২০১৯-০৩-০৩ ১৯:৪৯ বাংলাদেশ সময়

সুরা হাক্কার গত পর্বের আলোচনায় আমরা খোদাদ্রোহিতার কারণে আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংস হওয়ার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা শুনেছি। একইভাবে খোদায়ি শাস্তি নেমে এসেছিল ফেরাউন ও তার দলবলের ওপরও।

ফেরাউন ও তার দলবল তথা তার অনুসারীরা হযরত মুসা ও হারুন নবীর বিরোধিতা করেছিল জুলুম, শির্ক ও নানা ধরনের অবৈধ স্বার্থ আর পাপাচার অব্যাহত রাখার জন্য। একইভাবে লুত নবীর বিরোধিতা করে ধ্বংস হয়েছিল সাদুম অঞ্চলের অধিবাসীরা। তারা সমকামীতার মত মহাপাপে লিপ্ত ছিল। ফেরাউন ও তার দলবল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল নীল দরিয়ায় ডুবে। লুতের জাতি ধ্বংস হয়েছিল পাথরের বৃষ্টি বর্ষণে।

সুরা হাক্কা'র ১১ নম্বর আয়াতে নুহ নবীর সম্প্রদায়টির খোদাদ্রোহিতার কঠোর শাস্তির সেই কাহিনী সম্পর্কেও ইশারা বা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।  মহান আল্লাহ বলেছেন:

যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল,তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।                              

- নুহের জামানার সেই মহাপ্লাবনের সময় পানির উচ্ছ্বাস এতই তীব্র হয়েছিল যে কালো মেঘমালা আকাশকে ছেয়ে ফেলেছিল। আর এতই বৃষ্টি নেমেছিল যে, যেন আকাশ থেকেই বন্যার ঢল নামছিল এবং ভূপৃষ্ঠের নীচে থাকা সব ঝর্ণাগুলোও তাদের পানি উগরে দিতে থাকে। আর এইসব পানি একসঙ্গে মিশে যাওয়ায় পানির উচ্চতা হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী এবং সব কিছু তলিয়ে যায় পানির নীচে। বন-জঙ্গল,বাগান, ঘর-বাড়ি, প্রাসাদ, ক্ষেত-খামার ও সুউচ্চ পাহাড়-পর্বতও তলিয়ে যায় পানির নীচে। ফলে নুহের কিশতিতে আশ্রয়-নেয়া একদল মুমিন নর-নারী ও জীব-জন্তু ছাড়া অন্য সব মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়।

 

সুরা হাক্কার ১২ নম্বর আয়াতে অতীতের খোদাদ্রোহী জাতিগুলোর ওপর খোদায়ি শাস্তি নাজিলের কারণ সম্পর্কে ইশারা করা হয়েছে। এখানে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে অতীতের খোদাদ্রোহী জাতিগুলোর ওপর খোদায়ি শাস্তি নাজিলের কারণ হল যেন এসব ঘটনার স্মৃতিচারণ করা হয় এবং তা থেকে পরবর্তী যুগের মানুষেরা শিক্ষা নেয় ও কান এসব ঘটনাকে উপদেশ হিসেবে অনুধাবন করে। মহান আল্লাহ এভাবে মানুষকে শিক্ষা দিতে চান ও তাদেরকে পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিতে চান। 

সুরা হাক্কার পরবর্তী আয়াতে কিয়ামত বা পুনরুত্থানের কিছু লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। এই বিশ্ব-জগত ও তার ইহকালীন দিনকাল আর ব্যবস্থাপনা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যাবে এক প্রচণ্ড শব্দের মাধ্যমে যাকে 'শিঙ্গায় ফু দেয়া' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরা হাক্কার ১৩ থেকে ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে-একটি মাত্র ফুৎকার এবং এর ফলে পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে ও চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয়া হবে, সেদিনই হবে কিয়ামত। সেদিন আকাশ হবে বিদীর্ণ ও বিক্ষিপ্ত।

 

-অর্থাৎ যখন কিয়ামত হবে তখন কেবলই যে পাহাড়-পর্বত ও ভূভাগ ধ্বংস হয়ে যাবে তা নয়, একইসঙ্গে আকাশগুলোও হয়ে পড়বে লণ্ড-ভণ্ড। মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রগুলোও এ বিশাল ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্তমান ব্যবস্থাধীন আকাশ ও ভূমণ্ডল ধ্বংস হয়ে সেখানে গড়ে উঠবে এক নতুন জগত যা হবে উন্নততর, উচ্চতর ও অনেক বেশি পূর্ণতাময়।

 

সুরা হাক্কার ১৯ নম্বর আয়াত ও এরপর থেকে কিয়ামত বা বিচার-দিবসে মানুষের দুই শ্রেণীতে ভাগ হওয়া সম্পর্কে বক্তব্য এসেছে: একদলের আমলনামা তথা কাজ-কর্মের রেকর্ড দেয়া হবে ডান হাতে এবং অন্য একদলের কাজ-কর্মের রেকর্ড দেয়া হবে তাদের বাম হাতে। সেদিন যারা যা-যা করত ও যেসবে বিশ্বাস করত তা আল্লাহ তুলে ধরবেন। কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। এ প্রসঙ্গে সুরা হাক্কায় মহান আল্লাহ বলছেন: 

এরপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে,সে খুশি-মনে বলবেঃ নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ। আমি সুনিশ্চিতভাবে জানতাম যে কিয়ামত বা বিচার-দিবসের অস্তিত্ব রয়েছে; আর আমাকে বিচার-দিবসে ভাল ও মন্দ কাজের বিষয়ে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।

 

- বিচার-দিবস বা পরকালীন জবাবদিহিতার প্রতি বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে খোদাভীতি, অঙ্গীকার মেনে চলার ও দায়িত্বশীলতার অনুভূতি। আর এ বিষয়গুলো মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যে ব্যক্তি সৎ ও সদাচারী জীবন-যাপন করবে বিচার-দিবসের দিন তার কর্মতৎপরতার রেকর্ড বা আমলনামা ওই ব্যক্তির ডান হাতেই দেয়া হবে। ফলে তারা লাভ করবে চিরস্থায়ী সৌভাগ্য তথা বেহেশত। আর সেখানে থাকবে ফলমুলসহ সুখের অজস্র  উপকরণ। বেহেশতবাসীরা কোনো ফল খেতে ইচ্ছে করা মাত্রই তা হাতে চলে আসবে । আর যারা আমলনামা পাবে বাম হাতে তারা বলবেঃ হায় আমায় যদি আমার আমলনামা না দেয়া হতো! আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায়, আমার মৃত্যুই যদি শেষ হত। (সুরা হাক্কা: ২৫-২৭)

 

সেদিনের সেই মহাবিচারালয়ে যখন মহাপাপী, কাফির-মুশরিক, মুনাফিক ও খোদাদ্রোহীদের কদর্য ও নোংরা কাজগুলো ফাঁস হয়ে পড়বে তখন তাদের আফসোসের সীমা থাকবে না। সেদিন তারা আশা করবে যে হায়! অতীতের সঙ্গে যদি সম্পর্ক ছিন্ন করা যেত! কিংবা মৃত্যুর পরই যদি সব কিছু শেষ হয়ে যেত (!) তাহলে আজ এই মহাকলঙ্কের ভাগী হতাম না! তারা সেদিন আরও বলবে: আমার ধন-সম্পদ আমার কোন উপকারে আসল না! আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল! –এ অবস্থায় দোযখের প্রহরীরা শেকল ও হাতকড়া পরিয়ে তাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করবে।

 

সুরা হাক্কায় পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব ও এর বাণী আর বক্তব্যের সত্যতা তুলে ধরা হয়েছে। কুরআন যে মানুষের বাণীর মিশ্রণ থেকে মুক্ত তাও বলা হয়েছে। মহান আল্লাহর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ কুরআন নাজিল করা হয়েছে তাঁরই সর্বশেষ নবী ও রাসুল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র কাছে। মানবজাতির সব প্রজন্মের জন্যই তিনি আলোকোজ্জ্বল পথের দিশারি। পবিত্র কুরআন মহানবীর (সা) নবুওতের জীবন্ত সাক্ষ্য এবং তা আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুলের (সা) রেসালাতের সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ মহাগ্রন্থ সবার জন্যই আদর্শ ও সত্যের মানদণ্ড। পবিত্র কুরআনের বিষয়বস্তু মহান আল্লাহর অশেষ জ্ঞানের নিদর্শন। এরই আলোকে পবিত্র কুরআন মহানবীর (সা) বিরোধী মুশরিক ও কাফিরদের নানা অপবাদকে নাকচ করে দিয়েছে। কাফির-মুশরিকরা কখনও বিশ্বনবীকে অবজ্ঞাভরে 'কবি' বলেছে ও কখনও বলেছে যে তিনি গণক! কবিতা সাধারণত কল্পনা, অতিরঞ্জন ও অনুভূতি এবং ভালো-লাগা বা ক্ষোভ ও দুঃখের নানা উত্তেজনা বা শিহরণের প্রকাশ। তাই এর রয়েছে কল্যাণ ও অকল্যাণের নানা দিক। অথচ পবিত্র কুরআন একদিকে যেমন আকর্ষণীয় ভাষায় কথা বলে তেমনি তা আকাট্য যুক্তিতেও ভরপুর ও সুদৃঢ় নীতিমালা-কেন্দ্রীক।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/  ৩

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য