২০১৯-০২-০৯ ১৮:২০ বাংলাদেশ সময়

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৩৪ থেকে ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ (34) وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَأَوْلَادًا وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ (35)

“কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করা হলেই তার বিত্তশালী অধিবাসীরা বলতে শুরু করেছে, তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছ, আমরা তা মানি না।” (৩৪:৩৪)

“তারা আরও বলেছে, আমাদের ধন ও সম্পদ তোমাদের চেয়ে বেশি, সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না।” (৩৪:৩৫)

গত আসরে আমরা কিয়ামতের দিন সমাজের অহংকারী ও দুর্বল শ্রেণির লোকদের বাকবিতণ্ডা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজকের এ দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত অসংখ্য নেয়ামতের অধিকারী অহংকারী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা- যারা সারাক্ষণ ভোগবিলাস ও কামলালসা চরিতার্থ করার কাজে মত্ত থাকে- তারা নিজেদেরকে অপরের চেয়ে মর্যাদাবান মানুষ বলে মনে করে। তারা একথা বলে বেড়ায় যে, তাদের ধন-সম্পদ ও পারিবারিক গৌরব তাদের উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ।  এ ধরনের মানুষ যুগে যুগে নবী-রাসূলদের দাওয়াতের বাণী প্রত্যাখ্যান করেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে নবী-রাসূলদের সহগামী হয়েছেন। অন্যদিকে অহংকারী ব্যক্তিরা মনে করেছে, এসব দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের সঙ্গে মেলামেশা করলে তাদের সম্মানহানি হবে। এই অহংকারই শেষ পর্যন্ত তাদের সৎপথপ্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মানুষ প্রকাশ্যে একথা বলে বেড়িয়েছে যে, “কিয়ামতের প্রতি আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই। তারপরও যদি কিয়ামত বলে কিছু থাকে তাহলে সেদিন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শাস্তি দেবেন না। কারণ, তিনি আমাদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন বলেই এই দুনিয়াতে আমাদেরকে তোমাদের চেয়ে বেশি সম্পদ ও সন্তান দান করেছেন।”

এ দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. সম্পদ ও ক্ষমতা মানুষকে এতটা অন্ধ করে দেয় যে, সে কোনো যুক্তি ও দলিল ছাড়াই নবী-রাসূলদের শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করে।

২. পার্থিব জীবনে অধিক সম্পদের অধিকারী হওয়া আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার লক্ষণ নয় বরং এসব নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মাত্র। বেশিরভাগ সম্পদশালী ব্যক্তি সত্য প্রত্যাখ্যান করে বলে কিয়ামতের দিন তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

৩. ভোগবিলাসে মত্ত হওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে মানুষের পক্ষে সঠিক পথের দিশা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

এবারে সূরা সাবা’র ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (36)

“বলুন, আমার পালনকর্তা যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন অথবা সংকীর্ণ করে দেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (৩৪:৩৬)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, অহংকারী মানুষেরা তাদের ধন-সম্পদকে দুনিয়ায় আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও আখেরাতে মুক্তির আভাস বলে মনে করে। অথচ তাদের ধারণা যে সঠিক নয় তা এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন, রিযিক বৃদ্ধি বা সংকীর্ণ হওয়া আল্লাহর রহমত বা ক্রোধের লক্ষণ নয়; বরং এটি আল্লাহর সেই প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত যা দিয়ে তিনি এ বিশ্বজগত সৃষ্টি ও পরিচালনা করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তা বোঝে না। তারা এ ব্যাপারে নিজেদের ও অন্য মানুষ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নেয়ামত দান করা ও ফিরিয়ে নেয়া আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে; এ বিষয়টি মোটেই তাঁর দয়া বা ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয়।

২. আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা সংশোধন করে দেয়া নবী-রাসূলদের অন্যতম দায়িত্ব। উদাহরণস্বরূপ তারা মানুষকে বলেছেন, কেউ যেন অনেক ধন-সম্পদ হাতে পাওয়াকে আল্লাহর প্রিয়পাত্রে পরিণত হওয়ার লক্ষণ মনে না করে।

এবং

৩. আমরা যেন অধিক ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে নিজেদের অর্জন মনে না করি বরং এগুলো আল্লাহর দান। এসব নেয়ামত যেন আমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে উদাসিন করে না দেয়।

সূরা সাবার ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفَى إِلَّا مَنْ آَمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آَمِنُونَ (37)

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে না। বরং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তারা তাদের কর্মের বহুগুণ প্রতিদান পাবে এবং তারা (জান্নাতের) সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।” (৩৪:৩৭)

সূরা তাগাবুনের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, “তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়।” পৃথিবীতে এমন অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি রয়েছেন যারা তাদের সম্পদ মানুষের সেবায় খরচ করেছেন। এ ধরনের মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার লাভ করবেন। অন্যদিকে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা কৃপনতা করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তারা পার্থিব জীবনে যেমন এ সম্পদ ভোগ করে যেতে পারেননি তেমনি কিয়ামতের দিন তাদেরকে মহাশাস্তি ভোগ করতে হবে।

পাশাপাশি এমন অনেক দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ আছেন যারা প্রচণ্ড আর্থিক কষ্ট ও অভাব অনটনের মধ্যে ধৈর্য ধরেছেন এবং খারাপ কাজে লিপ্ত হননি। তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে দুনিয়ায় ধৈর্য ধারণ ও কষ্ট সহ্য করার পুরষ্কার লাভ করবেন। অন্যদিকে এমন অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আছেন যারা দারিদ্রের অজুহাত দেখিয়ে চুরি-ডাকাতির মতো খারাপ কাজে লিপ্ত হন।  আয়াতের পরবর্তী অংশে  আল্লাহ  তায়ালার নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে ঈমান ও সৎকাজের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মানুষের সুন্দর বাড়ি, গাড়ি ও বিত্তবৈভবের দিকে না তাকিয়ে তাদের কর্মের দিকে তাকাও। তারা যদি সৎকাজ করে তাহলে তারা সফলকাম। এখানে তারা ধনী নাকি দরিদ্র সেটি মুখ্য বিষয় নয়। কিন্তু যদি তারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে খারাপ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তারা ধনী কিংবা দরিদ্র হোক তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বহু মানুষ সম্পদ ও সন্তানকে সৌভাগ্যের লক্ষণ মনে করে। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিরাই কেবল সৌভাগ্যবান ও সফলকাম।

২. সম্পদ ও সন্তান থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় বরং এগুলো কোন পথে ব্যবহার করা হলো সেটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি এগুলোকে সঠিক পথে অর্থাৎ ঈমানের সঙ্গে সৎকাজের উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হয় তাহলেই তা মানুষকে সৌভাগ্য ও সাফল্য এনে দিতে পারে।

৩. কিয়ামতের দিন মানুষ দুনিয়ার মন্দকর্মের অনুরূপ শাস্তি লাভ করবে। অন্যদিকে সেদিন আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৎকর্মের বহুগুণ পুরষ্কার দান করবেন।# 

 

ট্যাগ

মন্তব্য