২০১৯-০৫-১২ ১৯:৩৮ বাংলাদেশ সময়

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ১৮ থেকে ২১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى إِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ (18)

“কেউ অপরের (গোনাহর) বোঝা বহন করবে না। কেউ যদি তার গুরুতর ভার বহন করতে অন্যকে আহ্বান করে কেউ তা বহন করবে না- যদি সে নিকটাত্নীয় (এমনকি পিতা বা সন্তানও) হয়। (হে রাসূল) আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করেন, যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। যে কেউ (গোনাহ ও মন্দ আচরণ থেকে) নিজেকে পুতপবিত্র করে- এর ফল সে নিজেই ভোগ করে। আল্লাহর নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।” (৩৫:১৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার ন্যায়বিচারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন পুরস্কার কিংবা শাস্তি নির্ভর করবে ব্যক্তির কৃতকর্মের ওপর। পার্থিব জীবনের রক্তের বন্ধন বা আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে সেদিন কেউ কারো গোনাহর বোঝা বহন করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালাও বিচার করার সময় একজনের পাপের বোঝা আরেকজনের কাঁধে চাপিয়ে দেবেন না। সেদিন প্রত্যেককে তার নিজের কৃতকর্মের জবাবদিহী করতে হবে। সেই কঠিন দিনে পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা বা সমাজের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে কেউ আল্লাহর কাছে পার পাবে না।

অবশ্য যদি কেউ অন্যদেরকে গোনাহর কাজে আহ্বান করে তাহলে সেই গোনাহর কাজ সংঘটিত হওয়ায় তার যতটুকু ভূমিকা রয়েছে ততটুকু শাস্তি তাকে পেতে হবে। একইভাবে অন্যদেরকে সৎকাজে আহ্বান জানালে সেই কাজ সংঘটিত হওয়ায় তার যতটুকু অবদান রয়েছে ততটুকু পুরস্কার তাকে দেয়া হবে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে পাপকাজ সংগঠিত হওয়ার কারণ হিসেবে মানুষের অন্তরের কদর্যতার কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তি রাসূলের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং পাপ পঙ্কিলতা থেকে দূরে থাকে যাদের অন্তর পবিত্র এবং সত্যসন্ধানী। অন্তরের এই পবিত্রতা যাদের নেই তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.) পর্যন্ত সংশোধন করতে পারবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতের দিন মানুষের পাপকাজ বিশাল বোঝা হয়ে তার কাঁধে চেপে বসবে।

২. যারা দুনিয়ার জীবনে পাপকাজের আহ্বান জানায় এবং এই বলে উসকানি দেয় যে, তারা আমাদের পাপের ভার বহন করবে তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া যাবে না।

৩. প্রত্যেককে তার পাপের শাস্তি পেতে হবে এবং কাউকে অপরের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেয়া হবে না। কিন্তু যদি আমরা অপরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন না করি এবং পাপকাজে বাধা না দেই তাহলে পাপকাজের সামনে এই নীরবতার জন্য আমাদের শাস্তি হতে পারে।

৪. কিয়ামতের দিন কেউ অপরের সাহায্য করতে পারবে না। এমনকি সন্তান পিতামাতার বা পিতামাতা সন্তানের কোনো কাজে আসবে না।

সূরা ফাতিরের ১৯ থেকে ২১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের দিকে দৃষ্টি দেবো। এই তিন আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

  وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ (19) وَلَا الظُّلُمَاتُ وَلَا النُّورُ (20) وَلَا الظِّلُّ وَلَا الْحَرُورُ (21)

“এবং দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান সমান নয়।” (৩৫:১৯)  

“এবং সমান নয় অন্ধকার ও আলো।” (৩৫:২০)

“এবং সমান নয় ছায়া ও তপ্তরোদ।” (৩৫:২১)

এই তিন আয়াতে কাফির ও মুমিন ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনা করে বলা হচ্ছে: তোমাদের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি অন্ধ ও কিছু দেখে না সে কি তার সমান যার চোখ আছে এবং সবকিছু দেখতে পায়? স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে- এই দুই ব্যক্তি সমান নয়। বিশ্বজগত সম্পর্কে এই দুই ব্যক্তির উপলব্ধি ও অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, একজন সবকিছুকে অন্ধকার দেখে এবং অন্যজনের সামনে দিনের আলোর মতো সবকিছু পরিস্কার ও স্পষ্ট। মনে হয় যেন, একজন সারাক্ষণ রাতের অন্ধকারে বসবাস করছে এবং অন্যজন রৌদ্র ঝলমল দিনের আলোয় জীবন যাপন করছে। অবশ্য দৃষ্টিশক্তি থাকা না থাকায় মানুষের কোনো হাত নেই। যে ব্যক্তি অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে তার পক্ষে কোনো কিছু দেখা সত্যিই সম্ভব নয়। কিন্তু কুফর ও ঈমান মানুষের আয়ত্বের মধ্যে রয়েছে। যে কেউ কুফরের পথ বেছে নিয়েছে সে এই পথের অন্ধকার গলিতে হারিয়ে গেছে এবং তার পক্ষে  আল্লাহ ও পরকালসহ মহাসত্য উপলব্ধি করা বা দেখা সম্ভব নয়। চর্মচক্ষু থাকা সত্ত্বেও সে মহাসত্য দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত রয়েছে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি ঈমানের পথ বেছে নিয়েছে তার অন্তর্চক্ষু খুলে গেছে এবং সে আল্লাহর হেদায়েতপ্রাপ্ত বান্দা হতে পেরেছে।

পবিত্র কুরআনে এরকম আরো আয়াত রয়েছে যেখানে এই একই বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করার জন্য পৃথিবীতে নবী-রাসূল ও আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন। কিন্তু কাফির ও মুশরিকরা মানুষকে আলোর জগত থেকে বের করে অন্ধকার জগতের দিকে নিয়ে যেতে চায়।

এই প্রকৃতিতে মানুষ, জন্তু ও উদ্ভিদ নির্বিশেষে সব প্রাণীর জীবনের প্রয়োজনীয় শক্তি আসে দিনের আলোয় সূর্যের উত্তাপ থেকে। সূর্যের আলো ও তাপ পৃথিবীতে না পৌঁছালে এই জগত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে এবং সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষের অন্তরের অবস্থাও ঠিক এরকমই। আল্লাহ তায়ালার হেদায়েতের নূরের আলো অন্তরে না পৌঁছালে সে অন্তরের মৃত্যু ঘটে। আর যে অন্তরে নূরের আলো পৌঁছে সে অন্তর তরতাজা ও সতেজ থাকে এবং সেখানে নবী-রাসূলদের শিক্ষা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ভালো ও মন্দের মধ্যে কিংবা সৎকর্মশীল মুমিন ব্যক্তির সঙ্গে অসৎ কর্মে লিপ্ত কাফেরদের তুলনা করলে আমরা ভ্রান্ত পথ থেকে সঠিক পথকে আলাদা করতে পারব এবং শিরক ও কুফরের ধোঁকায় পড়ব না।

২. ধর্ম মানুষের অন্তর্চক্ষু খুলে দেয় ও তাকে প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয়। এর ফলে সে কুফরের অন্ধকার থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

৩. এই আয়াতগুলোতে নূরকে একবচন হিসেবে এনেছেন আল্লাহ তায়ালা। অন্যদিকে জুলুমাত বা অন্ধকারকে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। এর অর্থ হচ্ছে, সত্য পথ একটির বেশি নয় কিন্তু অন্ধকারের পথ ও মত অসংখ্য হয়ে থাকে।#

 

ট্যাগ

মন্তব্য