২০১৯-০৪-২৬ ১৭:০৫ বাংলাদেশ সময়

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের নাম শুনেছো। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ তাকে ন্যায়পরায়ন বাদশাহ হিসেবে তুলে ধরলেও তিনি ছিলেন একজন জালিম শাসক। তার শাসনামলে নবীবংশের মহান ইমামদের ওপর জুলুম-নির্যাতন এবং আলেম ও প্রতিবাদীদের কারাগারে নিক্ষেপ ও হত্যা বহু ঘটনা ঘটেছে। 

একবার খলিফা হারুনুর রশিদ কবি আবুল আতাহিয়াকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কবি সেখান থেকে খলিফাকে একটি চিঠি পাঠান। চিঠির একটি অংশে তিনি লিখেছিলেন- "আল্লাহর কসম! জেনে রেখ, অত্যাচার স্বয়ং অত্যাচারীর জন্যই ভয়ঙ্কর অমঙ্গল ডেকে আনে। অত্যাচারী সব সময়ই অসৎ। ওহে জালিম! কিয়ামতের দিন যখন আমরা একত্রিত হব, তখন কে প্রকৃত ঘৃণিত তা তুমি জানতে পারবে।"

খলিফা হারুনুর রশিদের কথা যখন উঠলই তখন তার আমলের একজন বিখ্যাত আলেমের কথা বলব। ওহাব ইবনে উমার নামের ওই আলেমকে খলিফা হারুন বাগদাদের প্রধান বিচারপতি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই আলেম একজন জালিম শাসককে সহযোগিতা করতে চাননি বলে বাকী জীবন ‘পাগল' হবার ভান করে রাজদরবার থেকে দূরে থাকেন। পরবর্তীতে তিনি ‘বহলুল পাগল' নামেই পরিচিত হন।

আজকের আসরে আমরা সেই ঘটনাটিসহ দুটি ঘটনা তোমাদেরকে শোনাব। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

আব্বাসীয় বংশের পঞ্চম খলিফা হারুনুর রশিদ একবার বাগদাদে একজন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে চাইলেন। কাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায় এ নিয়ে তিনি তার সভাসদদের সাথে পরামর্শ করতে বসলেন। সবাই বলল: ওহাব ইবনে উমার অর্থাৎ বহলুলের চেয়ে এই পদের যোগ্য আর কেউ নেই। কারণ তিনি একজন নামকরা আলেম ও ফকীহ ব্যক্তি। সবার পরামর্শে খলিফা হারুন বহলুলকে ডাকলেন। তাকে উদ্দেশ করে বললেন, "ফকীহ সাহেব! আপনাকে আমরা প্রধান বিচারপতি বানাতে চাই। এত বড় পদে বসতে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি নেই।"

বহলুল খলিফার এ প্রস্তাবে মোটেই রাজি ছিলেন না। কারণ তিনি জানতেন, জালিম শাসকের অধীনে এ ধরনের কোনো দায়িত্ব খেয়ানত ও গোনাহ'র ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, কোনো জালিম শাসককে সহযোগিতা করার পক্ষপাতি তিনি ছিলেন না। তাই তিনি বললেন: "মাননীয় খলিফা, আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না। কারণ আমি নিজেকে এ কাজের যোগ্য মনে করি না।"

খলিফা বললেন: "কিন্তু বাগদাদের লোকেরাতো আপনাকেই এই কাজের জন্য সবচেয়ে যোগ্য মনে করে। তাদের পরামর্শেই তো আমি আপনাকে ডেকেছি।"

বহলুল বললেন: না, না তারা ঠিক বলেনি। আমার যোগ্যতার ব্যাপারে তারা আমার চেয়ে বেশী জানে না। এরপরও যদি আপনি মনে করেন যে, আমি মিথ্যা বলছি তাহলে আমাকে বিচারক বানানো ঠিক হবে না। কারণ কোনো মিথ্যাবাদী বিচারক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

বহলুলের সাহস ও যুক্তি দেখে খলিফা খানিকটা অবাক হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বহলুল ইচ্ছে করেই দায়িত্ব এড়াতে চাইছে। খলিফা হারুন এবার ভয়ভীতি দেখানোর কৌশল নিলেন। রেগে গিয়ে বহলুলকে বললেন, তুমি যত তাল-বাহানাই করো না কেন, আমার আদেশ তোমাকে মানতেই হবে। নইলে তোমাকে চরম শিক্ষা দেব।

অবস্থা বেগতিক দেখে বহলুল বললেন- আমাকে একদিন সময় দিন। আপনার প্রস্তাবটা নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করি। তারপর সিদ্ধান্ত জানাই।

খলিফা বললেন: ঠিকাছে! তোমাকে একদিনের সময় দিলাম। তবে মনে রেখ- আমার সিদ্ধান্ত তোমাকে মেনে নিতেই হবে।

এরপর বহলুল বাদশাহ হারুনের দরবার থেকে বের হয়ে এলেন। বাসায় এসে চিন্তা-ভাবনার পর তিনি অদ্ভুত এক কৌশল গ্রহণ করলেন। কৌশল অনুযায়ী পরদিন সকালে তিনি পাগলের বেশ ধরে লম্বা একটা লাঠি নিয়ে বাজারে গেলেন। মানুষজন দেখল, বহলুলের কাপড়-চোপড় ঠিক নেই। হাতের লাঠিতে সওয়ার হয়ে তিনি চিৎকার করে বলছেন- 'এই তোমরা আমরা সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। নইলে আমার এই ঘোড়া তোমাদেরকে লাথি মেরে ফেলে দিতে পারে। তখন কিন্তু আমার কোন দোষ দিতে পারবে না।'

একজন বিজ্ঞ আলেম লাঠিকে ঘোড়া বানিয়ে অদ্ভুত আচরণ করছে দেখে মানুষজন অবাক হয়ে গেল। তারা বলাবলি করতে লাগল, বহলুল পাগল হয়ে গেছে। তাদের একজন গিয়ে হারুনুর রশিদের কাছে এই খবর দিল। হারুন সব শুনে বললেন- তোমরা যা বলছ তা সত্য নয়। বহলুল পাগল হয়নি বরং সে দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কাছ থেকে পালাচ্ছে।

এ ঘটনার পর খলিফা হারুন বহলুলকে আর বাগদাদের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিলেন না। বহলুলও দায়িত্ব এড়ানোর জন্য বাকী জীবন পাগলের বেশেই কাটিয়ে দেন।

বন্ধুরা, এবার আমরা খলিফা হারুনুর রশিদ, তার স্ত্রী জোবায়দা ও বহলুলকে নিয়ে আরেকটি গল্প শোনাব।

খলিফা হারুনুর রশিদ একটি ভ্রমণে বের হলেন। সঙ্গে বেগম জোবায়দা ও পাইক-পেয়াদা প্রহরীর দল। হঠাৎ বহলুল, হারুনের দিকে কিছু বলতে এল। খলিফার অনুমতি পেয়ে কাছে এসে বলল:

বহলুল: বেহেশ্‌ত কিনবে? 

খলিফা : কত দাম? 

বহলুল: লাখ টাকা

খলিফা: কোথায় তোমার বেহেশ্‌ত? 

এসময় বহলুল হিজিবিজি আঁকা একটি মলিন কাগজ বাদশাহর সামনে তুলে ধরল। কাগজটি দেখে অবজ্ঞার হাসি হেসে হারুন বলল: বহলুল, পাগলামির আর সময় পেলে না!

বহলুল সরে গিয়ে এবার কাগজটা বেগমের কাছে ধরল। বেগম কোনো কথা না বলেই গলা থেকে হীরার হার খুলে বহলুলকে দিল। বহলুল হারটি নিয়ে চলে গেল। 

এ ঘটনার কিছুদিন পরের কথা। বাগদাদের আদালতে প্রচণ্ড ভিড়। জনতার প্রায় সবাইই কাঙ্গাল! লাখ টাকা দেনার দায়ে আলী হুসাইন সওদাগরের বিচার হবে। ধনী বন্ধুরা কেউ আসেনি। অথচ এক সময় তার দস্তরখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। ধনী-গরিব সবাই সেখানে পোলাও-কোর্মা খেয়েছে এক সময়! আলী হুসাইনের কারাদণ্ডের ঘোষণা শুনে গরীব-দুঃখী হাহাকার করে ওঠে। হঠাৎ বহলুল সেখানে এসে বলল: 'আমি টাকা দেব।' বহলুল ঋণ শোধ করে দেওয়ার পর মুক্ত হলো আলী হুসাইন!

এ ঘটনার কয়েকদিন আগের কথা। রাজপুরীতে খলিফা হারুনুর রশিদ, বেগম জোবায়দাকে বলছেন: কতটা বোকা হলে লাখ টাকার হীরার হার দিয়ে একটা পচা কাগজ কেউ কিনতে পারে?

এ কথা শুনে বেগম বললেন: বেহেশ্‌ত কিনেছি। 

খলিফা: বহলুল একটা পাগল। আর তুমি তারচেয়েও বড়! 

বেগম: কিন্তু আমি তাকে সত্যবাদী বলেই জানি। 

খলিফা: ও একটা বড় বাটপার!

বেগম: কিন্তু আমি তাকে সরল বিশ্বাসে হার দিয়েছি। আল্লাহ আমার দিল দেখবেন। 

খলিফা: তোমরা মেয়েরা যে কি আজব! মেয়েলোকদের বুদ্ধির এই হল বহর! কথা বলে কোনো লাভ নেই!

রাজপুরীতে হাহাকার! জোবায়দা মারা গেছে। হারুনও কাঁদছেন। সমাহিত হলেন রানি। হারুন শেষবারের মত রানির মুখ দেখতে চাইলেন। কবরে নেমে দেখেন লাশ নেই। আছে বড় এক সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পথে এগিয়ে দেখলেন এখানে যেন এক বেহেশ্‌তি উদ্যান! এমন মধুর বাতাস ও পাখিদের মিষ্টি কলতান! কিন্তু জোবায়দা কোথায়?

সামনে এক বালাখানা। আর তারই এক জানালায় দেখা গেল রানিকে! রানি তার দিকে চেয়ে আছেন। হারুন দৌড় দিয়ে ঢুকতে চাইলেন প্রাসাদে। কিন্তু দারোয়ান বাধা দিল। খলিফার রাগ হল। তবুও অনুনয় বিনয় করে বললেন: আমার সব রাজত্ব তোমায় দেব, আমাকে আমার বেগমের কাছে যেতে দাও।

দারোয়ান কর্ণপাতও করল না। হারুন কেঁদে দিয়ে বললেন: জোবায়দা! আমাকে ভেতরে নিয়ে যাও।

রানি বললেন: এটা সেই বেহেশ্‌ত যা আমি হারের বদলে কিনেছি। এখানে অন্যের আসার অধিকার নেই।

খলিফা কাতরভাবে কেঁদে উঠলেন। ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশে রানিও ঘুমে। হারুনের বালিশ চোখের পানিতে ভিজে আছে। 

ভোর বেলায় দরবারে এসে হারুন প্রথমেই নির্দেশ দিলেন বহলুলকে দরবারে হাজির করতে। বহলুল আসল। খলিফা বললেন: এসো বহলুল, এসো এখানে আমার পাশে বস। 
বহলুল : কি গো ! কি জন্যে ডেকেছ! গর্দান নেবে নাকি- তোমাদের তো ওই একটাই কাজ! হি হি হি হি!

খলিফা : না বহলুল! তুমি বেহেশ্‌ত বিক্রি করবে? 

বহলুল : নাগো না! তোমার বাদশাহী দিলেও না!

খলিফা: তাহলে বেহেশত কিসে পাওয়া যায়? 

বহলুল : সরল বিশ্বাসে। আমি যাই।

বন্ধুরা, চমৎকার একটি শিক্ষণীয় গল্প শুনলে। এটি নেওয়া হয়েছে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘রকমারি’ থেকে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৬

ট্যাগ

মন্তব্য