২০১৯-০৩-০৭ ২০:২৪ বাংলাদেশ সময়

'কুরআনের আলো' অনুষ্ঠানের আজকের পর্ব থেকে সূরা ফাতিরের তফসির উপস্থাপনা করা হবে। পবিত্র কুরআনে কারিমের ৩৫ নম্বর সূরা এটি। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরায় ৪৫টি আয়াত রয়েছে।  এ সূরার প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালার অন্যতম গুণবাচক নাম ‘ফাতির’ বা ‘স্রষ্টা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে এটির নামকরণ করা হয়েছে সূরা ফাতির। এ সূরার প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا أُولِي أَجْنِحَةٍ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ يَزِيدُ فِي الْخَلْقِ مَا يَشَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (1)     

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা এবং ফেরেশতাগণকে করেছেন বার্তাবাহকরূপে- তারা দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চার পাখাবিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টির মধ্যে যা ইচ্ছা যোগ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সক্ষম।” (৩৫:১)

সূরা হামদসহ আরো কয়েকটি সূরার মতো এই সূরাটি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের প্রশংসা দিয়ে শুরু হয়েছে। প্রশংসা এজন্য যে, এই বিশাল নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলসহ গোটা বিশ্বজগত তিনি সৃষ্টি করেছেন। অবশ্য এই সৃষ্টির কাজ তিনি সম্পন্ন করেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে। এই ফেরেশতারাও আবার আল্লাহরই সৃষ্টি। এক এক দল ফেরেশতাকে আল্লাহ তায়ালা এক একটি বিশেষ কাজে নিযুক্ত করেছেন। এ কারণে ফেরেশতাদের কাজ করার ক্ষমতা ও শক্তি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। এই আয়াতে এসব ফেরেশতাকে দুই-দুই, তিন-তিন অথবা চার-চার ডানাবিশিষ্ট সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর তা হলো- ফেরেশতারা বস্তুগত কোনো সৃষ্টি নয়। কাজেই সাধারণ অর্থে আমরা আকাশে উড়ন্ত পাখির যে ডানা দেখি সেই ডানার সঙ্গে ফেরেশতাদের যে ডানার কথা মহান আল্লাহ এই আয়াতে উল্লেখ করেছেন তার মিল নেই।

এখানে যে ডানার কথা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবস্তুগত বা অতীন্দ্রিয়। আমাদের উপলব্ধি ক্ষমতা দিয়ে তা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তারপরও মানুষের বোঝার সুবিধার্তে একটি বস্তুগত শব্দ প্রয়োগ করেছেন আল্লাহ তায়ালা।  আল্লাহর আর্‌শ, কুরসি, লৌহ্ ও কালাম যেমন ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় ফেরেশতাদের ডানার বিষয়টিও অনেকটা সেরকম।

এই আয়াতে ফেরেশতাদের কথা উল্লেখ করার পর বলা হচ্ছে, তোমরা একথা মনে করো না যে, মহান আল্লাহ কোনো একদিন এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করে এটিকে তার নিজের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। বিষয়টি মোটেই সেরকম নয়। আল্লাহর সৃষ্টি করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। তিনি যখন যা কিছু প্রয়োজন মনে করেন তা সৃষ্টি করেন এবং তার সৃষ্টি করার এই ক্ষমতা শেষ হবার নয়। তিনি মহাক্ষমতার অধিকারী এবং চিরস্থায়ী।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. মহান আল্লাহ কার্য ও কারণের ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। তিনি মহা ক্ষমতাধর ও শক্তিময় হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বজগত পরিচালনার কাজ ফেরেশতাদের দিয়ে করিয়ে থাকেন।

২. বিশ্বজগত সৃষ্টির কাজ থেমে নেই। আল্লাহ তায়ালা যখন যতটুকু প্রয়োজন মনে করেন এতে তখন ততটুকু যাগ করেন।

৩. ফেরেশতাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আলাদা আলাদা। তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগত পরিচালনার নানা কাজে নিযুক্ত করেছেন।

এবারে সূরা ফাতিরের দুই নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكْ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (2)

“আল্লাহ মানুষের জন্য অনুগ্রহের মধ্য থেকে যা খুলে দেন, তা ফেরাবার কেউ নেই এবং তিনি যা ফিরিয়ে নেন, তা তিনি ব্যতিত কেউ খুলে দিতে পারে না। তিনি মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (৪৫:২)     

আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি করার ক্ষমতা বর্ণনা করার পর এই আয়াতে তাঁর অসীম দয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সৃষ্টিজগতের প্রতি আল্লাহর দয়ার কোনো শেষ নেই এবং প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর দয়ার মুখাপেক্ষী। প্রতিটি সৃষ্টির বেঁচে থাকার প্রধান দু’টি অবলম্বন অর্থাৎ জীবন ও জীবিকা আল্লাহ তায়ালার দয়ার মাধ্যমে দেয়া হয়। তিনি যদি কাউকে দয়া করতে চান তাহলে তা ফেরানোর শক্তি কারো নেই। একইভাবে তিনি যদি কোনো সৃষ্টির প্রতি দেয়া রহমত বা অনুগ্রত তুলে নেন তাহলে সে ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে এমন কেউ এ বিশ্বজগতে নেই।

এই আয়াতে অনুগ্রহ বলতে ‘রহমত’ নামক যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা শুধু দয়া ও ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং একটি সৃষ্টির জীবন পরিচালনার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুর ব্যবস্থা করাকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ হিসেবে আমাদের জীবন পরিচালনার জন্য নিজেদের শরীর থেকে শুরু করে বস্তুগত ও আত্মিক- যত ধরনের উপকরণ পেয়েছি তার সবই আল্লাহর রহমত। তার এই অনুগ্রহ ছাড়া আমাদের পক্ষে এক মুহূর্ত বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহর দু’টি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে তাঁর অসীম ও অজেয় ক্ষমতা এবং অন্যটি তাঁর সার্বজনীন প্রজ্ঞা। মানুষের মধ্যে যারা ক্ষমতাধর তারা বেশিরভাগ সময় তাদের খেয়ালখুশি চরিতার্থ করার কাজে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নিজের মহাপরাক্রমের কথা উল্লেখের পরপরই প্রজ্ঞার কথা তুলে ধরে বুঝিয়েছেন, নিছক খেয়ালখুশির অনুসরণ করে তিনি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না। বরং অসীম জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ তাঁর বান্দাসহ সৃষ্টিজগতের জন্য যেভাবে ভালো মনে করেন সেভাবে তিনি তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তিনি যেখানে কল্যাণ মনে করেন সেখানে সৃষ্টি করেন ও দান করেন। পক্ষান্তরে তিনি যা দেয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন গোটা বিশ্বজগত একত্রিত হলেও তা আদায় করার শক্তি কারো নেই।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- আল্লাহর গজব বা ক্রোধের উপরে তাঁর রহমত অগ্রাধিকার পায়। আল্লাহ তায়ালার রহমতের ভাণ্ডার সব বান্দার জন্য উন্মুক্ত।  কিন্তু কোনো বান্দা যদি মন্দকর্মের কারণে নিজেই সেই রহমত পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে তার দায় আল্লাহর নয়।

২- আল্লাহ তায়ালা ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তার প্রজ্ঞার ভিত্তিতে। আল্লাহ যদি কোনো কাজ না করেন তার অর্থ এই নয় যে, তিনি অক্ষম। বরং বান্দার কল্যাণের স্বার্থেই তিনি তা করা থেকে বিরত থাকেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/আশরাফুর রহমান/৭

 

ট্যাগ

মন্তব্য