২০১৯-০৩-১০ ১৯:৪০ বাংলাদেশ সময়

আমরা বলেছিলাম, যেসব পরিবারে ধর্মীয় বিধি-বিধান চর্চা হয় সেসব পরিবারে নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্র্যিক বিপর্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। আর যদি ধর্মীয় চর্চা সুষ্ঠুভাবে না থাকে তাহলে দেখা দেয় বিচিত্র অবক্ষয়।

গত আসরে আমরা আরও বলেছিলাম অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় আসক্ত ব্যক্তির পরিবার বেশিরভাগ সময়ই রোগীর বৈশিষ্ট্যানুগ আচরণ করে, মানে অনেকটা রোগীর সন্তোষজনক আচরণ করে।

ঘরের অন্যান্য সদস্যরা পরিবারের টিকে থাকার প্রয়োজনে এই যে তাদের ওপর একরকম আরোপিত ভূমিকাগুলোকে মেনে নিতে বাধ্য হয় সেটা যে আসলে হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায় সে কথা কেউ খেয়াল করে না। পরিবারের সদস্যরা রোগীর অনুকূল আচরণ নিয়মিত চালিয়ে যাবার ফলে আসক্ত ব্যক্তিকে তার বিকারগ্রস্ত আচরণ অব্যাহত রাখতে সাহায্য করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট আজকাল অনেক পরিবারেই দেখা যায়। সেটা হলো পরিবারের ছেলে-মেয়েরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনাকে বাবা-মা মনে করে তাদের ভুল কিংবা অশোভন আচরণই এজন্য দায়ী। এজন্য অভিভাবকরা নিজেদেরকে পাপের অংশীদার বলে অনুতাপ বোধ করে। আর এই সুযোগের অপব্যবহার করে আসক্ত ছেলে-মেয়েরা।

ওই যে বলছিলাম ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের অনুতাপ বোধের সুযোগ নেয়, ওই সুযোগ নিয়ে তারা তাদের মাদকাসক্তির জন্য নিজেদের পরিবারকেই দায়ী করে এবং নিশ্চিন্তে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যায়।সুতরাং পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিবেকের লাঞ্ছনা আর অপরাধবোধটাই একরকম সহযোগিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাদের সন্তানদের মাদকপ্রীতির বদঅভ্যাসকে সমর্থন দিতে।একটু জটিল হয়ে গেল কথাটা। আসলে আমরা বোঝাতে চেয়েছি যে পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা এমন ধরনের আচরণ করেন যাতে তাদের মাদকাসক্ত সন্তানেরা নিজেদের অজান্তেই ওই আসক্তি চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়।

একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে। একজন মা,তিনি যখন মনে করেন যে তাঁর সন্তানের জন্য তিনি যথার্থ কিংবা ভালো একজন মা নন,কিংবা অনুতাপ থেকে বলেন যে তিনি তাঁর বাচ্চাদেরকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারেন নি,কিংবা কোনো মা যখন মনে করেন যে তিনি তাঁর সন্তানদেরকে যথেষ্ট ভালোবাসা,আদর, সোহাগ,স্নেহ দিতে পারেন নি,সে কারণেই তার সন্তান মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। কিংবা তিনি চেষ্টা করছেন তাঁর সন্তান যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে সেই ব্যাপারটা গোপন করতে অথবা সন্তানের উচিত ছিল যেসব দায়-দায়িত্ব পালন করার সেসব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন।

বাবা মা যে সন্তানের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার জন্য নিজেদের দায়ী করছেন তাই নয়, এমনও হচ্ছে যে মাদকাসক্ত সন্তানকে টাকা-পয়সা দিয়েও সহযোগিতা করেন। সন্তানের জীবনযাপনের খরচ নির্বাহ করেন কিংবা সন্তানের সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতিও সামাল দিচ্ছেন। বাবা-মায়ের এ ধরনের উদার আচরণের ফলে মাদকাসক্ত সন্তানেরা তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা না ভেবে উল্টো বরং দেদারসে তাদের মাদকতার নেশায় আরও বেশি বুঁদ হয়ে পড়ে। অপরদিকে মাদকাসক্ত সন্তানের পরিবারের সদস্যরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া সদস্যের প্রভাবে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হয়ে পড়ে। তারাও হতাশায় ভুগতে থাকে, বিরক্ত হয়ে পড়ে, উদ্বেগ-উত্তেজনায় অনেক সময় সহিংস হয়ে পড়ে। একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্তের মাধ্যমে ব্যাপক উৎকণ্ঠা ছড়ায়। এর কারণ হলো মাদকাসক্ত সদস্যকে তার বদঅভ্যাস থেকে ফেরাতে পরিবারের অন্যান্যরা যতোই চেষ্টা তদবির করুক না কেন সে তাতে কোনোরকম কানই দেয় না।

সে তার কষ্টদায়ক স্বভাব অনুযায়ী তার কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে। এ কারণে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পারিবারিক ঐতিহ্য ও মান-সম্মান সুরক্ষার স্বার্থে চেষ্টা চালায় নিজেদের পরিবারের সমস্যা থেকে অন্যদের দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতে বা গোপন করতে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো এই গোপন করা বা দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখার মতো লুকোচুরি মাদকাসক্তের কোনোরকম উপকারে তো আসেই না বরং মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া সন্তানের বিষন্নতা ও অক্ষমতাকেই আরও বেশি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে একটি পরিবার ইচ্ছে করলে তাদের মাদকাসক্ত সন্তানের পাশাপাশি অন্যান্য সদস্যকেও মাদকে আসক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন হলো সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেয়া। প্রথমেই যেটা করতে হবে তা হলো অভিভাবকদের মাদক সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। কত রকমের মাদক রয়েছে, সেগুলোর ব্যবহার পদ্ধতি, কারণ, মাদকে আসক্তির প্রাথমিক প্রভাবগুলো এবং লক্ষণ ও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।                               

বাবা-মাকে আরও বুঝতে হবে যে সন্তানেরা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলী। তারা জানতে চাইবে মাদকদ্রব্য সম্পর্কে। এ বিষয়ে বিচিত্র প্রশ্ন তারা করবে। এমনও হতে পারে কোনো একদিন কোনো এক সন্তান তার বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে বসলো: আচ্ছা, তোমরা কি কখনো মাদকদ্রব্য সেবন করে দেখেছো? এরকম প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য বাবা-মাকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো এটা একটা উত্তম সুযোগ বাবা-মা কেন মাদকদ্রব্য সেবন করেন নি বা করেন না সেটা অত্যন্ত সহজ সুন্দর ভাষায় সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। আর যদি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েই থাকেন তার কারণও যথাযথভাবে সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। এরপর বাবা-মা কোনোভাবেই আশা করতে পারেন না যে তাদের সন্তান একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না।

সুতরাং এতো বেশি ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয় যাতে সন্তানের ভেতরে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, সন্তানকে মাদক থেকে ফিরিয়ে রাখার সবচেয়ে উত্তম ও কার্যকরী উপায় হলো তাদেরকে ভালোবাসা। শুধু সময় দিলেই চলবে না বরং তাদেরকে বোঝাতে হবে যে কতোটা ভালোবাসেন তারা। সেইসঙ্গে সবসময় তাদের সুখে দুখে প্রয়োজনে কাছে থাকতে হবে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে হবে। ভালোবেসে সন্তানকে যদি কোনো কিছু বলা হয়, আদেশ করা হয় তাহলে সন্তান তা অনুসরণ না করে পারে না। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ১০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন 

ট্যাগ

মন্তব্য