২০১৯-০৭-২২ ১৮:২৮ বাংলাদেশ সময়

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম কেরমানশাহ প্রদেশের সারপোল জাহব শহরের আশেপাশের কয়েকটি শহরের দিকে। প্রথমেই আমরা দেখেছি সারপোল শহরের পার্শ্ববর্তী ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘অনুবনিনি’ শিল্পকর্মটি। এটি পাথরে খোদাই করা একটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম। লুলুবিয়ানদের বাদশাহ ছিলেন অনুবনিনি। তাঁর আমলের শিল্পকর্ম এটি। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে একটি উপজাতি ছিল লুলুবিয়া নামে।

সেই সময়কার এই উপজাতিদের বাদশাহ ছিলেন অনুবনিনি। এই উপজাতিটি জাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে বসবাস করতো এবং আর্যদের আগে মানে ফার্স এবং মাদদের আগে অর্থাৎ চার হাজার আট শ বছর আগে এই এলাকায় বসবাস করতো তারা। পাথরে খোদাই করা অনুবনিনির একটি ছবি ‘মিয়নকোল’ নামক পাথুরে পাহাড়ের গায়ে এখনও লক্ষ্য করা যাবে। এরপর আমরা দেখেছি আহমাদ বিন ইসহাকের মাজার। ইমাম হাসান আসকারি (আ) এর বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ২৫০ হিজরি সনে সারপোল জাহব শহরে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানটি জিয়ারতগাহে মানে মাজারে পরিণত হয়েছে। মাজার স্থাপনাটি চারটি বাহু বিশিষ্ট স্থাপত্যশৈলীর মতো। স্থাপনার উপরে রয়েছে গোলাকার একটি সুদর্শন গম্বুজ। আজ আমরা যাবো কেরমানশাহ প্রদেশের আরেকটি ঐতিহাসিক শহর পভে’র দিকে।

‘হাজার মসুলেহ’ নামে পরিচিত এই পভে শহরটি ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় পাঁচ শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।কেরমানশাহ প্রদেশটি ইরানের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত প্রদেশ। ইরাকের সঙ্গে লাগোয়া এই প্রদেশটি।আমরা এখন এই সীমান্ত প্রদেশে রয়েছি।প্রাচীনকালে এই প্রদেশটিকে বলা হতো বখতারন।মজার ব্যাপার হলো কেরমানশাহ প্রদেশের এই পভে শহরটি ইরানের সবচেয়ে গরম এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে শীতল এলাকা।পভে শহর সম্পর্কে এরকম অনন্য সাধারণ বর্ণনা শুনলে কেরমানশাহ শহর এবং সারপোল জাহব শহর দেখার পর এই শহরে না গিয়ে কি পারা যায়!যেমনটি আমরা শুরুতেই বলেছি যে পভে হলো হাজার মসুলেহ’র শহর।ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলানের মসূলেহ গ্রাম সম্পর্কে এবং সেখানকার অদ্ভুত বাড়িঘরের ডিজাইন সম্পর্কে নিশ্চয়ই কমবেশি আপনাদের জানা আছে।একটি বাড়ির ছাদ আরেকটি বাড়ির উঠোন।

এভাবেই গড়ে উঠেছে সেখানকার বাড়িগুলো।যারা শুমালের এই মসূলে গেছেন তাঁরা জানেন সবুজ পর্বতমালার কত উপরে মসূলে গ্রামটি রয়েছে। এই মসূলে গ্রামের চেয়ে কয়েকগুণ বড় একটি শহর পভে’র উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সেই চূড়া থেকে শুরু করে একেবারে পাদদেশ পর্যন্ত ঘরগুলো সিঁড়ির মতো নীচে নেমে এসেছে। নজিরবিহীন এই স্থাপত্য ডিজাইন সত্যিই অবাক করার মতো। প্রতিটি বাড়ির ছাদ উপরের বাড়ির উঠোন-কী চমৎকার ব্যাপার। মিলে মিশে থাকে ওরা আত্মীয়ের মতো যেন। বাড়ির এই ডিজাইন কেবল পভে শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আশেপাশের গ্রামগুলোতে একই রকমের ডিজাইন লক্ষ্য করা যাবে।

হাজিজ নামেও একটি গ্রাম আছে এখানে। এই গ্রামটিতে চমৎকার একটি ঝরনাও আছে একেবারেই অন্যরকম। ঝরনার কারণে গ্রামটিও বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সব মিলিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই অনন্য সাধারণ বাড়িগুলোতে মানুষের বসবাস দেখার মতো এবং উপভোগ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পভে শহরটি গড়ে উঠেছে শহু পর্বতের চূড়ার উচ্চতায়। পাহাড়গুলোর পাদদেশে রয়েছে সবুজ বাগবাগিচা। এসব বাগিচায় রয়েছে বিচিত্র ফলের গাছ। আখরোট, আনার, ডুমুরসহ আরও বিচিত্র ফলের গাছ রয়েছে এখানে। এই বাগান পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শহু পর্বতটি জাগরোস পর্বতমালার মধ্যে পড়েছে। মজার ব্যাপার হলো গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের সময়ও শহু পর্বতের চূড়ায় সাদা বরফের আচ্ছাদন দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং ভাবতে পারেন এখানকার আবহাওয়া কতোটা উপভোগ্য।

গাছের বৈচিত্র্য এবং পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত ঢেকে যাওয়া বিচিত্র সবুজ উদ্ভিদ এই পভে পাহাড় এবং হুরামান পাহাড়কে দর্শনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দান করেছে। ফার্সি বছরের দ্বিতীয় মাস তথা বসন্তের দিকে নানা রঙের ফুলের সমারোহে শহুর রূপ একেবারেই পাল্টে যায়। পুরো পার্বত্য প্রকৃতি যেন এই সময় নতুন করে সাজে। ওই সৌন্দর্য দেখে দু’চোখের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি প্রেমিকের মনও জুড়িয়ে যায়। বিশেষ করে পর্বতের ওই উচ্চতায় ললে ভজগুন মানে অধোমুখী টিউলিপ প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। কেবল পভের চূড়াতেই নয় বরং পভের অতাশগহ’তেও এই শ্রেণীর টিউলিপ ব্যাপক দেখা যায়।

ফিরে এলাম আবারও পভে’র শহু পর্বতের চূড়ায়। এখানকার অতাশগহ নিয়ে বলছিলাম আমরা। অতাশহত হলো জরথুস্তদের অগ্নিমন্দির।  সাসানি শাসনামলে এখানে যে জরথুস্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা অহুরা মাজদা’র উপাসনা করতো সেটাই প্রমাণিত হয় এই অতাশগহের মাধ্যমে। এখন সেই অতাশগহে শত সহস্র ললেহ মানে টিউলিপের সমারোহ বিরাজ করে বসন্তের আগমনে। দর্শনীয় সুন্দর এই ফুল তাও সবুজ প্রকৃতিময় পার্বত্য চূড়ায়, যে কেউই দেখবে, চোখ লেগে যাবে। সহজে ওই সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল। অধোমুখী যেই টিউলিপের কথা বললাম এতোক্ষণ এই টিউলিপ দেখতে লাল বলা হলেও আসলে কমলা কিছুটা বেগুনি রঙের দিকে ধাবিত হলে যেরকম রঙ দাঁড়ায় ঠিক সেরকমই রঙ তার। এই টিউলিপের হৃদয়ে লুকিয়ে রয়েছে চমৎকার একটি রূপকথা। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য