২০১৯-০২-০৩ ২০:২৯ বাংলাদেশ সময়

সুরা আল কালাম পবিত্র কুরআনের ৬৮ তম সুরা। তবে নাজিল হওয়ার আদি কালক্রম অনুযায়ী এ সুরা ছিল পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয় সুরা। অর্থাৎ মহানবীর (সা) নবুওত লাভের প্রথম দিকেই নাজিল হয়েছিল এই সুরা তথা সুরা আল কালাম। মক্কায় অবতীর্ণ এ সুরায় রয়েছে ৫২ আয়াত।

এ সুরার প্রথম আয়াতে কলমের শপথ রয়েছে বলে সুরাটির নাম হয়েছে আলকালাম। এ সুরার অন্য এক নাম 'নুন'এ সুরার শুরুতে রয়েছে আরবি  বিচ্ছিন্ন অক্ষর 'নুন'। 

মহানবী (সা)'র নবুওত এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ এই সুরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কলম ও লেখার গুরুত্ব, মহানবীর (সা) বিশেষ গুণাবলী, কাফিরদের অপছন্দনীয় বৈশিষ্ট,  বাগান-মালিকদের কাহিনী, কিয়ামত বা পুনরুত্থান সম্পর্কিত নানা বিষয় ও কাফিরদের শাস্তি সুরা কালামের কিছু আলোচ্য বিষয়মুনাফিকদের প্রতি হুঁশিয়ারি, ধৈর্য ধরতে মহানবীর (সা) প্রতি নির্দেশ, কুরআনের মহত্ত্ব ও ইসলামের  শত্রুদের ষড়যন্ত্র নিয়েও বক্তব্য এসেছে এ সুরায়। সুরা কালামের প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলছেন: নূন (ن),শপথ কলমের এবং লেখকরা যা লিখছে তার ৷

সুরা কালাম শুরু হয়েছে বিচ্ছিন্ন অক্ষর 'নুন' « ن »   দিয়ে যা  অন্য কোনো সুরায় নেই। অতীত যুগে কলম বানানো হত বাঁশের কঞ্চি দিয়ে। আর কালো রংয়ের কোনো কিছুকে ব্যবহার করা হত কালি হিসেবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিষয়টা তেমন বড় বলে মনে হয় না। কিন্তু বাস্তবে মানব-সভ্যতার উৎসই হল কলম এবং সভ্যতার বিকাশও ঘটেছে কলমের মাধ্যমে। ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তাধারা, দর্শন- এসব কিছুর পেছনেই রয়েছে কলমের অনন্য অবদান। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন লিখিত অক্ষর বা ভাষা ছিল না এবং ছিল না কলম তখনকার কোনো স্পষ্ট ইতিহাস জানা যায় না। মানব-জাতির ঐতিহাসিক যুগের সুচনা ঘটেছে তাদের ঘটনাগুলো লিখে রাখার উদ্যোগ তথা কলম উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে।  পবিত্র কুরআনে কলমের শপথ নিয়ে মহান আল্লাহ কলমের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই শপথের গুরুত্ব বোঝার জন্য এটাও মনে রাখা দরকার যখন পবিত্র কুরআন নাজিল হচ্ছিল তখন সমগ্র আরব বা হিজাজের  ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতার প্রধান কেন্দ্র মক্কা মুয়াজ্জমায় লিখতে ও পড়তে পারার মত শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল বিশ জনেরও কম। এমন একটি অঞ্চলে পবিত্র কুরআনের মত আসমানি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐশী দিক-নির্দেশনায় সমৃদ্ধ অনন্য-অলৌকিক মহাগ্রন্থ নাজিল হওয়া বিশেষভাবে মনে রাখার মত বিষয়।

 

সুরা কালাম-এর পরের আয়াত থেকে বোঝা যায় আগের আয়াতের শপথগুলোর উদ্দেশ্য হল ইসলামের মহান নবীকে (সা) সমর্থন দেয়া। কারণ মুশরিকরা মহান আল্লাহর পাঠানো সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ এই নবী ও রাসুলকে পাগল বলে অপবাদ দিত। বিশ্বনবী (সা) যখন প্রকাশ্যেই ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন এবং এর ফলে তাঁর রেসালতের বক্তব্যগুলো সম্পর্কে সবাই যখন জানতে পারে তখনই নাজিল হয় সুরা কালাম। এ সময় কাফির-মুশরিকরা আল্লাহর বাণীর প্রচারকে স্তব্ধ করতে ও মহানবীকে (সা) নতজানু করতে সব ধরনের অন্যায় পদক্ষেপ নিচ্ছিল। বিশ্বনবীর (সা) নামে নানা ধরনের অজস্র অপবাদ ও গুজব ছড়ানো ছিল এসব পদক্ষেপের অন্যতম। কাফির-মুশরিকরা প্রচার করত যে মহানবী (সা) হলেন পাগল! নাউজুবিল্লাহ।

 

সুরা কালামে মহান আল্লাহ শপথ নিয়ে বলছেন যে, ইসলামের মহানবী তো পাগল ননই বরং তাঁর রয়েছে এমন শ্রেষ্ঠ এবং নজিরবিহীন  নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলী।  তিনি ছিলেন অকল্পনীয় মাত্রায় দয়ালু ও করুণাময়। তাঁর পবিত্রতা ও আন্তরিকতা, ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা ও প্রতিরোধ এবং অধ্যবসায়ও ছিল নজিরবিহীন। - মহানবী (সা) ছিলেন মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি জনগণকে কোনো কিছুর দিকে আহ্বান জানানোর আগেই নিজে তা আমল করেছেন। যেমন, মহান আল্লাহর ইবাদত বা দাসত্বের দিকে আহ্বান জানানোর আগে মহানবী (সা) নিজেই সবার আগে এ সংক্রান্ত সব দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মানুষকে যেসব বিষয়ে বাধা দেন বা যেসব কাজে বিরত থাকতে বলেন- অন্য সবার আগে মহানবী নিজেকেই সেসব থেকে বিরত রেখেছেন বা সেসব কখনও তিনি করেননি। বিরোধী বা শত্রুদের নানা নির্যাতন ও বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি সতর্ক বাণী বা উপদেশ দেয়া অব্যাহত রেখেছেন। তাঁকে গালি দেয়া হয়েছে তবুও বিশ্ব-জগতের জন্য মহান আল্লাহর রহমত হিসেবে দায়িত্ব-পালনরত মহানবী তাদের জন্য দোয়া করেছেন! বিরোধীরা তাঁর নুরানী গায়ে পাথর মেরেছে ও তার মস্তক-মুবারকের ওপর উত্তপ্ত ছাই নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে তাদের জন্য সুপথ কামনা করেছেন!

 

বিশ্বনবী (সা) বলেছেন, মানবীয় চরিত্র ও গুণরাজিকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্যই আমাকে রেসালত ও নবুওত দেয়া হয়েছে।  

সুরা কালাম-এর পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে নবী! খুব শিগগিরই আপনি দেখে নিবেন এবং তারাও দেখে নিবে যে তোমাদের মধ্যে কারা পাগল।

- এখানে আল্লাহ বলছেন যে, মহানবীর যথাযথ ও নিখুঁত নীতি-অবস্থান, পদক্ষেপ এবং আচার-আচরণ, অগ্রগতি ও ইসলামের দ্রুত বিস্তার থেকে প্রমাণ হবে যে বিশ্বনবী (সা) হলেন বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার এক মহা-উৎস, বরং পাগল তারাই যারা বিশ্ব-জগতকে আলোকিত করা এই মহাসূর্যের আলোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে নেমেছে।  #

 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ৩

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য