা এবং সচেতন করার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। ফলে বাইরের কোনো শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির বদলের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। ফলে এ বিষয়টিকে আমি গৌণ বিষয় বলে মনে করি। মূখ্য বিষয় হলো এই দেশের শাসন ব্যবস্থায় জনগণ প্রকৃত ক্ষমতার মালিক। আর সেই জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে ব্যত্যয় ও অনিয়ম ঘটেছে তার নিষ্পত্তির জন্য দেশের ভেতরের জনসাধারণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করাটাকেই জরুরি কাজ বলে মনে করি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩

 

ট্যাগ

মন্তব্য