২০১৯-০২-২০ ১৬:৫২ বাংলাদেশ সময়

গত আসরে আমরা সিফফিনের যুদ্ধ এবং হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাত নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর মূল্যবান চিঠি, বক্তব্য, দোয়া ও মুনাজাত নিয়ে সংকলিত কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করব।

হযরত আলী (আ.)-এর বক্তব্য নিয়ে সংকলিত ‘নাহজুল বালাগা’ নামক গ্রন্থ বহু শতাব্দি পর আজও চিন্তাবিদ, দার্শনিক, আলেম ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের জ্ঞানপিপাসা মেটায়। এই মূল্যবান গ্রন্থে তৌহিদ, আদ্‌ল, তাকওয়া, মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য, মুমিন, মুনাফিক, শয়তান, সৃষ্টির রহস্য, নারী-পুরুষ, বিশিষ্ট সাহাবীদের প্রশংসা, নবী-বংশের মর্যাদা, কুরআনে কারিমের কোনো কোনো আয়াতের ব্যাখ্যাসহ আরো অনেক মূল্যবান বক্তব্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। চিন্তাশীল যেকোনো মানুষের জন্য এই মূল্যবান গ্রন্থে রয়েছে এমন সব উপদেশ যা অধ্যয়ন করলে সঠিক পথের দিশা পাওয়া সম্ভব।

নাহজুল বালাগা গ্রন্থটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে হযরত আলী (আ.)-এর খুতবা ও নির্দেশসমূহ, দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে তাঁর চিঠি ও উপদেশসমূহ এবং তৃতীয় ভাগে রয়েছে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও শিক্ষণীয় বক্তব্য যা উচ্চমানের সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। অবশ্য বলে রাখা ভালো, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় বিভিন্ন যুদ্ধে, রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশে হযরত আলী (আ.) যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়নি। এমনকি প্রথম তিন খলিফার আমলে তিনি যেসব কথা বলেছেন তাও নাহজুল বালাগায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই মূল্যবান গ্রন্থে শুধুমাত্র শাসনকাজ পরিচালনার সময় আমিরুল মুমিনি আলী (আ.) যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছে। হিজরি ৪০০ সালে আরবি ভাষার বিশিষ্ট পণ্ডিত ও আলেম সাইয়্যেদ রাজি নিজের সাহিত্য-পিপাসা মেটাতে গিয়ে হযরত আলী (আ.)-এর বক্তব্যগুলো সংকলন করেন।

 

এদিকে, ইবনে আবি আল-হাদিদ ছিলেন সপ্তম হিজরির একজন প্রখ্যাত আলেম। হযরত আলী (আ.)-এর ভাষণ নিয়ে তিনি ২০ খণ্ডের যে নাহজুল বালাগা প্রকাশ করেন তা চিন্তাবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ছিলেন সে যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং আলী (আ.)-এর বক্তব্যের সাহিত্যের অতি উচ্চমান তাকে আকৃষ্ট করে।  তার সংকলিত নাহজুল বালাগা গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডে বসরার তৎকালীন গভর্নরকে হযরত আলী (আ.)-এর লেখা চিঠির উল্লেখ রয়েছে। ওই চিঠির বর্ণনা দিতে গিয়ে আল-হাদিদ লিখেছেন: চিঠিতে শব্দের পর শব্দ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, যেকোনো সাহিত্য বিশারদকে তা বিস্মিত করে। মনে হয় যেন, কেউ তাকে এই কথামালা সাজিয়ে দিয়েছে। পাথর ফেটে যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝর্ণাধারা বেরিয়ে আসে তেমনি এই চিঠির ভাষায়ও যেন সাহিত্যের ফোয়ারা ছুটেছে।  সোবহানআল্লাহ!মক্কার মতো একটি শহরে যে যুবক বেড়ে উঠেছেন এবং ভাষা শেখার জন্য যার তেমন কোনো শিক্ষক ছিল না তিনি বাগ্মিতায় অ্যারিস্টটল ও প্লেটোকেও হার মানিয়েছেন। বিজ্ঞ পণ্ডিতদের সঙ্গে ওঠাবসা না করেই তিনি সক্রেটিসকে ছাড়িয়ে গেছেন।

সাহিত্যিক উচ্চমানের কথা বাদ দিলে আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও নাহজুল বালাগা গ্রন্থের বক্তব্য খোদাপ্রেমী যেকোনো মানুষকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। হযরত আলী (আ.) যখন আল্লাহকে চেনার উপায় এবং তাঁর ঐশী গুণাবলী বর্ণনা করেন তখন পাঠকের কাছে মনে হবে সে কোনো ফেরেশতার ডানায় বসে ঊর্ধ্বাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। তিনি যখন উদাসীনতার ঘুমে বিভোর মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা বর্ণনা করেন এবং অতীত জাতিগুলোর পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেন তখন ভয়ে পাঠকের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে।  এই মূল্যবান গ্রন্থের ২২০ নম্বর খুতবায় বলা হয়েছে, প্রতিটি মানুষের অন্তরে আল্লাহ তায়ালার স্থান রয়েছে। তাঁকে স্মরণের মাধ্যমে বধির ব্যক্তি শ্রবণশক্তি ফিরে পায়, অন্ধ ব্যক্তি ফিরে পায় দৃষ্টিশক্তি এবং লাগামহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তির জীবনে ভারসাম্য ফিরে আসে।

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দ্বীনদারির ব্যাপারে হযরত আলী (আ.) যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন তা যেমন নাহজুল বালাগা গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছেন তেমনি ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়াদির পাশাপাশি ধর্মীয় সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর ব্যাপারে তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় ‘সহিফায়ে আলাভিয়া’ নামক গ্রন্থে। রজব, শাবান ও রমজান মাস’সহ সব আরবি মাসে একজন ঈমানদার মানুষ আল্লাহ তায়ালার কি কি ইবাদত করতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে এ গ্রন্থে। আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) যেসব দোয়া ও মুনাজাত আল্লাহর দরবারে করতেন তা যত্নের সঙ্গে এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। হিজরি দশম শতাব্দীর প্রখ্যাত শিয়া আলেম আব্দুল্লাহ বিন সালেহ সামাহিজি এই গ্রন্থ সংকলন করেন। আলেম ও শিক্ষক সমাজের কাছে এই মূল্যবান গ্রন্থের সমাদর রয়েছে এবং ইসলামি গবেষকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স গ্রন্থ। সহিফায়ে আলাভিয়া বইটিতে একশ’ পঞ্চাশটিরও বেশি দোয়া রয়েছে। কোনো কোনো চিন্তাবিদ এই গ্রন্থকে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া গ্রন্থের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

ইমাম আলী (আ.)-এর আরেকটি মূল্যবান গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘গুরারুল হাকিম ওয়া দুরারুল হাকিম।’ বইটির বাংলা ভাবানুবাদ দাঁড়াবে ‘শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাসমূহ ও মুক্তাসম ভাষণ।’ এই গ্রন্থটি সংকলন করেন পঞ্চম হিজরি শতকের বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষক ও ‘আমেদ’ শহরের বিচারক ‘আবুলফাতাহ নাসিরুদ্দিন আব্দুলওয়াহিদ বিন মুহাম্মাদ আমেদি।’ মুসলিম সাম্রাজ্যের তৎকালীন ‘আমেদ’ শহরটি বর্তমানে ‘দিয়ারবাকের’ নামে পরিচিত যেটির অবস্থান তুরস্কের কুর্দিস্তান অঞ্চলে। পরবর্তী যুগের স্বনামধন্য বহু আলেম ও পণ্ডিত এই গ্রন্থকে রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন যুগে ছাপাখানা না থাকায় সব বই-ই হাতে লেখা হতো। অল্পদিনের মধ্যেই সাড়া ফেলে দেয়ায় গুরারুল হাকিম ওয়া দুরারুল হাকিম গ্রন্থটিরও হাতে লেখা বহু কপি ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে।

বর্তমানে এই গ্রন্থের হাতে লেখা কপি ফ্রান্স, ব্রিটেন, তুরস্ক, ভারত ও ইরানে সংরক্ষিত রয়েছে। ইরানের কুদসে রাজাভি প্রদেশের একাধিক লাইব্রেরি, মজলিসে শুরায়ে ইসলামি এবং শহীদ মোতাহারি হাই স্কুলের গ্রন্থাগারে এই বইটির হাতে লেখা কপি সংরক্ষিত রয়েছে। ছাপাখানা আবিষ্কার হওয়ার পর ইরান, ভারতের মুম্বাই, লেবাননের সিডন, মিশর ও সিরিয়া থেকে সাত খণ্ডের গ্রন্থটি বহুবার মুদ্রিত হয়েছে। আরবির পাশাপাশি ফার্সি ও উর্দু ভাষায় বইটি অনুদিত হয়েছে। প্রখ্যাত শিয়া আলেম জামালুদ্দিন মোহাম্মাদ খানসারি এই গ্রন্থের ওপর বই লিখেছেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য