২০১৯-০৯-০৭ ২০:০৬ বাংলাদেশ সময়

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা ইয়াসিনের ৭১ থেকে ৭৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৭১ থেকে ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُونَ (71) وَذَلَّلْنَاهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوبُهُمْ وَمِنْهَا يَأْكُلُونَ (72) وَلَهُمْ فِيهَا مَنَافِعُ وَمَشَارِبُ أَفَلَا يَشْكُرُونَ (73)

“তারা কি দেখে না, তাদের জন্যে আমি আমার নিজ (কুদরতি) হাতে তৈরি বস্তুর দ্বারা চতুস্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তারাই এগুলোর মালিক।” (৩৬:৭১)

“এবং আমি চতুস্পদ জন্তুগুলোকে তাদের বাধ্য করে দিয়েছি। ফলে এদের কিছুকে তারা বাহন হিসেবে ব্যবহার করে এবং কিছুকে ভক্ষণ করে।” (৩৬:৭২)

“তাদের জন্য চতুস্পদ জন্তুর মধ্যে (চামড়া ও পশমের মতো) অন্য অনেক উপকারিতা ও (দুধের মতো) পানীয় রয়েছে। তবুও কেন তারা শুকরিয়া আদায় করে না?” (৩৬:৭৩)

এই তিন আয়াতে মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত নেয়ামত বা অনুগ্রহের একটির প্রতি ইঙ্গিত করে মানুষের জীবনে জীব-জন্তুর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পানি ও ডাঙ্গায় বসবাসকারী বেশিরভাগ জীব যদিও মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই কিন্তু কিছু চতুস্পদ জন্তুকে আল্লাহ মানুষরে নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ নিজেকে এসব জন্তুর মালিক মনে করে এবং ইচ্ছেমতো এগুলোকে ব্যবহার করে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, সভ্যতা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগেও চতুস্পদ জন্তুর চাহিদা মোটেই কমেনি বরং বেড়েছে। অতীতে গরুর দুধ দিয়ে হাতে গোণা কয়েক রকমের খাবার তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমানে দুধ দিয়ে অসংখ্য রকমের খাদ্য ও পানীয় তৈরি হচ্ছে। পশুর চামড়া ও লোম দিয়ে নানা ধরনের জুতা, ব্যাগ ও পোশাক তৈরি হচ্ছে। বর্তমান যুগে মানুষ কাপড়ের তৈরি নানা ধরনের পোশাক ব্যবহার করলেও পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাকের আভিজাত্য ও চাহিদা এতটুকু কমেনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনকি উন্নত দেশগুলোর সেনাবাহিনীতেও পাহাড়ি এবং মরু এলাকায় চলাচলের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বাহন হিসেবে এখনো ঘোড়া এবং উট ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া, মানুষের খাদ্যের তালিকার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চতুস্পদ জন্তু। মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া করে তার এসব চাহিদা পূরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ আল্লাহ তায়ালার এত বড় একটি নেয়ামতের শোকরগুজারি করে না বা কৃতজ্ঞতা জানায় না। অনেক কম মানুষই একথা ভেবে দেখেছে যে, যদি এসব পশু না থাকে কিংবা থাকলেও সেগুলো যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে!

এই তিন আয়াত থেকে আমরা যেসব শিক্ষা পেতে পারি সেগুলো হচ্ছে:

১- গরু, ছাগল, ভেড়া ও উটের মতো চতুস্পদ জন্তুগুলোকে মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব পশু না থাকলে মানুষের জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষ না থাকলে এসব পশুর জীবনযাপনে মোটেও কষ্ট হবে না।

২- চতুস্পদ জন্তু সৃষ্টি করার পাশাপাশি এগুলোকে মানুষের অধীন করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। কাজেই এই অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে।

৩- আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি না করলে এর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো সম্ভব নয়।

সূরা ইয়াসিনের ৭৪ থেকে ৭৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَاتَّخَذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ آَلِهَةً لَعَلَّهُمْ يُنْصَرُونَ (74) لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَهُمْ وَهُمْ لَهُمْ جُنْدٌ مُحْضَرُونَ (75) فَلَا يَحْزُنْكَ قَوْلُهُمْ إِنَّا نَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ (76 

“তারা (এক) আল্লাহর পরিবর্তে (উপাসনার জন্য) অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে এই আশায় যে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।” (৩৬:৭৪)

“(অথচ) এসব উপাস্য তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম নয় এবং তারা (কিয়ামতের দিন) এসব উপাস্যের বাহিনী রূপে ধৃত হয়ে আসবে।” (৩৬:৭৫)

“অতএব (হে রাসূল) মুশরিকদের কথা যেন আপনাকে দুঃখিত না করে। তারা যা গোপন করে এবং যা তারা প্রকাশ করে দেয় তার সবই আমার জানা আছে।” (৩৬:৭৬)

আল্লাহতায়ালার প্রতি অকৃতজ্ঞতার একটি নিদর্শন হলো তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা। মুশরিকরা এ কাজ প্রকাশ্যে করে এবং কোনো কোনো মুমিন ব্যক্তি নিজের অজান্তে বা অজ্ঞতার কারণে এ কাজ করে বসে।  মানুষ যখন বলে, আমি এই ব্যক্তি বা বস্তুর উপাসনা করছি তখন তাকে প্রকাশ্য শিরক বলা হয়। আর কেউ যদি সরাসরি উপাসনার কথা না বলে একথা বলে যে, উপরে আল্লাহ আর নীচে এই ব্যক্তি আমার জীবনে অনেক বড় উপকার করেছে; সে না থাকলে আমি হতভাগা হয়ে যেতাম- তখন তাকে বলা যায় পরোক্ষ শিরক। কিংবা যদি কেউ বলে যে, শুধুমাত্র অমুকের কারণে আজ আমি এতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি তাহলে তাও হবে পরোক্ষ শিরক।

অথচ এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু অন্য কোনো মানুষের উপকার করতে সক্ষম নয়; আল্লাহর স্থান পূরণ করার তো প্রশ্নই আসে না।  সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয় এবং তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে উপলক্ষ করে মানুষের কাছে তাঁর নেয়ামত পৌঁছে দেন মাত্র।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন মানুষের ভেতরের রূপ প্রকাশ করে দেয়া হবে এবং তার গোপনীয় বিষয় বলে কিছু থাকবে না। মুশরিকরা পৃথিবীতে যেসব মূর্তির উপাসনা করত কিয়ামতের দিন তারা সেসব মূর্তির পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যাবে যেন মূর্তিগুলো কমান্ডার এবং তারা এসব মূর্তির সিপাহী। এই কমান্ডারদের সঙ্গে তাদের বাহিনীকে একসঙ্গে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, পৃথিবীতে তারা কমান্ডারের মতোই এসব উপাস্যের গোলামি করেছে।

পরের আয়াতে নবীজী (সা.) ও মুমিনদের উদ্দেশ করে আল্লাহ বলছেন: মুশরিকদের নিরর্থক বক্তব্য এবং রাসূল, কুরআন ও মুমিনদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কটাক্ষ করে তারা যেসব কথাবার্তা বলে তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তাদের এসব আচরণকে আল্লাহ তায়ালার হাতে ন্যস্ত করতে হবে। তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুর খবর রাখেন এবং তিনি অবশ্যই এর বিচার করবেন।  

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে:

১- এই পৃথিবীতে কেউ আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ হতে পারে না। কাজেই যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে শরিক করে তাদের যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল।

২- আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া এক ধরনের শিরক ও কুফর। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারো পক্ষে কোনো ধরনের সাহায্য করা সম্ভব নয়।

আল্লাহর শক্তিকে উপেক্ষা করে অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া এক ধরনের শিরক ও কুফর। প্রকৃতপক্ষে কাউকে সাহায্য করার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

৩- ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপরের কটুকথা যেন আমাদেরকে হতাশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।#

 

ট্যাগ

মন্তব্য