• হেদায়াতের সূর্য  ইমাম মাহদির (আ) দাদা হাদী (আ) ও তাঁর অলৌকিক নানা ঘটনা

গত ১৫ জিলহজ ছিল বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইত বা নিষ্পাপ বংশধারায় জন্ম নেয়া দশম ইমাম হযরত আলী আন নাকি আল হাদীর ১২২৪ তম জন্ম-বার্ষিকী। ইরান ও ইরাকসহ বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় এই বার্ষিকী। 

মহানবী (সা:)’র আহলে বাইত বা তাঁর পবিত্র বংশধরগণ হলেন মহানবী (সা:)র পর মুসলমানদের প্রধান পথ প্রদর্শক। খোদা পরিচিতি আর সৌভাগ্যের পথরূপ আলোর অফুরন্ত আলোকধারাকে ছড়িয়ে দিয়ে মানবজাতিকে অজ্ঞতার আঁধার থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁরা রেখে গেছেন সংগ্রাম আর জ্ঞান-প্রদীপ্ত খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল আদর্শ। ইসলাম তার প্রকৃত রূপকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য এই আহলে বাইত (আ.)’র কাছে চিরঋণী।

বিশ্বনবী হযরত মোঃ: (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি  তোমাদের মাঝে দু'টি ভারী বা মূল্যবান জিনিস (আমানত হিসেবে) রেখে যাচ্ছি। যদি তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধর তবে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। ....(সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর কিতাব যা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত (রহমতের) ঝুলন্ত রশির ন্যায় এবং অপরটি হল আমার বংশধর; আমার আহলে বাইত। ...।"

তিরমিজি শরীফের এ হাদিস অনুযায়ী মহানবী (সা:)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের জানা এবং তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। (প্রায় একই ধরণের হাদিস মুসলিম শরীফসহ আরও কয়েকটি বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থে রয়েছে।) 

মহানবী (সা:)’র আহলে বাইত (আ.)’র অন্যতম সদস্য তথা দশম ইমাম আলী বিন মোঃ: আল হাদী আন নাকী (আ.)'র জন্ম-বার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ এবং বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে বিশেষ করে দশম ইমাম হযরত আলী আন নাকী আল হাদীর শানে অশেষ দরুদ ও সালাম। ইরাকের সামেরা শহরে সমাহিত এই মহান ইমামের  জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও দিক এখানে তুলে ধরছি: 

ইমাম নাকী বা হাদী (আ.) ২১২ হিজরির ১৫ ই জিলহজ বা খৃষ্টীয় ৮২৮ সালে মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ২২০ হিজরিতে পিতা ইমাম জাওয়াদ (আ.)’র শাহাদতের পর তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব নেন। ইমাম নাকী (আ.)’র মায়ের নাম ছিল সুমমানা খাতুন। 

ইমাম হাদী (আ.)’র সমসাময়িক ছিল সাত জন আব্বাসীয় শাসক বা কথিত খলিফা। এই সাতজন হল যথাক্রমে খলিফা মামুন, মুতাসিম, ওয়াসিক, মোতাওয়াক্কিল, মুন্তাসির, মোস্তাইন এবং মুতাজ। খলিফা মুতাসিম ইমাম হাদী (আ.)’র পিতাকে বাগদাদে বিষ প্রয়োগে শহীদ করেছিল। এ সময় ইমাম হাদী  (আ.) মদীনায় ছিলেন। ইমামতের মহান দায়িত্ব পালন এবং ইসলামী শিক্ষা ও বিধি বিধান প্রচারের জন্যে তিনি মদীনায় একটি কেন্দ্র গড়ে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের সব স্থানে তাঁর সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

ইমাম হাদী (আ.)’র জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে উপকৃত হবার জন্যে বহু দূর ও কাছের এলাকা থেকে জ্ঞান-পিপাসুরা তাঁর কাছে জড়ো হত। আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল জনগণের মধ্যে ইমাম হাদীর এতো জনপ্রিয়তা ও প্রভাব লক্ষ্য করে ভীত হয়ে পড়ে। ইমাম হাদী (আ.) আবদুল আজিম হাসানিসহ ১৮৫ জন ছাত্রকে উচ্চ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিলেন এবং তারা সবাই ছিল সে যুগের নানা জ্ঞানে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। 

ক্ষমতাসীন আব্বাসীয় শাসকরা আহলে বাইতের প্রত্যেক সদস্যকে জন-বিচ্ছিন্ন করে রাখতো যাতে তাঁদের বিপুল জনপ্রিয়তা সরকারের জন্য পতনের কারণ না হয়। শিশু ইমাম হাদী (আ.)-কে সুশিক্ষিত করার নামে তাঁকে জন-বিচ্ছিন্ন করে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তৎকালীন আব্বাসীয় শাসক এক বিখ্যাত পণ্ডিতকে তাঁর কাছে পাঠান। আবদুল্লাহ জুনাইদি নামের এই পণ্ডিত অল্প কয়েকদিন পরই ইমামের অতি উচ্চ মর্যাদা তথা ইমামতের বিষয়টি বুঝতে পারেন। শিশু ইমাম হাদী (আ.)’র জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করে জুনাইদি বলেছেন: জ্ঞানের যে ক্ষেত্রেই আমি আমার পাণ্ডিত্য তুলে ধরার চেষ্টা করতাম সেখানেই বনি হাশিমের এই মহান ব্যক্তিত্ব আমার সামনে বাস্তবতার দরজাগুলো খুলে দিতেন।... সুবাহানআল্লাহ! এত জ্ঞান তিনি কিভাবে আয়ত্ত করেছেন? মানুষ ভাবছে যে আমি তাঁকে শেখাচ্ছি, অথচ বাস্তবতা হল আমি তাঁর কাছে শিখছি। আল্লাহর শপথ জমিনের বুকে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।  

ইমাম নাকী (আ.)-কে কেন ইমাম হাদী বলা হত- এই বর্ণনা থেকেই তা স্পষ্ট। তিনি যতদিন মদীনায় ছিলেন জনগণের ওপর তাঁর গভীর প্রভাব শত্রুদের মনে ঈর্ষার আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। 

মসজিদে নববীর তৎকালীন পেশ ইমাম আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদও হিংসার এই আগুন থেকে মুক্ত ছিলেন না। তিনি ইমাম হাদী (আ.)’র নামে নানা অপবাদ দিয়ে চিঠি পাঠান আব্বাসীয় শাসক মুতাওয়াক্কিলের কাছে। মদীনায় শিশু ইমামের ব্যাপক প্রভাব ও উঁচু সামাজিক অবস্থান এই শাসকের কাছেও ছিল অসহনীয়। ফলে  মুতাওয়াক্কিল ইমাম হাদী (আ.)-কে মদীনা থেকে উত্তর বাগদাদের সামেরায় নিয়ে আসার জন্য ৩০০ ব্যক্তিকে পাঠায়। এই ৩০০ ব্যক্তির নেতা ছিল ইয়াহিয়া বিন হারসামাহ।  ইবনে জাওজি এই ঘটনা সম্পর্কে হারসামাহ’র উদ্ধৃতি তুলে ধরেছিলেন। হারসামাহ বলেছেন: 'যখন মদীনায় প্রবেশ করলাম তখন জনগণ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তারা ইমাম হাদী (আ.)’র প্রাণহানির আশঙ্কা করেই এভাবে কাঁদছিল। জনগণের ক্রন্দনে মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে।' 

এটা স্পষ্ট যে, মদীনার জনগণের প্রতিরোধের আশঙ্কার কারণেই মুতাওয়াক্কিল ইমাম হাদী (আ.)-কে সামেরায় নিয়ে আসার জন্য ৩০০ ব্যক্তি পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। 

ইমাম হাদী (আ.)'র পথ নির্দেশনায় জনগণ শাসকদের অত্যাচার অবিচার ও তাদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অযোগ্যতার কথা খুব অচিরেই বুঝে ফেলবে ও এভাবে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে –এমন আশঙ্কার কারণেই মুতাওয়াক্কিল ইমামকে কৌশলে তৎকালীন রাজধানী সামেরা শহরে নিয়ে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাধা বিপত্তি সত্বেও ইমাম হাদী (আ.) সামেরা শহরেও প্রকৃত ইসলাম প্রচার, যুগোপযোগী সংস্কার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং আব্বাসীয়দের প্রকৃত চেহারা তুলে ধরার কাজ অব্যাহত রাখেন। ফলে আব্বাসীয় শাসকরা এখনেও ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হারানোর আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। 

মদীনায় নিযুক্ত মোতাওয়াক্কিলের গভর্নর ইমাম হাদী(আ.)'র নামে কিছু মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে খলিফা মোতাওয়াক্কিলের কাছে চিঠি লেখে। ইমাম হাদীর পথ নির্দেশনায় জনগণ শাসকদের অত্যাচার অবিচার ও তাদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অযোগ্যতার কথা খুব অচিরেই বুঝে ফেলবে ও এভাবে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে বলেও মদীনার গভর্নর তার চিঠিতে উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় মুতাওয়াক্কিল ইমামকে কৌশলে তৎকালীন রাজধানী সামেরা শহরে নিয়ে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাধা বিপত্তি সত্বেও ইমাম হাদী (আ.) সামেরা শহরেও প্রকৃত ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন।  

  ইরাকের সামেরায় হাদী (আ) ও তার পুত্র ইমাম হাসান আসকারির (আ) পবিত্র মাজার

 

খলিফা মোতাওয়াক্কিল ইমাম হাদী (আ.)কে জব্দ ও অপমানিত করার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। ইমামকে সম্মান প্রদর্শনের নামে মোতাওয়াক্কিল তাঁকে নিজ দরবারে হাজির করে অপমানিত এবং কখনও  কখনও হত্যারও চেষ্টা করেছে। আব্বাসীয় এ খলিফার নির্দেশে ইমাম হাদী (আ.)’র ঘরে তল্লাশি চালানো হত। একবার তল্লাশি চালানোর পর তাঁর ঘরে মুদ্রার দুটি থলে পাওয়া যায়। একটি থলেতে ছিল খলিফা মোতাওয়াক্কিলের মায়ের পাঠানো দশ হাজার দিনার। খলিফার কাছে মোহর-করা ওই থলেটি আনা হলে ওই থলের মোহর বা সিলটি যে তার মায়ের তা সে বুঝতে পারে। ফলে খলিফার মায়ের ওপরও যে ইমাম হাদী (আ.)'র প্রভাব ছিল তা স্পষ্ট হয়।

একদিন মোতাওয়াক্কিল এক বৈঠকে ইমাম হাদী (আ.)কে ডেকে আনে। বৈঠকে প্রবেশ করা মাত্রই মুতাওয়াক্কিল ইমামকে একটি কবিতা বলার আহবান জানায়। ইমাম হাদী অপারগতা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোতাওয়াক্কিল নাছোড়বান্দা। ইমাম তখন বাদশাহ ও সম্রাটদের পরিণতি বর্ণনা করে শিক্ষামূলক একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। ঐ কবিতার বক্তব্য ছিল এ রকম-


তারা তাদের বসবাসের জন্যে সুউচ্চ প্রাসাদ গড়েছিল, 
রেখেছিল সশস্ত্র প্রহরী পাহারার,
আরও নানা ব্যবস্থা নিয়েছিল নিরাপত্তার ।
কিন্তু এসব কিছুই ঠেকাতে পারেনি মৃত্যু তাদের । 
কত সুরম্য অট্টালিকা আর প্রাসাদ তারা গড়েছিল 
এসবের নির্মাণে কত দীর্ঘ সময় তারা ব্যয় করেছিল
আশা  ছিল বিপদ আপদ থেকে বাঁচার,
কিন্তু মৃত্যুর হুংকার 
সেসব ইমারত থেকে বের করে এনেছে তাদেরকে, 
কালের বিবর্তনে সেসব প্রাসাদ তাদের
পরিণত হয়েছে মাটির স্তূপে। 
সেসবের অধিবাসীরা অট্টালিকা ছেড়ে হায়
স্থানান্তরিত হয়েছে মাটির নিকৃষ্ট গর্ত, খানা-খন্দ আর কবরের সংকীর্ণ গুহায়!

ইমাম হাদী (আ.)’র কবিতার মর্মস্পর্শী বক্তব্য উপস্থিত ব্যক্তিদের হৃদয় স্পর্শ করলো এবং মুতাওয়াক্কিলের মতো জালিম শাসককেও প্রকম্পিত করলো। মুতাওয়াক্কিলের দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। সে ইমামের কাছে ক্ষমা চাইলো এবং সসম্মানে তাঁকে বাড়ীতে ফেরত পাঠিয়ে দিলো।  

অন্য একদিন মুতাওয়াক্কিল এক বিতর্কের আয়োজন করে। ইমামের সাথে বিতর্কের জন্য সে যুগের দুই বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তি ইয়াহিয়া বিন আকসাম ও ইবনে সেক্কিতকে আমন্ত্রন জানানো হয়। ইয়াহিয়া বিন আকসাম প্রথমেই ইমামকে রাসূলদের মোজাজের ভিন্নতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। ইয়াহিয়া আকসাম বলেন, রাসুলদের মোজেজাগুলোর মধ্যে পার্থক্যের কারণ কি? মূসা (আ.)র মোজেজা কেন লাঠি, ঈসা (আ.)র মোজেজা কেন মানুষকে রোগমুক্ত বা পুনরুর্জ্জীবিত করা, আর কেনবাই হযরত মুহাম্মদ (আ.)র মোজেজা ছিল কুরআন? 

ইমাম হাদি (আ.) উত্তরে বললেন, মূসা (আ.)’র মোজেজা ছিল লাঠি কারণ সে যুগের সমাজে জাদুর প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশি। কাজেই মূসা (আ.) তার লাঠি দিয়ে অন্য সকল জাদুকরের জাদুকে অস্তিত্বহীন করে দিয়ে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। ঈসা (আ.)এর মোজেজা ছিল বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগীদের রোগমুক্ত করা বা মৃত ব্যক্তিকে পুণরায় জীবীত করা,কারণ সে সময় চিকিতসা ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল,তা সে যুগের মানুষকে বিস্মিত করেছিল। সে কারণে ঈসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মৃত মানুষকে জীবিত করে এবং দূরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে তুলে মানুষকে আল্লাহর ক্ষমতার কিয়দাংশ প্রদর্শন করেছেন। আর হযরত মুহাম্মদ (সা.)র সময় কবিতা ও সাহিত্য মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিল সে কারণে তিনি তার মোজেজা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারু ভাবে পালন করেন। ইমামের এই উত্তর শুনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়। এরপর ইবনে সেক্কিত ইমামকে প্রশ্ন করেন। ইমাম ধৈর্য্যের সাথে সেসব প্রশ্নেরও উত্তর দেন এবং ঐ বিতর্কে বিজয় লাভ করেন। ইমামের উপস্থিতিতে এ ধরনের প্রতিটি বিতর্কই পরিণত হতো মানুষের জন্য মুল্যবান শিক্ষার আসর। কাজেই ইমামের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই আরও বাড়তে থাকে। ফলে আরও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে আব্বাসীয়রা। এরই এক পর্যায়ে আব্বাসীয় খলিফার নির্দেশে ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। ইমামের শাহাদাতের খবরে গোটা মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইমাম হাদি (আ.)এর জানাজা নামাজে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ইরাকের সামেরায় অবস্থিত ইমাম হাদি (আ.)এর মাজারে আজও প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামে।

 মোতাওয়াক্কিল প্রকাশ্যেই হযরত আলী (আ.)’র ওপর লানত দিতো এবং হযরত আলী (আ.)’র প্রতি ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ করার জন্যে  একবার এক পেশাদার  ভাঁড়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২৩৭ হিজরিতে মোতাওয়াক্কিলের নির্দেশে ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাজারসহ আশপাশের অনেক বাড়ী ঘর ধ্বংস করা হয়েছিল এবং ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাজারের কোনো চিহ্ন যাতে না থাকে সে ব্যবস্থা  নেয়া হয়েছিল। 

মোতাওয়াক্কিলের শাসনামলে হিজাযে মহানবীর বংশধর তথা হযরত আলী(আ.)র বংশধরদের এমন দুরবস্থায় রাখা হয়েছে যে তাঁরা তাঁদের পরিবারের মহিলাদের হিজাব বা পর্দার জন্যে যথেষ্ট কাপড় সংগ্রহ করতে পারেননি। তাঁদের পরিবারের মহিলাদের অনেকেই পুরনো একটি চাদর পরে নামাজ আদায় করতেন। মিশরেও হযরত আলী (আ.)’র বংশধরদের প্রায় একই ধরনের চাপের মুখে রাখা হয়েছিল।

যাই হোক্, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অদ্বিতীয় ইমাম হাদী (আ.) অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও আলাপ আলোচনা ও যুক্তি তর্কের বৈঠকের আয়োজন করতেন এবং তাঁর অনুসারীদের চিন্তা ও ধ্যান ধারণাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। ইসলামের নামে যেসব ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত হয়েছিল সেগুলোকে তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। ইমাম হাদী (আ.) জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্যে দৃঢ় ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞানকে অন্যতম শর্ত বলে মনে করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে ইমাম হাদী(আ.)'র অপূর্ব যুক্তি তর্কের উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের পরিচিতিমূলক জিয়ারত 'জিয়ারতে জামে কবির' এই মহান ইমামের এক অনন্য ও অমর অবদান।

ইমাম বিভ্রান্ত চিন্তাধারার প্রচারকদের ওপর নজর রাখতেন। মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই, সে যা করে তা বাধ্য হয় বলেই করে- এই মতবাদ তথা জাবরিয়া মতবাদে বিশ্বাসীদের যুক্তি খণ্ডন করে ইমাম হাদী (আ.)  বলেছিলেন, 'এই মতবাদের অর্থ হল আল্লাহই মানুষকে পাপে জড়িত হতে বাধ্য করেন এবং পরে পাপের জন্য শাস্তিও দেন বলে বিশ্বাস করা। আর এই বিশ্বাসের অর্থ আল্লাহকে জালিম বলে মনে করা তথা তাঁকে অস্বীকার করা।' 
                          
কথিত খলিফা মুতাওয়াক্কিল ইমাম হাদী (আ.)কে জব্দ ও অপমানিত করার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। ইমামকে সম্মান প্রদর্শনের নামে মুতাওয়াক্কিল তাঁকে নিজ দরবারে হাজির করে অপমানিত এবং কখনও  কখনও হত্যারও চেষ্টা করেছে।

ইমাম হাদী(আ.)'র যুগে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুতাওয়াক্কিল নিজ পুত্রের হাতে নিহত হয় এবং এরপর আরও ৩ জন আব্বাসিয় শাসক ক্ষমতাসীন হয়। এরাও মুতাওয়াক্কিলের মতো ইমাম হাদী (আ.)কে তাদের শাসন ক্ষমতার পথে কাঁটা হিসেবে দেখতে পায়। এ অবস্থায় ২৫৪ হিজরির ২৬ শে জমাদিউস সানি আব্বাসীয় খলিফা মুতাজ ৪১ বছর বয়স্ক ইমাম হাদী (আ.)কে বিষ প্রয়োগে শহীদ করে। ফলে বিশ্ববাসী তাঁর উজ্জ্বল নূর থেকে বঞ্চিত হয়। 

ইমামের নানা অসাধারণ গুণের মধ্যে দানশীলতা ছিল অন্যতম। ইমাম হাদী (আ.)একবার এক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ত্রিশ হাজার দিরহাম বা স্বর্ণমুদ্রা দান করেছিলেন। ঐ ব্যক্তি বলেন: জনাব এ অর্থের তিনভাগের একভাগই আমার দেনা শোধ করার জন্যে যথেষ্ট। ইমাম হাদী (আ.) বললেন, বাকী অর্থ তোমার পরিবার পরিজনের জন্যে খরচ কর । লোকটি বললো: খোদায়ী পথপ্রদর্শক হবার যোগ্য কারা তা আল্লাহই ভালো   জানেন ।

ইমাম হাদী (আ.)’র মাধ্যমে অনেক মোঃ'জেজা বা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যেমন, আব্বাসীয় রাজার কয়েকজন জল্লাদ ও ভৃত্য রাজার নির্দেশে ইমাম (আ.)-কে আকস্মিকভাবে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়ে দেখতে পায় যে ইমামের চারদিকে রয়েছে একশ জনেরও বেশী সশস্ত্র দেহরক্ষী।

আর একবার রাজা মুতাওয়াক্কিল ইমামকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্য তাঁর সামনে ৯০ হাজার সেনার সশস্ত্র মহড়ার উদ্যোগ নিলে ইমাম হাদী (আ.) মুতাওয়াক্কিলকে আকাশ ও জমিনের দিকে তাকিয়ে দেখতে বললে সে দেখতে পায় যে, আকাশ আর জমিন ভরে গেছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অসংখ্য সশস্ত্র ফেরেশতায় এবং রাজা তা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

একই রাজা ইমামকে অপমান করার জন্য তাঁকে খাবারের দাওয়াত দেয়।  ইমাম খাবারে হাত দেয়া মাত্রই রাজার নিয়োজিত এক ভারতীয় জাদুকরের জাদুর মাধ্যমে ওই খাবার উধাও হয়ে যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই হাসতে থাকলে ইমাম জাদুকরের পাশে থাকা বালিশে অঙ্কিত সিংহের ছবিকে জীবন্ত হতে বলেন। সিংহটি জীবন্ত হয়ে ওই জাদুকরকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। মুতাওয়াক্কিল তাকে আবার জীবিত করার জন্য ইমামকে অনুরোধ করেন, কিন্তু ইমাম বললেন: আল্লাহর শপথ তুমি তাকে আর দেখবে না! তুমি কি আল্লাহও ওলির ওপর আল্লাহর শত্রুকে কর্তৃত্বশীল করতে চেয়েছিলে?

মুতাওয়াক্কিল কখন কিভাবে মারা যাবে তাও ইমাম আগেই বলেছিলেন। ইমামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঠিক সেভাবে ও সেই সময়ই মারা গিয়েছিল এই আব্বাসীয় রাজা। 

মুহাম্মাদ বিন শরাফ থেকে বর্ণিত হয়েছে: ইমাম হাদী (আ.)'র সঙ্গে মদীনার একটি রাস্তায় হাঁটছিলাম। ইমামের কাছে একটি প্রশ্ন করব বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশ্ন করার আগেই ইমাম হাদী (আ.) বললেন: 'আমরা এখন ভিড়ের মধ্যে রয়েছে এবং জনগণ চলাফেরা করছে। এখন প্রশ্ন করার জন্য ভালো সময় নয়।' (বিহারুল আনোয়ার)
মুহাম্মাদ বিন ফারাজ থেকে বর্ণিত হয়েছে: ইমাম হাদী (আ.) আমাকে বলেছেন, যখনই কোনো বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে চাও তা লিখে তোমার জায়নামাজের নিচে রাখবে এবং এক ঘণ্টা পর তা তুলে দেখবে। এরপর থেকে আমি এই পদ্ধতিতে ইমামের কাছ থেকে লিখিত জবাব দেখতে পেতাম। 

আবু হাশিম জা'ফরি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একদিন ইমামের সঙ্গে সামেরার বাইরে যান ও এক স্থানে দু'জনেই মুখোমুখি হয়ে মাটিতে বসেন। এ সময় আবু হাশিম তার তীব্র অভাবের কথা জানালে ইমাম ওই স্থানের ভূমি থেকে এক মুঠো বালি হাতে নিয়ে তা আবু হাশিমকে দেন এবং বলেন যে এগুলো তার অভাব দূর করবে ও যা দেখবেন তা যেন কাউকে না বলেন। আবু হাশিম শহরে ফিরে দেখেন যে সেই বালুগুলো লাল আগুনের মত চকচকে স্বর্ণ হয়ে গেছে। স্বর্ণকারকে তা দিয়ে বড় স্বর্ণের টুকরো করে দিতে বললে সে বিস্মিত হয়ে বলে: এমন ভালো ও বালু আকৃতির স্বর্ণ তো কখনও দেখিনি! কোথা থেকে এনেছ!?

দাউদ বিন কাসিম জাফরিকে হজের সফর উপলক্ষে বিদায় দিতে গিয়ে ইমাম সামেরার বাইরে নিজের বাহন থেকে নেমে হাত দিয়ে মাটিতে একটি বৃত্ত আঁকেন। এরপর ইমাম হাদী (আ.) বলেন: হে চাচা! এই বৃত্তের ভেতরে যা আছে তা থেকে আপনার সফরের খরচ উঠিয়ে নেন। জাফরি তাতে হাত দিতেই একটি স্বর্ণ-পিণ্ড পেলেন যার ওজন ছিল দুইশত মিসক্বাল। 

ইমাম হাদী (আ.)’র কয়েকটি বাণী শুনিয়ে শেষ করবো আজকের এ আলোচনা। তিনি বলেছেন: 
স্বার্থপরতা জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা এবং তা অজ্ঞতা ডেকে আনে।
 যা অন্তরে গৃহীত ও কাজে প্রকাশিত সেটাই মানুষের ঈমান। 
যে নিজের কাছেই হীন সে কখনও মন্দ ও অশুভ বিষয় থেকে মুক্ত নয়। 
হিংসা সৎকর্ম বা সৎ গুণাবলী ধ্বংস করে দেয় এবং ক্রোধ ডেকে আনে। 
আখেরাতের পুরষ্কার হল দুনিয়ার কষ্ট ও পরীক্ষার বিনিময়।

ইমাম হাদী (আ.)’র শুভ জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে আবারও অভিনন্দন জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশ্বনবী (সা)'র পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন #

পার্সটুডে/এমএএইচ/৭

২০১৭-০৯-০৭ ১৮:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য