২০১৯-০৯-০৮ ১৫:১৭ বাংলাদেশ সময়

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জাওয়াদ জারিফের ঢাকা সফর অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ সিদ্দিকুর রহমান খান।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভূ রাজনৈতিক  ও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক সৌদি আরবে শ্রমবাজারসহ বেশ কিছু কারণকে বিবেচনায় নিয়ে ইরানের সাথে ভ্রাতৃপ্রতীম সু সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধীরে চল নীতিতে এগোচ্ছে। তবে অবস্থা একটু অনুকূল হলেই এ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করি।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ড. মেহাম্মাদ সিদ্দিকুর রহমান খান, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ সম্প্রতি ঢাকা সফর করেছেন। তার এ সফরের গুরুত্ব কী?

ঢাকায় আইওরা সম্মেলন

অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান: দেখুন, সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ২২ টি দেশের মন্ত্রীদের অংশগ্রহণে তৃতীয় ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন  বা আইওআরএ (আইওরা) এর ব্লু-ইকোনমি মিনিস্টারিয়েল কনফারেন্সে হয়ে গেল। সেই সম্মেলনে বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতীম দেশ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জাওয়াদ জারিফ এসেছিলেন। আমরা বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে, সরকারের পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাঁকে স্বাগত জানিয়েছি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জাওয়াদ জারিফ এমন সময় ঢাকা সফর করলেন যখন আমেরিকার আরোপিত অবরোধের মধ্যে ইরান একটা সংকটপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড, জাওয়াদ জারিফের এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে যে ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক রয়েছে সেটির ইতিবাচক একটি প্রভাব পড়বে।

রেডিও তেহরান: জ্বি আপনি বললেন জারিফের এ সফর দুদেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তো জনাব সিদ্দিকুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাওয়াদ জারিফ। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষ করে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা-গবেষণা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে কথা হয়েছে। এসব সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা সাড়া দেবে বলে মনে হয় আপনার?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জাওয়াদ জারিফের বৈঠক

অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। দেখুন, দেশ দুটির মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বর্তমানেও গভীর সম্পর্ক চলমান আছে। এটি আরও বৃদ্ধি করার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি মনে করি বাংলাদেশ কূটনৈতিক দিক থেকে একটু নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে। একদিকে ইরানের প্রতি বাংলাদেশে সুভাতৃপ্রতীম সম্পর্ক আছে। অন্যদিকে ইরানের ওপর আমেরিকার অবরোধ ও সৌদি আরবের মনোভাবজনিত কারণে ইরানের সাথে সম্ভবনাময় অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচনের যে সুযোগটি ছিল বাংলাদেশের হাতে সেক্ষেত্রে তারা কৌশলগত কারণে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারছে না।

আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ২০১৫ সালে পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষর হওয়ার পর বাংলাদেশের সাথে ইরানের ব্যবসায়ীদের বেশকিছু বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছিল এবং অগ্রসরও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের প্রতি সৌদি বলয়ের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সেইসব বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক বিষয় সেইঅর্থে আর খুব একটা অগ্রসর হতে পারে নি।

বাংলাদেশ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হতে চায় না। আবার সৌদি আরবের সাথে একটি বিশাল শ্রমবাজার আছে। সেই শ্রমবাজারকে তারা নষ্ট করতে চায় না। অন্যদিকে ইরানের সাথে বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সেটাও হারাতে চায় না। এসব কারণে বাংলাদেশ অনেকটা কৌশলি অবস্থার মধ্য দিয়ে কিছুটা ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। তবে আমি বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যে বৈঠক হয়েছে তারপর দেশটি আরও উদারভাবে ইরানের দিকে এগিয়ে যাবে এবং বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে।

আর সাংস্কৃতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটি ঢাকাস্থ ইরানি দূতাবাস ও কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে এগোচ্ছে সেটি খুব সন্তোষজনক না হলেও মোটামুটিভাবে চলমান আছে। বাংলাদেশে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ এবং ইতিহাস ঐতিহ্যের বিকাশের জন্য অনেক অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়েও ইরান কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষার্থে অনেকে ইরানে যাচ্ছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে ইরানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষালাভ করেছেন এখনও করছেন। ইরানেরও কিছু ছাত্র বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য আসছে। আমি মনে করি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে যেসব আলোচনা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের সরকারও ইরানের সরকার প্রদত্ত সুযোগ সুবিধাগুলো গ্রহণের জন্য আরও এগিয়ে যাবে। একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরান: আপনি বললেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে। কিন্তু বলা হয়ে থাকে- ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অনেক সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ তা সেভাবে কাজে লাগায় নি বা লাগাতে পারে নি। এরকম একটা অভিযোগ আছে। আপনার কাছে কি মনে হয়?

অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান: আসলে বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানের মধ্যে আছে তাকে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। যেকথা একটু আগে বলছিলাম যে বাংলাদেশের একটি বিশাল শ্রমবাজার রয়েছে সৌদি আরবে। সে বিষয়টিকেও মাথায় রাখতে হয়। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক সে বিষয়টিকেও মাথায় রেখে এদেশের সরকার কাজ করে থাকে। ফলে আমি আবারও বলছি- এরকমটি অবস্থায় বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাববলয়ের মধ্যে দিয়ে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের ইরানের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাবপোষণ তাতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর যথেস্ট প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি উদার পররাষ্ট্রনীতির দেশ। এখানকার পররাষ্ট্রনীতিতে যেকথাটি আছে সেটি হচ্ছে-সবার সাথে বন্ধুত্ব কারও সাথে শক্রতা নয়। সে কারণে আন্তর্জাতিক সবকিছু বিচার বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার একটু ধীরে চল নীতি অনুসরণ করে চলছে বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরান: কেন বাংলাদেশ সেভাবে  কাজে লাগাতে পারেনি সে সম্পর্কে আপনি কিছু কারণ বললেন, তো আমরা যতদূর জানি তাতে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য আরো বেশি সম্প্রসারিত হতে পারে কিন্তু হচ্ছে না। এটি সম্প্রসারিত হবে বলে আপনি কি আশা করছেন?

অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান: জ্বি, ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আমি আশা করি। ইরান প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে। প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইরানের কাছ থেকে অনেক সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। বিশ্বের বহুমুখী বাজার এখন ইরান ও বাংলাদেশে সম্প্রসারিত হয়েছে। তাছাড়া দুদেশের মধ্যে ঐতিহ্যের একটা সম্পর্ক তো আছে ঐতিহাসিকভাবে। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে একটা অনুকূল পরিবেশ হলেই আমার ধারনা দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবেই। অনুকূল পরিবেশ পেলেই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ইরানমুখী বলে আমি মনে করি। আর বাংলাদেশের প্রতি যে ভ্রাতৃত্বমূলক মনোভাব ইরান পোষণ করে সেদিক থেকে তারাও এগিয়ে আসবে। পারস্পরিক আদান প্রদানের মাধ্যমে অবশ্যই  দুদেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক  ও সাস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক সিদ্দুকুর রহমান সবশেষে আপনার কাছে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে জানতে চাইব, এখনও লাগাতারভাবে আমেরিকা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েই যাচ্ছে। তো তাদের এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান: এককথায় আমি বলব যে ইরানের মতো একটি দেশ যারা তাদের পরমাণু শক্তিকে মানবতা বিধ্বংসী কোনো কাজে লগিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। সেই দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত অবরোধকে অন্যায্য, অনৈতিক কাজ বলে মনে করি। এককেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থা এবং একে সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। ইরানের ওপর আমেরিকার একতরফা এই অবরোধের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের উচিত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং রুখে দাঁড়ানো। ইরানের পাশে থাকা দরকার।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৮

 

ট্যাগ

মন্তব্য