২০১৯-০৮-২৮ ১৭:০৩ বাংলাদেশ সময়

গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম খ্রিস্টীয় দ্বাদশ কিংবা হিজরী ষষ্ঠ শতকের প্রখ্যাত ইরানি দার্শনিক ও আরেফ আবুল ফাতুহ ইয়াহিয়া বিন হাবাশ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি জন্ম নিয়েছিলেন উত্তর ইরানের যানজন অঞ্চলে সোহরাওয়ার্দি নামক গ্রামে।

তিনি ইশরাকি শেইখ নামেও খ্যাত। জীবনী লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ ভুলবশত তার নামকে হিজরি সপ্তম শতকের সুফি ও আরেফ শাহাবুদ্দিন আবু হাফ্‌স ওমর সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি প্রচলিত নানা শিক্ষা অর্জনের পর  ইরান সহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চলের বহু শহর সফর করেন। এসব শহরে সে যুগের অনেক জ্ঞানী আলেম ও চিন্তাবিদদের সাহচর্য পেয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে অনেক বড় বড় সুফি সাধকের সাহচর্য ও শিক্ষা থেকে তিনি উপকৃত হন। সোহরাওয়ার্দি আনাতোলিয়া  ও সিরিয়াও সফর করেছিলেন। একবার তিনি দামেস্ক থেকে আলেপ্পোয় যান। সেখানে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পুত্র মালেক জাহির তার ভক্ত হন।

মালেক জাহিরের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দি তার দরবারে থেকে যান। এখানেই একদল হাম্বালি আলেমের কোপানলে পড়েন তিনি। তারা সোহরাওয়ার্দির কোন কোন বক্তব্যকে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। ফলে তারা সোহরাওয়ার্দিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির কাছে  দাবি জানান। ক্রুসেড যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওই আলেমদের কথা অমান্য করার সাহস সালাহউদ্দিনের ছিল না। তাই সোহরাওয়ার্দিকে হত্যা করার নির্দেশ পাঠান সালাহউদ্দিন। কিন্তু তার ছেলে তথা আলেপ্পোর স্থানীয় শাসক মালিক জাহির ওই দাবি নাকচ করে দেন। ফলে ওই আলেমরা আবারও সালাহউদ্দিন আইয়ুবির শরণাপন্ন হোন। তারা সালাহউদ্দিনকে বোঝান যে  এই ব্যক্তি আপনার ছেলের মাথা নষ্ট করে দিবে এবং তাকে দূরে কোথাও নির্বাসনে পাঠালে সেখানেও তিনি মানুষকে পথভ্রষ্ট করবেন, তাই তাকে মেরে ফেলাই সর্বোত্তম কাজ হবে।

এইসব আলেমের কথায় প্রভাবিত হয়ে সালাহউদ্দিন তার ছেলেকেও একই কথা বলেন। মালিক জাহির তার এই নির্দেশ না মানলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার কিংবা নির্বাসনে দেয়ার ভয় দেখান সালাহউদ্দিন। ফলে আলেপ্পোর শাসক মালিক জাহির একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিতার চাপের মুখে  সোহরাওয়ার্দিকে কারাবন্দি করেন। ৫৮৭ হিজরী বা ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে ৩৮ বছর বয়সে প্রাণ হারান সোহরাওয়ার্দি। কেউ কেউ বলেন তাঁকে শ্বাসরুদ্ধ করে কিংবা তরবারির আঘাতে মারা হয় অথবা কারাগারে খাদ্য ও পানি না দেয়ার কারণে তিনি অনাহারে মারা যান বলেও কেউ কেউ মনে করেন।

শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তিনি প্রবৃত্তি বা নফসকে দমনের কঠিন  সাধনায় মশগুল থাকতেন ও খুব কম খাবার খেতেন। বলা হয় তিনি সপ্তাহে মাত্র একবার ও তাও খুব সামান্য পরিমাণ খাবার খেতেন। বেশিরভাগ সময় গভীর চিন্তাভাবনায় ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। ধর্মীয় সঙ্গীত বা সেমা খুব পছন্দ করতেন তিনি। সোহরাওয়ার্দি কারো পরোয়া করে কথা বলতেন না। দার্শনিক বিতর্কের সময় তিনি নির্ভয়ে নিজের চিন্তাধারা তুলে ধরতেন। কেউ কেউ মনে করেন  বয়স কম হওয়ার কারণেই এমন সাহসি ছিলেন তিনি। তার নির্ভিক বক্তব্যের কারণে অনেকেই তার শত্রুতে পরিণত হয়।

শেখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী তার সংক্ষিপ্ত জীবনে অনেক বই লিখেছিলেন। বলা হয় শেইখ শহীদ সোহরাওয়ার্দি ফার্সি ও আরবিতে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন। হিকমাতুল ইশরাক বা ‘ইশরাকি দর্শন’ শীর্ষক বই তার অন্যতম প্রধান কীর্তি। তার লেখা অনেক বই এখন আর পাওয়া যায় না। অতীতে তার কোনো লেখা পাশ্চাত্য অনূদিত হয় নি। ফলে পাশ্চাত্যে খুব একটা পরিচিতি পাননি সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু প্রাচ্যের দর্শনে তার প্রভাব ইবনে সিনার প্রভাবের প্রায় সমান। সোহরাওয়ার্দির নাম, তাঁর জীবন ও অবদান উল্লেখ না করে প্রাচ্যের দর্শনের ইতিহাস লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ইসলামী দর্শনে ইশরাকি ধারার প্রবক্তা হিসেবে চির অমর হয়ে থাকবেন শেখ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি। আমরা আরও বলেছিলাম শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর আলোকিত বা ইশরাকি দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হল তিনি অস্তিত্ব বিষয়ের আলোচনাগুলোকে যুক্তির পাশাপাশি খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিক্রমার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের ভিত্তি হিসেবে ইবনে সিনার মাশায়ি বা অ্যারিস্টটোলীয় দর্শন, ইসলামী সুফিবাদ এবং প্রাচীন ইরান ও গ্রীসের দর্শন ব্যবহৃত হয়েছে।

বলা হয় সোহরাওয়ার্দিকে হত্যার পর মালিক জাহির খুবই অনুতপ্ত হন। ফলে যেসব আলেম এই জ্ঞানী ও বিজ্ঞ দার্শনিককে হত্যার ফতোয়া দিয়েছিলেন তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানোর ও তাদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন মালিক জাহির।

কোনো কোনো গবেষক মনে করেন সোহরাওয়ার্দিকে হত্যা করা হয়েছিল তার জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণে। তবে বেশিরভাগ গবেষকই এই ধারণাকে ভুল বলে মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন সোহরাওয়ার্দি হিকমাতুল ইশরাক শীর্ষক বইয়ে  রাষ্ট্রের শাসকদের দার্শনিক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করার কারণে তৎকালীন শাসক সালাহউদ্দিন তার শত্রুতে পরিণত হন।

ইসমাইলি শিয়া মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন সোহরাওয়ার্দি। সে যুগে মধ্যপ্রাচ্যে দু'জন বড় শাসক ছিলেন ঈসমাইলি সম্প্রদায়ের। তারা এই মতবাদ প্রচারে সচেষ্ট ছিলেন। এই মতবাদ সম্পর্কে জানতে ও গবেষণা করতেই ঈসমাইলি শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন সোহরাওয়ার্দি।

সোহরাওয়ার্দির জীবন ও লেখালেখি সম্পর্কে যারা গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে বার্কলম্যান, অধ্যাপক লুইস ম্যাসিনিওন, হেনরি কোরবিন ও সাইয়্যেদ হুসাইন নাস্‌র সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। সোহরাওয়ার্দির লেখালেখির বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছিলেন তারই ছাত্র শামসুদ্দিন শাহরজুরি। এ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দির দর্শন সম্পর্কে বিখ্যাত ব্যাখ্যা-গ্রন্থ লিখেছেন কুতুবউদ্দিন শিরাজি। তারা দু'জনই 'ইশরাকি দর্শন' শীর্ষক বইয়ের ব্যাখ্যা লিখেছেন।   

কুতুবউদ্দিন শিরাজি সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি বা আলোকিত দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাদরুদ্দিন শিরাজির টিকা ব্যবহার করেছেন। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য