২০১৯-০৫-১২ ১৯:৪৮ বাংলাদেশ সময়

সুরা জিনের ৮ নম্বর আয়াত থেকে বোঝা যায় ইসলামের মহানবীর আবির্ভাব ও পবিত্র কুরআন নাজিলের ফলে বিশ্বে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে।

আর এসবের মধ্যে রয়েছে উর্ধ্ব-আকাশে জিনদের আড়িপাতা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বিশ্বাসী তথা ঈমানদার জিনরা এ প্রসঙ্গে বলেছে,  '(৮) এবং আমরা আকাশকে অনুসন্ধান করলাম ও অনুভব করলাম,এবং তা কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা পরিপূর্ণ পেলাম। (৯) অতীতে আমরা আকাশের বিভিন্ন স্থানে গোপন সংবাদ শোনার জন্যে বসে থাকতাম,কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার শাস্তির জন্য জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডকে প্রস্তুত অবস্থায় পায়।'

এই আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আল্লামা তাবাতাবায়ি লিখেছেন, এখানে আকাশ বা উর্ধ্ব-আকাশ বলতে প্রাকৃতিক জগতের বাইরের এক উচ্চতর আসমানি জগতকে বোঝানো হয়েছে। আর আড়ি পাততে আসা শয়তান বা দুষ্ট জিনরা এই আকাশের  তথা ফেরেশতাদের জগতের কাছাকাছি হলে তাদের ওপর উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হয়। শয়তানরা চায় ফেরেশতাদের কথোপকথন থেকে সৃষ্টির নানা রহস্য ও ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী সম্পর্কে জানতে। কিন্তু ফেরেশতারা আসমানি জগতের আধ্যাত্মিক আলো দিয়ে শয়তানদের তাড়িয়ে দেয়। কারণ এই বিশেষ আলো সহ্য করার ক্ষমতা শয়তানদের নেই।

জাহেলি যুগে তথা ইসলাম-পূর্ব যুগে জিনদের মাধ্যমে নানা তথ্য ও সংবাদ সংগ্রহ করে একদল পুরোহিত বিপুল সংখ্যক মানুষকে পথভ্রষ্ট করত। যাই হোক বিশ্বাসী বা মু'মিন জিনদের বোঝা উচিত ইসলামের মহানবীর (সা) আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে উর্ধ্ব-আকাশে জিনদের আড়ি পাতার প্রথা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে মানুষের জন্য সুপথ পাবার পথ খুলে যায় এবং পুরোহিতদের কারসাজি ও নানা ধরনের কুসংস্কার ছড়ানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবে এক অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় নতুন আলোকিত অধ্যায়।

মানুষের মত জিনদের মধ্যেও রয়েছে সৎকর্মশীল ও অসৎ আর পাপাচারী। সুরা জিনের ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ জিনদের স্বীকারোক্তি তুলে ধরেছেন এভাবে: '(১১) এবং আমাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ এবং কেউ কেউ এর ব্যতিক্রম,আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী।'  

-এই আয়াত থেকে স্পষ্ট, মানুষের মত জিনদেরকেও পথ ও মত বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আর জিনদের জন্যও সুযোগ রয়েছে সুপথ পাওয়ার।

সুরা জিনে সৎকর্মশীল ও মু'মিন জিনরা অন্য জিনদের সতর্ক করে বলছে:

'(১২) এবং আমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখতাম যে,আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে দুর্বল করতে পারব না এবং পালিয়ে গিয়েও তাকে অসহায় করতে পারব না তথা আল্লাহর কর্তৃত্বের বেষ্টনী থেকে পালাতে পারব না।'

অর্থাৎ আল্লাহর মোকাবেলায় বিজয়ের পথ তো দূরের কথা পালানোরও কোনো সুযোগ নেই। মহান আল্লাহর ন্যায়-বিচার এড়ানো সম্ভব নয় এবং তাঁর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। জিনরা এখানে বলতে চাচ্ছে যে পবিত্র কুরআনের সত্য ও সঠিক দিক-নির্দেশনা শোনার পরপরই আমরা এতে ঈমান এনেছি। আর যে তার প্রতিপালকে ঈমান আনে তার পুরস্কার কমে যাওয়ার কোনো ভয় নেই এবং সে জুলুমের শিকার হবে না। কারণ ছোট ও বড় সব কাজেরই রয়েছে প্রতিদান এবং সৎ কাজের প্রতিদান দেয়ার ক্ষেত্রে বিন্দু পরিমাণও কম করা হবে না।  

মুমিন জিনরা আরও বলেছে,

'(১৪) আমাদের মধ্যে কতক আত্মসমর্পণকারী তথা মুসলমান এবং কতক অবিচারক;যারা আত্মসমর্পণ করেছে তারাই সঠিক পথ অবলম্বন করেছে। (১৫) কিন্তু অবিচারকরা তো জাহান্নামের ইন্ধন।'  -

এ আয়াতে মুসলমানকে জালিমের বিপরীত বলে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ জুলুম থেকে দূরে থাকার জন্য ঈমান জরুরি। আর যার ঈমান নেই সে খুব সহজেই পাপ ও জুলুমে জড়িয়ে পড়ে। প্রকৃত মুমিন কখনও জুলুমে জড়ায় না।

সুরা জিনের ২৫ থেকে ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ অদৃশ্যের খবর রাখেন। পবিত্র কুরআনে কিয়ামত তথা পুনরুত্থান ও বিচার দিবসের অনিবার্যতার কথা বার বার বলা হয়েছে। সেদিন কাফের ও অপরাধীরা কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামত ঠিক কবে হবে অবিশ্বাসীদের এ প্রশ্নের জবাব প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলছেন, 'হে নবী! আপনি বলুন ‘আমি অবহিত নই, তোমাদের যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দান করা হয়েছে তা কি নিকটবর্তী, না আমার প্রতিপালকের এর জন্য কোন দীর্ঘ মেয়াদ স্থির করেছেন।’ তিনি অদৃশ্যের বিষয়ে পরিজ্ঞাত,তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না, তবে তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া।'

আসলে অদৃশ্যের সত্তাগত জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে,কিন্তু তিনি যে প্রতিনিধিকে পছন্দ করেন তাঁকে সে জ্ঞানের কোনও না কোন অংশ অবশ্যই দান করেন। এ বিষয়টি অদৃশ্যের জ্ঞান সম্বন্ধে একটি মধ্যবর্তী পন্থা যার মাধ্যমে  এটা স্পষ্ট যে,মূল জ্ঞান আল্লাহর কাছে রয়েছে,আর বান্দার কাছে রয়েছে আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞান। তাই যতক্ষণ না কোন বান্দার প্রতি আল্লাহর এ দান প্রমাণিত হবে বা বান্দার সাথে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্ক প্রমাণিত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত অদৃশ্যের জ্ঞানের দাবিদারের কোন দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না। এই বিশেষ সম্পর্ক বোঝাতেই কুরআনে ‘পছন্দনীয় বা মনোনীত রাসূল বা প্রতিনিধি’ শব্দ দিয়ে ইশারা করা হয়েছে। আসলে অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহর সাধারণ বান্দাদের কাছে গোপন রাখা হয় যাতে তাদের পরীক্ষার বিষয়টি পরিপূর্ণতা পায়।  অন্যদিকে নবী-রাসুল ও ইমামরা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন যেভাবে ওহি নাজিলের মাধ্যমে কোনো কোনো বিষয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পরিপূর্ণ  জ্ঞানের পরিবর্তে তাঁদেরকে সামগ্রিক বা গড়পড়তা জ্ঞান দেয়া হয়। যেমন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) মুতার যুদ্ধ ও এ যুদ্ধে হযরত জাফর বিন আবুতালিব (আ) ও আরও কয়েকজন সেনাপতির শাহাদাতের বিষয়ে মদীনায় বসেই সাহাবিদের খবর দিয়েছিলেন। মহানবীর জীবনে এ ধরনের অনেক ঘটনা রয়েছে। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য