২০১৯-০৯-১১ ২১:০১ বাংলাদেশ সময়

ইমাম জাফর সাদেক (আ.) ও ইমাম মুসা কাজেম (আ.) যে অভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন তা হলো, বনি আব্বাসের স্বৈরশাসকরা নিজেদেরকে বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা আব্বাসের বংশধর হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাদেরকে খেলাফতের হক্বদার হিসেবে দাবি করত।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খেলাফতের হক্বদার ছিলেন খোদ রাসূলুল্লাহ (সা.)’র বংশধর ইমামগণ এবং এ কারণে তারা মানুষের মাঝে ছিলেন প্রচণ্ড জনপ্রিয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুনের পক্ষে এ বিষয়টি মেনে নেয়া ছিল কঠিন। একদিন হারুন ক্বাবা শরীফের পাশে সপ্তম ইমামকে দেখতে পেয়ে তাকে প্রশ্ন করেন: জনগণ কি গোপনে আপনার সঙ্গে দেখা করে আপনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং আপনাকে নিজেদের ইমাম ও নেতা মনে করে? এর উত্তরে ইমাম বলেন, ঠিক তাই এবং এর কারণ হচ্ছে, আমরা মানুষের অন্তরকে শাসন করি আর তুমি কেবল তাদের দেহের ওপর কর্তৃত্ব রাখো। মানুষের অন্তরে তোমাদের কোনো স্থান নেই।

ইমাম মুসা কাজেম (আ.)’র যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যে হেরে যাওয়ার এই কথা ভুলতে পারেননি বাদশা হারুন। তিনি নিজেকে জনগণের মধ্যে আল্লাহর রাসূলের অধিক ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার জন্য একদিন মদীনা সফরে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.)’র রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন: হে আল্লাহর নবী, হে চাচাতো ভাই, আপনার প্রতি দরুদ ও সালাম। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইমাম মুসা কাজেম (আ.)। হারুনের প্রতারণপূর্ণ বক্তব্যের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বলে ওঠেন: হে আল্লাহর রাসূল, হে পিতা, আপনার প্রতি দরুদ ও সালাম।  হারুন এবারও ইমামের এই বক্তব্যে হতচকিত হয়ে যান। তিনি উপায়ন্তর না দেখে বলে ওঠেন: আপনি কিভাবে নিজেকে রাসূলের সন্তান বলে দাবি করেন। আপনি তো আলীর সন্তান। সন্তানদের পরিচয় তো হয় দাদার বংশ থেকে নানার বংশ থেকে নয়। 

একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম পবিত্র কুরআনের সূরা আনআমের ৮৪ ও ৮৫ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন যেখানে হযরত দাউদ, সোলায়মান, আইউব, ইউসুফ ও মূসা আলাইহিমুস সালাম এবং আরো কয়েকজন নবীর পাশাপাশি হযরত ঈসা (আ.)কে হযরত নূহ (আ.)’র বংশধর বলে উল্লেখ করা  হয়েছে।  আয়াত তেলাওয়াতের পর ইমাম বলেন: এই আয়াতে ঈসাকে মহান নবীদের বংশধর বলা হয়েছে অথচ ঈসার পিতা ছিল না। তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর মা বিবি মরিয়মের গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। কাজেই এই আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী মায়ের পরিচয়েও সন্তানের পরিচয় হয় এবং আমরা আমাদের মা ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহার মাধ্যমে রাসূলের বংশধর। এবারও হারুনের পক্ষে কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব হয় না।

কিন্তু পরবর্তীতে আরেক স্থানে বাদশা হারুন আবার ইমামকে প্রশ্ন করেন: আপনি কিভাবে নবীর বংশধর হলেন? এবার ইমাম কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি প্রশ্ন করেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি এখন জীবিত হয়ে তোমার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন তুমি কি সে প্রস্তাব গ্রহণ করবে? হারুন এ প্রশ্নের এমন উত্তর দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন যাতে তিনি রাসূলের অনেক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন। তিনি বলেন: আমি শুধু আমার মেয়েকে বিয়েই দেব না সেইসঙ্গে আরব-অনারব সবার সামনে গর্ব করে বলব যে, আমি আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি।

এবার ইমাম মুসা কাজেম (আ.) আসল কথায় আসেন এবং বলেন: তুমি তো তোমার কথা বললে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এমনটি হবে না। আল্লাহর রাসূল যেমন আমার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন না তেমনি আমিও আমার মেয়েকে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেব না।  হারুন তখন বিস্ময়ভরে এর কারণ জানতে চান। ইমাম বলেন: কারণ, আমি রাসূলের সরাসরি বংশধর এবং ইসলামে সরাসরি বংশধরের সঙ্গে বিয়ে হারাম। রাসূলের সঙ্গে আমাদের এমনিতেই রক্তের বন্ধন রয়েছে নতুন করে আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি করার প্রয়োজন নেই। এভাবে এবারও ইমামের কাছে যুক্তিতর্কে হেরে যান হারুন। কিন্তু তিনি আহত সাপের মতো ফুঁসতে থাকেন এবং এর প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করেন।

মুসলিম বিশ্বের একটি প্রধান সংকট হলো মুসলমানদের নেতা হিসেবে তাদের ওপর চেপে বসা শাসকদের নিফাক বা দ্বৈত চরিত্র। তারা নিজেদেরকে ইসলামের ধ্বজাধারী হিসেবে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের বন্ধুত্ব ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে এবং ইসলামি বিধান তারা পালন করে লোকদেখানোর জন্য। বাদশা হারুনুর রশিদও ছিলনে এমনই একজন শাসক। তিনি একদিকে নিজেকে আল্লাহর রাসূলের একনিষ্ঠ অনুসারী বলে দাবি করতেন অন্যদিকে রাসূলের বংশধরদের সম্মানহানি করার চেষ্টায় ত্রুটি করতেন না। একবার হজের মওসুমে তিনি হজ শেষে মদীনায় গিয়ে রাসূলের রওজা মোবারক জিয়ারত করে আল্লাহর রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন: হে রাসূলে খোদা! আমি এসেছি আপনার সন্তান মুসা ইবনে জাফারকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে। তাকে আমি এজন্য আটক করেছি যে, তিনি মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করে তাদের মধ্যে যুদ্ধের দামামা বাজাতে চান।

হারুন এমন সময় এ বক্তব্য দেন যখন ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ মানব। ঈমানদারী ও তাকওয়ায় তার সমকক্ষ তো দূরের কথা অন্য কেউ তার ধারেকাছেও ছিল না। এমন একজন ব্যক্তিত্বকে হারুন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত করেন। ভবিষ্যতের মুসলিম শাসকদের এই মুনাফেকি চরিত্র সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এজন্যই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: আমি ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যকার মুমিন বা কাফির ব্যক্তিদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে তাদের ঈমানের গুণে রক্ষা করবেন এবং কাফেরদেরকে তাদের কুফরের জন্য অপমানিত করবেন। কিন্তু আমি উদ্বিগ্ন তাদের নিয়ে যাদের অন্তরে কুফরি থাকা সত্ত্বেও নিজেদেরকে ঈমানদার বলে জাহির করবে। এ ধরনের ব্যক্তিদের মুখের কথা হবে অত্যন্ত মধুর কিন্তু মুখে যা বলবে তা আমল করবে না।

বাস্তবে হয়েছেও তাই। ইমাম মুসা কাজেমকে যদি একজন প্রকাশ্য কাফের শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হতো তাহলে তার জন্য কাজটি ছিল অনেক সহজ। কারণ তাদের পরিচয় মুমিনদের কাছে ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বাদশা হারুন বাহ্যিকভাবে ইসলামের লেবাস পরে লোকদেখানো ইবাদত-বন্দেগি করে এবং অর্থের বিনিময়ে কবিদের মাধ্যমে নিজের স্তুতি গেয়ে জনগণের সামনে ঈমানদার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও ইমাম তাঁর সংগ্রাম বন্ধ করেননি এবং হারুনের স্বরূপ জনগণের সামনে উন্মোচন করে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /১১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য