২০১৯-০২-২৭ ১৯:৫০ বাংলাদেশ সময়

প্রখ্যাত সুফি-সাধক, আলেম ও হাদিস শাস্ত্র বিশারদ খাজা আবদুল্লাহ আনসারি পদ্যময় বা ছন্দময় ভাষায় গদ্য লেখার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। গত পর্বে আমরা এ সম্পর্কে আলোচনা শুনেছি। সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন মূলত কবিতা মেশানো ফার্সি গদ্য রচনার জন্যই।

কবি হিসেবে খাজা আবদুল্লাহ সে যুগের বড় কবিদের সারিতে স্থান না পেলেও তার কবিতাগুলো পাঠক ও শ্রোতাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে বলে বেশিরভাগ সাহিত্য সমালোচকরাই স্বীকার করে থাকেন।

তাসাওউফের ক্ষেত্রে  খাজা আবদুল্লাহ'র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হল 'মানাজিলুস সায়িরিন'। খোদাপ্রেম সংক্রান্ত জ্ঞান ও খোদা-প্রেমের নানা পর্যায় সংক্রান্ত এ বইটি তিনি ফার্সি ভাষায় লিখেছিলেন হিজরি ৪৭৫ সনে। হাকিকাত বা খোদার প্রকৃত নৈকট্য অর্জনের ১০০টি পর্যায়ের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এই বইটিতে। এ বইটির পটভূমি হিসেবে ৪৪৮ হিজরিতে লেখা হয়েছিল 'রেসালেইয়ে সাদ মেইদ'ন' শীর্ষক বইটি।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির লেখা আরেকটি বইয়ের নাম 'জেম আলকালাম'। মো'তাজেলি ও আশআরি সম্প্রদায়ের যুক্তি-ভিত্তিক ধর্মীয় আলোচনা বা কালাম শাস্ত্রের বিরুদ্ধে আরবি ভাষায় এই বইটি লিখেছিলেন তিনি। নিশাপুরে এই দুই সম্প্রদায়কে প্রতিরোধ করতে গিয়ে খাজা আবদুল্লাহ এ বইটি লিখেছিলেন। দর্শন, কালাম শাস্ত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের বিরোধিতা করতেন খাজা আবদুল্লাহ। তার এই নীতি ও  জেম আলকালাম বইটি লেখার কারণে তিনি বেশিদিন নিশাপুরে থাকতে পারেননি। সেখানকার আলেম ও পণ্ডিতরা  খাজা আবদুল্লাহ'র প্রবল বিরোধী হয়ে ওঠায় তাকে এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়। 

'আদাব আসসুফিয়া ওয়া আসসালিকিইনাল তারিকুল হাক্ব'  খাজা আবদুল্লাহ'র লেখা আরেকটি বই। ১১ পাতার এ বইটি লেখা হয়েছে ফার্সি ভাষায়। বইটির আধুনিক মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয় ১৯৬০ সালে কায়রো থেকে।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ইমাম আহমাদ হাম্বলের জীবনী লিখেছেন আরবি ভাষায়। বইটির নাম 'রিসালাত মানাকিব ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল'। বইটি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে বাগদাদের একটি বিখ্যাত লাইব্রেরিতে।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির আরেকটি বইয়ের নাম 'কিতাবুল মাআরেফ'। খোদা-প্রেমের সাধনা সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে এ বইয়ে।  'রেসালেইয়ে ওয়ারেদাত' নামেরও একটি ছোট পুস্তিকা লিখেছিলেন  খাজা আবদুল্লাহ। আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার নানা পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে এই বইয়ে।

এসব বই ছাড়াও 'মুনাজাতনামেহ', 'নাসায়েহ', 'জাদুল আরেফিন', 'কানজুসসালিহিন', 'কালান্দারনামেহ', 'মুহাব্বাতনামেহ' ও 'হাফত হেসর' খাজা আবদুল্লাহ'র উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই।

খাজা আবদুল্লাহর লেখা প্রবন্ধগুলোতে রয়েছে নসিহত ও সতর্কবাণী। এসব প্রবন্ধ কবিতার নানা পংক্তিতে সমৃদ্ধ। 

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির আরেকটি বড় অবদান হল তিনি 'তাবাকাতুসসুফিয়া সু্ল্লামি' বা সুল্লামির তাবাকাতাসসুফিয়া শীর্ষক বইটি হেরাতি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। বিতর্ক ও প্রশিক্ষণের মজলিসে মুখে মুখে এ বইটির অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তার ছাত্ররা পরে এটি লিখে নেন। বইটি 'তাবাকাতুসসুফিয়া হারুভি' নামেই বেশি খ্যাত। এ বইটি থেকে তৎকালীন হেরাত অঞ্চলের ফার্সি গদ্য ও শব্দগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়।

খাজা আবদুল্লাহর নামে আরও অনেক বই দেখা যায়। কিন্তু এসব বইয়ের আসল লেখক কে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, বইগুলোর ভাষার স্টাইলের সঙ্গে খাজা আবদুল্লাহর ভাষার স্টাইল ও লেখার প্রকৃতির মিল নেই।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে মুনাজাতনামেহ বইটির রয়েছে বিশেষ খ্যাতি। এর মুনাজাতগুলো এমনই প্রেমময় ও গভীর আকুতি আর দরদে ভরা যে  অনেকেই তার লেখক বা রচয়িতার পরিচয় না জানা সত্ত্বেও তার অংশ-বিশেষ স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছেন এবং নিজস্ব প্রার্থনার সময় তা উচ্চারণ করছেন।

মুনাজাতনামেহ'র পংক্তিগুলোর শুরুতে বার বার এলাহি তথা প্রভু শব্দটি থাকায় এই কাব্য 'এলাহিনামেহ' নামেও খ্যাত।

আবদুল্লাহ আনসারির মুনাজাতের একটি নমুনা এখানে তুলে ধরছি:

এলাহি তুমি চিরস্থায়ী অক্ষয়-শক্তিধারী, অনন্য এক তুলনাহীন

দেখতে পারো সব কিছুই, জ্ঞানী সব অবস্থাতেই

শরিক হতে মুক্ত, ত্রুটি  হতে পবিত্র

মূল ওষুধ সব রোগের, আশা সব হৃদয়ের...

তুমি স্থান ও সময়ের গণ্ডী হতে মুক্ত স্বাধীন বাধা-বন্ধনহীন ...   

মুনাজাতনামেহ বা এলাহিনামেহ ফার্সি ইরফানি সাহিত্যের মৌলিক বই বা আকর-গ্রন্থ হিসেবে খ্যাত। খাজা আবদুল্লাহর মুনাজাত ও প্রজ্ঞাময় এবং খোদার প্রেমমূলক বক্তব্যে ভরপুর এ বইটির বেশ কয়েকটি সংস্করণ দেখা যায়। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণটি হচ্ছে আয়া সুফিয়া লাইব্রেরির। এটি লেখা হয়েছিল হিজরি ৮৫৫ সনে।  

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির পত্রসহ মুনাজাতনামেহ'র আধুনিক মুদ্রিত সংস্করণ প্রথমবারের মত প্রকাশ করা হয় তেহরান থেকে ফার্সি ১৩১৯ সন তথা ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান হুসাইন তাবান্দে গোনাবাদির প্রচেষ্টায়। পরে অধ্যাপক ওয়াহিদ দাস্তগেরদির সম্পাদনা ও নিবন্ধসহ এর দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ করা হয় খ্রিস্টিয় ১৯৭০ সনে। কাবুল থেকেও মুনাজাতনামেহ'র একটি ভিন্ন সংস্করণ প্রকাশ করা হয় ১৯৬২ সালে। তবে মুনাজাতনামেহ'র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণটি প্রকাশ করেছেন ডক্টর মুহাম্মাদ সারওয়ার মৌলায়ি ১৯৯৮ সনে।  এতে সংযুক্ত রয়েছে আবদুল্লাহ আনসারির পত্রগুলো।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির মুনাজাতনামেহ'র বেশ কয়েকটি ইংরেজি অনুবাদ ও সংস্করণও রয়েছে।

 খাজা আবদুল্লাহ নিজে মুনাজাতনামেহর প্রার্থনা বা বক্তব্যগুলো লিখে যাননি। বিভিন্ন সময়ে তার অনুরাগী ও ছাত্ররা এইসব বক্তব্য ব্যবহার করতেন এবং সেগুলোই পরে একটি সংকলন বা বই আকারে প্রকাশ করা হয়। খাজা আবদুল্লাহর অন্য অনেক বইয়েও একই ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় মুনাজাতনামেহ বইটির বক্তব্য তারই, অন্য কারো নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে পুরনো ফার্সি ইরফানি সাহিত্য-কর্মগুলোর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে খাজা আবদুল্লাহ'র মুনাজাতনামেহ'র গুরুত্ব অপরিসীম।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৭

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

ট্যাগ

মন্তব্য