২০১৯-০২-০৫ ২০:৩৭ বাংলাদেশ সময়

সিরামিকের মতো নির্মাণ শিল্প তেল বহির্ভুত ইরানের রপ্তানিপণ্যগুলোর মধ্যে আরও একটি সংযোজন। ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ১৩০ টিরও বেশি ওয়াল টাইলস ও সিরামিক ফ্যাক্টরি রয়েছে।

ইরানে অবশ্য টাইলস শিল্পটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মৃৎ শিল্প থেকে উঠে আসা এই দুটি পণ্য মানবেতিহাসের প্রাচীন শিল্পগুলোর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে মনে করা হয়। মৃৎ শিল্পের সূচনা মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই হয়েছে। প্রাচীন আমলের মানুষের তৈরি প্রাকৃতিক শিল্প পণ্যের প্রাথমিক নিদর্শন হলো মৃৎশিল্প।

মৃৎ মানে মাটি। মাটির তৈরি শিল্পকর্মই মৃৎশিল্প। মাটিকে খুব ভাল করে পানি দিয়ে মথে কাদায় পরিণত করতে হয়। এটা অবশ্য বলা কঠিন যে পৃথিবীর কোন প্রান্তের কোন গোত্র প্রথম এই মৃৎ শিল্পের কাজটি করেছিলেন। মৃৎ শিল্পের মূল উপাদান হলো মাটি, পানি এবং আগুন। এই উপাদানগুলো পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়। ইরান পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা যেখানে এই মৃৎ শিল্পটি ব্যাপকভাবে লালিত হয়েছে এবং বিস্তৃতি লাভ করেছে। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিচিত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতির এই দেশ মৃৎশিল্পের অনেক পুরোনো নিদর্শনে ভরা। সম্প্রতি ইরানের ললেজিন শহরকে বিশ্ব মৃৎশিল্পের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটাই ইরানে মৃৎশিল্পের অবস্থান তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।

প্রাচীন ইরানে এই শিল্পটির প্রচলন বেশিরভাগ যেসব এলাকায় ছিল তার মধ্যে রয়েছে লোরেস্তান অঞ্চলের জাগরোস পর্বতমালার পশ্চিমাঞ্চল, মজান্দারন ও গিলান প্রদেশের কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী অঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের আজারবাইজান এলাকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের কেরমান ও সিস্তান বেলুচিস্তান এলাকা। ইরানের পুরাতত্ত্ব গবেষকদের খননকার্জ থেকে মৃৎশিল্পের সবচেয়ে পুরোনো যে নিদর্শন পাওয়া গেছে সেটা ছিল কেরমানশাহ প্রদেশের গাঞ্জদাররে টিলায়। ওই নিদর্শনটিকে খ্রিষ্টপূর্ব আট হাজার বছর আগের বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

গাঞ্জ-দাররে টিলায় পুরাতত্ত্ব গবেষকরা যে অনুসন্ধানী খননকাজ চালিয়েছেন, তা থেকে উঠে এসেছে বহু প্রাচীন নিদর্শন। বিশেষ করে দশ হাজার বছর আগেকার মৃৎশিল্প খুবই অবাক করার মতো। মাটির তৈরি গ্লাস এবং কলস বানানোর জন্য ব্যবহৃত বেশ বড়োসড়ো ঘূর্ণায়মান চাকা ইত্যাদি বস্তু ওই খননকাজ থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই সবই মৃৎশিল্পের নিদর্শন। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন ইরান ভূখণ্ডের প্রাচীন অধিবাসীরাই সর্বপ্রথম মৃৎপাত্র তৈরি করেছেন এবং এই মৃৎপাত্র তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় ঘূণায়মান চাকা-এসবকিছুরই আবিষ্কারক ইরানিরাই। প্রথম দিকে হাজার হাজার বছর ধরে মৃৎপাত্রগুলো মাটি না পুড়িয়েই বানানো হতো।

পোড়ানো মৃৎ পাত্রের প্রাথমিক নিদর্শন খ্রিষ্টপূর্ব ছয় হাজার বছর আগের। এগুলো নিয়ে গবেষণা করে বিশেষজ্ঞগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে পাত্রগুলো ঘূর্ণায়মান চক্র ব্যবহার না করেই বানানো হয়েছে। তবে ইরানের সিয়ালক টিলায় কিংবা দক্ষিণ শুশ এলাকার প্রাচীন অঞ্চলে, পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের চোগামিশ টিলা ও শিরাজ প্রদেশের তেল-ই বাকুন এলাকায় প্রাপ্ত মৃৎ শিল্প-নিদর্শনগুলো প্রায় একই সময়ের এবং এগুলো চাকা ব্যবহার করে বানানো হয়েছে। কালের পরিক্রমায় অগ্নিকুণ্ডে পরিবর্তন এসেছে, মৃৎপাত্র তৈরির উপাদানে পরিবর্তন এসেছে, মৃৎপাত্রে রঙ করার সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে মৃৎপাত্রের ওপর চকচকে যে উজ্জ্বলতা নিয়ে আসা হয় ওই কাজের সূচনা হয়েছে। এই চকচকে আবরণ যে কেবল সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে তা নয় বরং এই আবরণটি ওয়াটার প্রুফ মানে পানির প্রবেশকেও বাধাগ্রস্ত করে। সাধারণত পাত্রের গায়ে নকশা বা কারুকাজ শেষ করার পর চকচকে ওই উপাদানটি ব্যবহার করা হয় যাতে আর নষ্ট না হয়।                  

মৃৎশিল্প নিয়ে কথা বলছি আমরা। এই শিল্পভুবনের আরেকটি পণ্য হলো ওয়াল টাইলস। এই টাইলসের দুটি পর্যায় রয়েছে। এক হলো টাইলসের মূল গঠন যা মাটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তেরি করে শক্ত বানানো হয়। দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো ওই চকচকে উপাদানের প্রয়োগ যার মাধ্যমে নকশা এবং পানির প্রবেশ ঠেকানো হয়। ইরানে এই ওয়াল টাইলস তৈরির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। পুরাতাত্ত্বিক গবেষকদের অনুসন্ধানী খননকাজ থেকে উঠে আসা প্রাচীন টাইলসের নমুনাগুলোর বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় যে ইরানে খ্রিষ্টপূর্ব চার শ বছর আগে এই টাইলস শিল্পের প্রচলন ছিল। বিশেষ করে শুশে পাওয়া মৃৎশিল্পের নিদর্শন কিংবা হাখামানেশিয় প্রাসাদে পাওয়া টাইলসের নিদর্শনগুলো পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞগণ ওই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ৫

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য