২০১৯-০২-১৭ ১৯:৪৮ বাংলাদেশ সময়

সুরা আল হাক্কা পবিত্র কুরআনের ৬৯ তম সুরা। মক্কায় নাজিল হওয়া এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৫২।

কিয়ামত বা পুনরুত্থানের কিছু আভাস, আদ ও সামুদ জাতিসহ অতীতের কোনো কোনো কাফির জাতির পরিণতি, ফেরাউনের দলবল ও লুত জাতির পরিণতি, ইমানদারদের সৌভাগ্য, সত্য-অস্বীকারকারকারীদের শাস্তি এ সুরার আলোচ্য বিষয়। পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র মর্যাদা আর মহত্ত্ব নিয়েও এই সুরায় বক্তব্য এসেছে।

এ সুরার নাম আল-হাক্কা হয়েছে প্রথম কয়েক আয়াতের শব্দ আল-হাক্কা হতে। বেশিরভাগ তাফসিরকারকের মতে এ শব্দের আভিধানিক অর্থ 'সুনিশ্চিত' হলেও এর বাস্তব অর্থ হল কিয়ামত বা পুনরুত্থান দিবস তথা বিচার-দিবস। 

সুরা হাক্কার প্রথম থেকে তৃতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: সুনিশ্চিত বিষয়। সুনিশ্চিত বিষয় কি?  হে নবী! আপনি কি কিছু জানেন সেই সুনিশ্চিত বিষয় কি?

-পবিত্র কুরআনে পার্থিব এ মহাবিশ্বের সমাপ্তি বা শেষ-দিনের কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইহকালের এ বিশ্ব-জগত যে একদিন শেষ হয়ে যাবে এবং শুরু হবে চরম উন্নত এক নতুন অথচ চিরস্থায়ী জগত, এ কথাটি মানুষের সব সময়ই মনে রাখা উচিত। কিয়ামত বা পুনরুত্থান ঘটার আগে ঘটবে বড় রকমের অনেক ঘটনা। বর্তমান এই জগত সেদিন লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যাবে এবং গড়ে উঠবে এক নতুন জগত। পুনরুত্থানের সেই জগতে প্রবেশ করবে সব মানুষ।  'সুনিশ্চিত' সেই দিনের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য বার বার শব্দটি ব্যবহার করে সুরা আলহাক্কায় বলা হয়েছে, সেই সুনিশ্চিত বিষয়টি কি?  বিষয়টির মহাগুরুত্ব তুলে ধরার জন্য মহানবী (সা)-কেও সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে তিনিও দিবসটি কেমন হবে তা পুরোপুরি জানেন না। এমন এক মহা-ভয়ঙ্কর দিবস সম্পর্কে তিনি যা কিছু জানেন তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এ দিবসের পুরো চিত্রের সামান্য অংশ মাত্র। আসলে কিয়ামতের ঘটনাগুলো পুরোপুরি জানা বা বোঝা দুনিয়ায় থাকা মানুষের জন্য সেরকমই অসম্ভব যেভাবে মায়ের পেটে থাকা ভ্রুণ বা শিশুর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় দুনিয়ার চাল-চিত্র বা অবস্থা। 

সুরা হাক্কায় এরপর সেইসব জাতির পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে যারা অবিশ্বাস করত কিয়ামত অথবা খোদায়ি শাস্তি। এ সুরার পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

অতঃপর সামুদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দিয়ে। এবং আদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্জাবায়ু দিয়ে।  

  • সামুদ জাতি বসবাস করত হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী কোনো এক পার্বত্য অঞ্চলে। তাদেরকে সতর্ক করার জন্য নবুওত দেয়া হয়েছিল হযরত সালেহ (আ)-কে। কিন্তু তারা কখনও ইমান আনেনি। বরং তারা দম্ভভরে বলেছিল, হে সালেহ! তুমি যে খোদায়ি শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা নাজিল কর! এ অবস্থায় এক ভয়াবহ বজ্র তাদের বাড়ি-ঘর ও প্রাসাদগুলোর ওপর নেমে আসে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওরা ধ্বংস হয়ে যায়।
  • আর আদ গোত্রের আবাস ছিল আরব উপদ্বীপ বা ইয়েমেনের 'আহক্বাফ' অঞ্চলে। তারা ছিল বেশ দীর্ঘদেহী ও শক্তির অধিকারী। তাদের বসতিগুলো ছিল বেশ সমৃদ্ধ এবং সবুজ-শ্যামল বাগ-বাগিচা-বেষ্টিত। হুদ নবী (আ) তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলেও এবং পাপাচার হতে দূরে থাকতে বললেও তারা এই মহান নবীর বক্তব্যকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। ফলে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সাত রাত ও ৮ দিন ধরে।  ফলে ধ্বংস হয়ে যায় আদ গোত্রের বসতি এবং তাদের দীর্ঘ ও শক্তিশালী দেহগুলো জীর্ণ-শীর্ণ ও ক্ষয়ে-পড়া শুকনো খেজুর গাছের মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই প্রবল খোদায়ী শাস্তির ফলে তাদের সেইসব সমৃদ্ধ ও জাকজমকপূর্ণ বসতি, বাড়ি-ঘর এবং বাগ-বাগিচার কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট থাকেনি।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ওই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন:  'এবং আদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝঞ্জাবায়ূ দিয়ে যা তিনি বইয়ে দিয়েছিলেন তাদের উপর সাত রাত্রি ও আট দিবস পর্যন্ত অবিরাম। আপনি তাদেরকে দেখতেন যে, তারা অসার খেজুর কান্ডের মত ভূপাতিত হয়ে রয়েছে। হে নবী! আপনি তাদের কোনো অস্তিত্ব দেখতে পান কি?' 

আদ  ও সামুদ জাতির খোদাদ্রোহিতার কাহিনী স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর আরও কয়েকটি জাতির খোদাদ্রোহিতার পরিণতিও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন,  ফেরাউন ও তার দলবলের খোদাদ্রোহীতার পরিণতিও তুলে ধরা হয়েছে সুরা হাক্কায়। এ সুরার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

'ফেরাউন, তাঁর পূর্ববর্তীরা এবং উল্টে যাওয়া বস্তিবাসীরা তথা লুতের জাতি গুরুতর পাপ করেছিল।'

ফেরাউন ও তার আগের তাগুতি শাসক এবং তাদের অনুগত সম্প্রদায়গুলোও বিভ্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারাও শির্ক বা অংশীবাদিতা, কুফর, জুলুম ও দুর্নীতির মত নানা পাপে জড়িয়ে পড়েছিল। আর মহান আল্লাহর নবীদের আহ্বানেও তারা একত্ববাদ ও সুপথ তথা ইমানের পথে ফিরে না আসায় মহান আল্লাহর শাস্তির শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। আর তাই এসব সম্প্রদায় পরবর্তী জাতিগুলোর জন্য শিক্ষার উৎস হয়ে আছে। 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য