২০১৯-০৫-০৭ ১৭:১১ বাংলাদেশ সময়

হিজরি ষষ্ঠ শতকের তথা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামির পুরো নাম শেইখ নিজাম উদ্দিন আবু মুহাম্মাদ ইলিয়াস বিন ইউসুফ। হিজরি ৫৩০ থেকে ৫৪০ হিজরির কিংবা খ্রিস্টিয় ১১৩৫ থেকে ১১৪৫ সনের কোনো এক বছরে তার জন্ম হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়।

ফার্সি সাহিত্যে তিন জন নিজামি বা নিজাম নামের ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তাদের একজন হচ্ছেন সমরখন্দের নিজাম ই আরোদি যিনি চাহার মাকালা বা আলোচনা চতুষ্টয় নামক সাহিত্য-কর্মের জন্য খ্যাত। দ্বিতীয় জন সিয়াসাতনামেহ’র লেখক নিজামুল মুলক এবং তৃতীয় জন গন্জের কবি নিজামি। আমরা এই শেষোক্ত নিজামি নিয়েই আলোচনা করব।

নিজামি তার ছদ্মনাম। প্রাচীন ইরানের গঞ্জ শহরে তার জন্ম হয়েছিল। (গঞ্জ অঞ্চলটি বর্তমানে আজারবাইজানের অংশ)। নিজামি জীবনের বেশিরভাগ সময় এই গঞ্জে ছিলেন বলে তাকে বলা হয় গঞ্জাভি নিজামি। তবে নিজামি ইরানের কোম বা কুম অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন বলেও বর্ণনা দেখা যায়।

নিজামি ফার্সি কাব্য-সাহিত্যের এক অমর জ্বলজ্বলে তারকা। ফার্সি কাব্য সাহিত্যে নিজামির অবদান কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে এবং তা কখনও অবলুপ্ত হবে না। ফার্সি সাহিত্যের সমঝদার ও বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন: যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে ততদিন ফেরদৌসির শাহনামা,নিজামির পাঞ্জ গঞ্জ,জামিরহাফত্‌ আওরঙ্গ  আর রুমির ‘মসনবি’ মহাকালের ঘর্ষণেও মুছে যাবে না।

নিজামির পাঞ্জ গঞ্জ তথা 'পাঁচ রত্ন' ‘খামসেইয়ে নিজামি’ নামে খ্যাত। পাঁচটি সিরিজ কাব্যের এই মহাসংকলনের  প্রথম গ্রন্থ ‘মাখজানুল আসরার’ বা রহস্যময় গুদামখানা প্রকাশিত হয় খ্রিস্টিয় ১১৭৯ সালে। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে বইটিতে। আর এইসব আলোচনা বিজ্ঞান-ভিত্তিক ও দার্শনিক ভাবনা-প্রসূত। বলা হয় যে প্রখ্যাত মরমী কবি সানাইয়ের ‘হাদিকাতুল হাকিকাত’ বা 'সত্যের বাগিচা' শীর্ষক বইটির প্রভাবেই নিজামি ‘মাখজানুল আসরার’ শীর্ষক বইট রচনা করেন।

‘মাখজানুল আসরার’ রচনার পর নিজামির পাঁচ-রত্নের দ্বিতীয় বই তথা ‘খসরু ওয়া শিরিন’ বের হয়। এর আগেও অনেকেই রোমান্স-ভিত্তিক কাব্য রচনা করেছেন। কিন্তু রোমান্স-ভিত্তিক এই কাব্যের কাব্য-গুণ এতোই উন্নত যে ফার্সি সাহিত্যে একমাত্র ফেরদৌসির ‘ইউসুফ-জোলায়খা’ এবং মূল পাহলাবি ভাষায় লিখিত ও পরে ফার্সিতে অনূদিত ‘ওয়াইসা ও রামিন’ ছাড়া অন্য কোনোটির সাথেই তুলনা হতে পারে না এই কাব্যের।

কাসিদা,গজল ও খণ্ড-কবিতার সমষ্টি নিয়ে নিজামির কাব্য-সংকলন বা দিওয়ান বের হয় ১১৮৮ খ্রিস্টাব্দে। অনেকে মনে করেন এটাই নিজামির পাঁচ কাব্য-সিরিজের প্রথম কাব্য,মাখজনানুল আসরার এই সিরিজের বাইরের কাব্য। দিওয়ানের মোট ছত্রের সংখ্যা বিশ হাজার। প্রায় একই সময়ে বের হয় নিজামির ‘পাঞ্চ গঞ্জ’ সিরিজের তৃতীয় রোমান্স-কাব্য ‘লায়লা ওয়া মাজনুন’। বিশেষজ্ঞরা নিজামির এই কাব্যটিকেও প্রায় অতুলনীয় বলে মনে করেন।

‘লায়লা ওয়া মাজনুন’ প্রকাশের এক বছর পর বের হয় নিজামির গঞ্জ-সিরিজের দুই খণ্ডের চতুর্থ কাব্য সিকান্দারনামা বা আলেক্সান্ডারের দুঃসাহসিক অভিযান। শাহনামার অনুকরণে লেখা এ কাব্যটির প্রথম খণ্ড বা ইকবালনামায় এসেছে আলেক্সান্ডারের বিজয় অভিযানের সাফল্য। আর এ কাব্যের দ্বিতীয় খণ্ড তথা শরাফনামেহ-তে তুলে ধরা হয়েছে আলেক্সান্ডারের জীবন-দর্শন।

নিজামির পাঁচ-কাব্য সিরিজের সর্বশেষ কাব্য হচ্ছে 'হাফত্ পেইকার' বা সাত রাণীর মুখ।  এ কাব্য বাহরামনামেহ নামেও পরিচিত। রসালো এই কাব্য-কাহিনীতে তুলে ধরা হয়েছে সাসানিয় সম্রাট বাহরাম ও তার সাত স্ত্রীর কাহিনী। তার সাত রাণীর একজন ছিলেন ভারতের,একজন চীনের,একজন খাওয়ারেজমের,একজন রাশিয়ার ও পারস্যের এবং বাকিরা ছিলেন পশ্চিমা দেশগুলোর। আর প্রত্যেক রাণীর জন্যই সম্রাট বাহরাম তাদের নিজ নিজ দেশের অনুকরণে প্রাসাদ তৈরি করে দিয়েছিলেন। সম্রাট প্রত্যেকের ঘরে এক রাত করে থাকতেন এবং সেই রাতে রাণী তার নিজের তৈরি গল্প সম্রাটকে শোনাতেন। সংক্ষেপে এই হচ্ছে হাফত্ পেইকারের কাহিনী। কাহিনী শেষে থাকত বাহরামের নিষ্ঠুর ও অবিচারপূর্ণ শাসনের বর্ণনা বা ব্যাখ্যা এবং তার মৃত্যুর পরিণতি। সাত রাণীর কাহিনীর সাতটি কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে রোমান্টিক ও আকর্ষণীয় কাহিনী ভারতীয় রাজকন্যার কাহিনী। এই কাহিনীগুলো আরব্য উপন্যাসের হাজার রাতের কাহিনী তথা আলিফ-লায়লার কাহিনীগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

নিজামির সাহিত্য-কর্ম যে কত মূল্যবান তা পরবর্তীকালের প্রখ্যাত কবি শেখ সাদি ও হাফিজের গজলের মধ্যেও পেয়েছে স্বীকৃতি। সাদি বলেছেন:

নিজামি গিয়েছে চলে,আমাদের মধ্যমণি;তাঁর

অমর সেই আত্মা ঘিরে নামুক সে প্রশান্তি আল্লাহর।

পবিত্র শিশির আর পৃথিবীর বহুমূল্য হীরে-

আপন জ্যোতিতে-জ্বলে ধরা থেকে গিয়েছে যে ফিরে।

নিজামি যে ফার্সি সাহিত্যের মধ্যমণি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কি বর্ণনা,কি প্রকাশ-ভঙ্গী,কি দর্শন-চিন্তা সব মিলিয়ে নিজামির সাহিত্য এক অনবদ্য মূল্যমানের প্রকাশ ঘটিয়েছে। নিজামির অন্তর্দৃষ্টি ছিল খুবই প্রখর এবং তা ছিল রোমান্স তৈরির খুবই উপযোগী। খসরু ও শিরিন কাব্যে তাদের প্রেমের গভীরতা প্রকাশ পায় শিরিনের মুখে এভাবে: সুরার পাত্র ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও

আমাকে তোমার সুরা-সাকি করে নাও।

শিরিনকে যদি তুমি ভালোবাস ঠিক-

ভালবাসা তার সুরার চেয়েও বেশি জেনো।

একইভাবে নিজামি 'লায়লা ওয়া মজনুন' নামক রোমান্স-কাব্যে এমন রোমান্টিকতা সৃষ্টি করেছেন যে তা পড়ে পাঠক-পাঠিকা মুহূর্তের জন্য হলেও প্রেম-আবেগে অশ্রু বিসর্জন করে। মজনুন তার প্রেম-আবেগ জানাচ্ছে এভাবে:

বাতাসে যদি বা তোমার শ্বাস না থাকে

নিব না সে শ্বাস বলো গো একথা তাকে।

তোমার শ্বাসেই আমার জীবন বাঁচে

আমার জীবন তোমার মাঝেই আছে

যতদূরে থাকি ক্ষতি বা কিসের, তাতে-

আমার এ আত্মা রয়েছে তোমার হাতে।

ফার্সি সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল নিজামি ইন্তেকাল করেছিলেন ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৭

ট্যাগ

মন্তব্য