২০১৯-০৫-১৩ ১৮:৫৯ বাংলাদেশ সময়

শিশুর নানা অধিকারের মধ্যে একটি হচ্ছে সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে যারা মূল ভূমিকা পালন করবেন তারা হলেন বাবা ও মা। বাবা-মা না থাকলে যারা অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছেন তাদের ওপরই এই দায়িত্ব বর্তায়। প্রতিটি শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পবিত্র ইসলাম ধর্মেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (স.) বলেছেন, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর। জন্মের পর থেকেই শিশুকে সঠিক শিক্ষা দিতে হবে এবং লেখাপড়া শেখাতে হবে। বাবা-মা শিক্ষিত না হলে অন্যের সহযোগিতায় এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এখনও অনেক বাবা-মা আছেন যারা নিজেরাই লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু এ কারণে তারা শিশুকে অশিক্ষিত রেখে দিতে পারবেন না। তাদেরও দায়িত্ব হলো শিশুকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থা করা। সামর্থ্য থাকলে শিক্ষকের ব্যবস্থা করা অথবা সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে শিশুকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা। বাবা-মা'র দায়িত্ব হলো লেখাপড়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সঠিক আচার-আচরণ শেখানো। কারণ প্রতিটি শিশু জন্মের পর যেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে তাহলো তার নিজের পরিবার। শিশুর ওপর পরিবারের সদস্যদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পরিবারের সদস্যদের আচার-আচরণের ভিত্তিতেই তার আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদেও শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই সনদের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কনভেনশনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো সমান সুযোগের ভিত্তিতে শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে এবং এই অধিকারকে অধিক বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করবে, বিশেষকরে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সহজলভ্য করতে হবে। সাধারণ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ বহুমুখী মাধ্যমিক শিক্ষাকে উৎসাহ দিতে হবে, প্রতিটি শিশুর জন্য এ ধরণের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে সকল শিশু যেন এ সুযোগ লাভ করতে পারে সে জন্য বিনা খরচে শিক্ষা লাভ ও প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্যের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ যাতে সবাই পায় সেজন্য সব যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।             

প্রতিটি শিশুই মায়ের ছোট্ট গর্ভ থেকে একটি বিশাল পৃথিবীতে প্রবেশ করে। এ কারণে পৃথিবীতে আসার পর থেকেই শিশুর মন থাকে উৎসুক্য। সব কিছুকে তার কাছে রহস্যময় মনে হয়। এ কারণে দেখা যায় ভালোভাবে কথা বলতে শেখার আগেই নানা প্রশ্নের অবতারণা করছে। সব কিছুর উৎস এবং কার্য-কারণ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। এটি বাবা-মা তথা অভিভাবকদের জন্য একটি বড় সুযোগ। এ সময় শিশুকে সঠিক তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে এবং সঠিক পথে পরিচালনার ভিত্তি গড়ে দিতে হবে। হজরত আলী (আ.) বলেছেন, শৈশবের শিক্ষা হচ্ছে পাথরে চিত্র খোদাইয়ের মতো। এই খোদাইয়ের কাজটি যাতে সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় তা প্রথমে বাবা-মা'র পক্ষ থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।  এ কারণে শিশুর সঙ্গে  বাবা-মায়ের সখ্যতা গড়ে তোলা জরুরি। যে কোন শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেই বাবা-মা হয়ে থাকেন তার প্রথম আদর্শ। এ কারণে শিশুরা প্রথম থেকেই তার মা-বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে থাকে। অনেক পরিবারেই দেখা যায় শিশুর লালন-পালন ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাবার তেমন ভূমিকা নেই। শুধু অর্থের যোগান দিয়েই দায়িত্ব শেষ করার চেষ্টা করেন অনেকে। এর ফলে অনেক শিশুই বাবার সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়।

শিশু লালন-পালনে মায়ের মতো বাবাও দায়িত্বশীল। এ কারণে জন্মের পর থেকেই বাবাকেও তার শিশুর যত্নে অংশ নিতে হবে যাতে করে প্রতিটি শিশুই তার প্রতি তার বাবার ভালোবাসার টান অনুভব করতে পারে। শিশুর কাপড় বদলানো, পরিষ্কার করা, খেলা করা, গান শোনানো, গল্প বলা ইত্যাদি কাজে বাবারও সমান অংশগ্রহণ থাকা উচিত। বাবা-মা উভয়েরই চেষ্টা থাকতে হবে শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার। শিশুর পড়ালেখায় যতটুকু সম্ভব সাহায্য করতে হবে। এতে করে সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের সম্পর্ক যেমন দৃঢ় হবে তেমনি শিশুর দুর্বল দিকগুলো সম্পর্কে জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। এর ফলে শিশুর অন্তর্নিহিত কোন মেধা বা গুন থাকলে তা প্রথম বাবা-মায়ের কাছেই ধরা পড়বে এবং তা বিকাশে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে। শিশুর যেকোনো পর্যায়ের সাফল্যে প্রশংসা করতে হবে। শিশুদের মধ্যে প্রথম থেকেই প্রতিযোগিতা মূলক আচরণ তৈরি করা ঠিক হবে না। তাহলে লেখাপড়ায় চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।  

অনেক পরিবারে এখনও মেয়ে শিশুদের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।  এটা অন্যায়। ছেলে হোক-মেয়ে হোক প্রতিটি শিশুরই শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। শিক্ষিত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতেও নারী শিক্ষা অপরিহার্য। একজন মা যখন উপযুক্ত শিক্ষিত হোন তখন সন্তানকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হয়। মেয়েশিশুদের শিক্ষার অধিকার অস্বীকার করার অর্থ হলো তাদের কর্মদক্ষতা বিকাশের সুযোগকে অস্বীকার করা । ছেলে শিশুর মতো মেয়ে শিশুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মা তথা অভিভাবককে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে আজকের শিশুই ভবিষ্যতের কর্ণধার। তারা সুশিক্ষিত না হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে। তখন এর দায় থেকে কেউই রক্ষা পাবে না।

মানুষের ওপর আল্লাহর যত নিয়ামত ও অনুগ্রহ রয়েছে, শিক্ষার নিয়ামতকে পবিত্র কুরআনে সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রাহমানের ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।

সূরা আলাকের থেকে নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত; যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান দান করেছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।

শিশু অধিকার কেবল তখনি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে যখন শিশু সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠবে এবং সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য