২০১৯-০৫-১১ ২০:২৩ বাংলাদেশ সময়

দুই একটি দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে দলটির তেমন কোনো ক্ষতি হবে না বা ভোটেও প্রভাব পড়বে না। তবে মনস্তাত্ত্বিক একটা প্রভাব পড়বে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ইলিয়াস খান।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির এমপিদের শপথ নেয়া এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ না নেয়াসহ কিছু বিষয়ে রহস্য রয়েছে, রয়েছে প্রশ্ন। তবে এটি হয়তো তাদের রাজনৈতিক কোনো কৌশলের অংশ। যারা শপথ নিয়েছেন তাদের ওপর সরকারের চাপ ছিল।

সরকারি দলের যারা বলছেন বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে তারা একথা বলে আত্মতুষ্টি পেতে পারেন তবে তারা বাস্তববাদী নয় বলে মন্তব্য করেন ইলিয়াস খান। তিনি বলেন বিএনপির ব্যপক জনসমর্থন আছে ও প্রান্তিক মানুষের দল। তাদের ওপর সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের কারণে দলটির সমর্থন আরও বেড়েছে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। 

রেডিও তেহরান: জনাব ইলিয়াস খান, বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরইমধ্যে আন্দালিব রহমান পার্থর দল জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আন্দালিব রহমান পার্থ

ইলিয়াস খান: আপনি আন্দালিব রহমান পার্থর যে দলটির নাম বললেন 'বিজিপি' সেই দলটি ২০ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ছিল। দলটি একধরনের প্রত্যাশা থেকেই ২০ দলীয় জোটে ছিল। কিন্তু নানাকারণে  গত ১২ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতায় নেই। সে কারণে 'বিজিপি'র হয়তো একধরনের আশাহতের ঘটনা ঘটেছে। আর সে জন্যেই তারা ২০ দলীয় জোট থেকে সরে গেছে। উপরন্ত বিজিপির ২০ দলীয় জোট ছাড়ার পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে বলেও আমার মনে হচ্ছে। কারণ আমাদের এখানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে কিভাবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেয়া যায় সে ধরনের চেষ্টা ক্ষমতাসীনদের থাকে। আমরা জানি যে, বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে দুটি বড় দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তারা চাচ্ছে যে করেই হোক বা যেভাবেই হোক বিএনপিকে আরও দুর্বল করে দেয়া।

আমরা জানি যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল। দেশের বিশাল অংশের মানুষ এই দলের সমর্থক। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে বিজিপি'র চলে যাওয়ায় বিএনপির তেমন কোনো ক্ষতি হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে অন্যান্য যেসব দল আছে তাদের খুব বেশি জনসম্পৃক্ততা ও জনসমর্থন নেই। বিএনপি তার নিজের সমর্থকদের যদি ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে তাহলে তাদের আবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ আছে।

রেডিও তেহরান:  ভোটের রাজনীতিকে সামনে রেখেই মূলত এই জোট তৈরি হয়েছিল। সেক্ষেত্রে জোটে ভাঙনের বিষয়টিকে আপনি কী অনিবার্য বলে মনে করেন?

ইলিয়াস খান: দেখুন, জোট থেকে একটি দল চলে গেছে। আরও দু একটি দল বলেছে তারা চলে যেতে পারে। দলের মধ্যেও অনেক সময় কতধরনের ভাঙন হয়ে থাকে। আপনি যে কথাটি বললেন ভোটের বিষয়টিকে সামনে রেখেই জোট গঠিত হয়। আসলে এখানে বিষয়টি সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক। বিশেষ করে আমাদের এই উপমহাদেশে এ ধরনের ঘটনা বেশ ঘটে থাকে। আমি যদি বলি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে মোটা দাগে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া এই জোটের অন্য সঙ্গী যেসব দল রয়েছে তাদের ওই অর্থে বড় কোনো ভোট নেই। একইভাবে বলা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যে ১৪ দলীয় জোট রয়েছে সেখানেও একই অবস্থা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ওই অর্থে তেমন কোনো ভোট নেই। সুতরাং আমার মনে হয় এই ভাঙনে মনস্তাত্ত্বিক কিছু প্রভাব আছে কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য কিংবা প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না।

জোটে ভাঙনের বিষয়টিকে কী অনিবার্য আপনার এ জিজ্ঞাসার উত্তরে বলব, দেখুন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রীক। আমার আলোচনার শুরুতেই বলেছি যেসব দল জোট থেকে বেরিয়ে গেছে বা যেতে চায় তাদের একধরনের প্রত্যাশা ছিল কিন্তু তারা এই মুহূর্তে মনে করছে তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না কিংবা সহসা পূরণ হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ ও সম্ভাবনাও তারা দেখছে না। আর সে কারণেই হয়তো একটি দল জোট থেকে বেরিয়ে গেছে বা  কেউ কেউ যেতে চাচ্ছে। দেখা যাক পরবর্তীতে কী ঘটে!

রেডিও তেহরান: যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০ দলীয় জোটে ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে সেটি হলো- বিএনপির এমপিদের শপথ নেয়া। কিন্তু দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেন নি। রাজনীতির জটিল এ অধ্যায় নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ জানতে চাই।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া

ইলিয়াস খান: দেখুন, সব সময়ই দেখেছি রাজনীতিতে কিছু কিছু বিষয় প্রকাশ্যে ঘটে আবার কিছু কিছু বিষয় অন্তরালে ঘটে থাকে। ফলে অন্তরালে ঘটা বিষয়গুলো আসলে ওইভাবে বলা সম্ভব না। তবে আমি যতটুকু বুঝি বা জেনেছি তাতে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি যারা শপথ নিয়েছেন তাদের ওপর একধরনের চাপ ছিল। আর বিএনপির এমপিদের সংসদে যাওয়ার বিষয়টি অনিবার্য অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি তারা যখন শপথ নেবেনই এমনটি অনুমিত হয়েছে তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারম্যান তারেক জিয়া হয়তো এ শপথ নেয়ার বিষয়টি বা সংসদে যাওয়ার বিষয়টির অনুমতি দিয়েছেন। কারণ তাদেরকে নিবৃত করার চেষ্টা করা হলেও হয়তো তারা যোগ দিতেন সে কারণেই তাদেরকে বাধা দেয়া হয় নি বলে আমি মনে করি। 

তবে হ্যাঁ মোটা দাগে দেখলে বিষয়টি আসলে কিছু রহস্যের সৃষ্টি করেছে। কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছি। যেমন ধরুন প্রথম দিনে যিনি শপথ নিলেন তাকে বহিষ্কার করা দল থেকে হলো। পরবর্তীতে ৪ জন শপথ নিলেন। অথচ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নিলেন না। যদি দলের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে তাঁরও তো শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেয়ার কথা। এই প্রশ্ন আপনার, আমার, দেশবাসী এবং যারা অনুষ্ঠান শুনছেন সবার। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। রাজনীতিতে নানা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নানা ধরনের কৌশল থাকে। নিশ্চয়ই তারা কোনো কৌশলের কারণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আমার মনে হয়।

রেডিও তেহরান: প্রশ্ন উঠেছে বিএনপির এমপিরা শপথ নেয়ার কারণে গত নির্বাচন নিয়ে বিরোধীরা আর প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। আপনি কী বলবেন?

বিএনপি এমপিদের শপথ

ইলিয়াস খান: দেখুন, বিএনপির এমপিরা শপথ নেয়ার কারণে গত নির্বাচন নিয়ে বিরোধীরা আর প্রশ্ন তুলতে পারবেন না একথাটি ঠিক নয়। গত নির্বাচন নিয়ে সব সময় প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। কারণ জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, দেশের মানুষ যারা ভোটার তারা প্রত্যেক্যেই জানেন কেমন ভোট হয়েছে। এমনকি সরকারি দলে এবং সরকারি দলের জোটে আছেন এমন কেউ কেউ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা সংসদে দাঁড়িয়ে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন এ ধরনের নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। আমি বলব গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন মূলত ২৯ ডিসেম্বর রাতে হয়েছে। বাংলাদেশে যে বিয়াল্লিশ হাজার ভোট কেন্দ্র আছে তার প্রতিটি কেন্দ্রে আগের রাতে ভোট হয়েছে।

আপনি যে প্রশ্নটি করলেন এই একই প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন যে, বিএনপি নির্বাচনের ফল বর্জন করেছেন আবার শপথ নিলেন। হ্যাঁ একথা সত্য শপথ নেয়ার ফলে তাদের প্রশ্ন করার জায়গাটা খানিকটা দুর্বল হয়ে গেছে।

রেডিও তেহরান: অনেকেই বলছেন, বিশেষ করে সরকারি দলের নেতারা বলছেন যে, বিএনপি এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়বে? আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ইলিয়াস খান: দেখুন, বিএনপি এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়বে একথা বলে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারে। ১৯৭৫ সালের আওয়ামী লীগ বহুধা বিভিক্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে মাঠে নেমে মিছিল করার মতো একটি মানুষ বাংলাদেশে ছিল না। ফলে রাজনীতির ধারাই হচ্ছে কখনও ভালো সময় আসবে আবার কখনও খারাপ সময় আসবে। 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওযামী লীগ সরকারের নির্যাতন নিপীড়নের কারণে এখন মনে হচ্ছে যে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আর সাধারণত একথাগুলো বলছে সরকারের মন্ত্রীরা। সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা অনেকেই এসব কথা বলে থাকে। তবে একথাটি একেবারে সত্য নয়। কারণ বিএনপি এমন একটি দল যাদের সমর্থক রয়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে। এই দলের প্রায় ২৫ লক্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দেশের আনাচে কানাচে পাড়া মহল্লায় রয়েছে বিএনপির কর্মী-সমর্থক। সুতরাং এই দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রের নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা রয়েছে। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নেই, মানুষের বিক্ষোভ দেখাবার সুযোগ নেই। দমন-পীড়ন চালিয়ে বিরোধী মতকে একধরনের স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে। দেশের বর্তমান চিত্র এমন। আমি বলব বিএনপির যে জনসমর্থন ছিল সেটি সেভাবেই আছে বরং সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে সমর্থন আরও বেড়েছে। তবে সরকারের দু একজন মন্ত্রী বা নেতারা যে বলছেন বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। এটি বলে তারা আত্মতুষ্টি পেতে পারেন কিন্তু আমি বলব তারা বাস্তববাদী নন।#

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/১১
 

ট্যাগ

মন্তব্য