কোনো কোনো বর্ণনামতে ১৩ই জমাদিউল আউয়াল বেহেশতি নারীদের সর্দার হযরত ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহার) শাহাদত বার্ষিকী। এ উপলক্ষে আমরা সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা এবং বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ আর সালাম।

হযরত ফাতিমার জন্ম হয়েছিল হিজরতের ৮ বছর আগে বিশে জমাদিউসসানি মহানবী (সা.) বলেছেন,‘চারজন নারী সমগ্র নারী জাতির মধ্যে সর্বোত্তম : মারইয়াম বিনতে ইমরান,আছিয়া বিনতে মুযাহিম,খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ। তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ফাতিমা।’

হযরত ফাতিমাকে রাগানোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, ফাতিমা আমার অস্তিত্বের অংশ। যে তাঁকে রাগান্বিত করে সে আমাকে রাগান্বিত করে।

বিশ্বনবী আরও বলেন,‘ফাতিমা কোন ব্যাপারে রাগান্বিত হলে আল্লাহ্ও রাগান্বিত হন এবং ফাতিমার আনন্দে আল্লাহ্ও আনন্দিত হন।’

 

হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ) ছিলেন নারী ও পুরুষ তথা গোটা মানব জাতির জন্য অসাধারণ ত্যাগ,বিশ্বস্ততা,অন্যায়ের ব্যাপারে আপোহীনতা,সততা,দানশীলতা, ধৈর্য,চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিসহ অনেক মহৎ গুণের আদর্শআর এ জন্যেই তাঁর উপাধি ছিল আস-সিদ্দিক্বা বা সত্য-নিষ্ঠ,আল-মুবারাকাহ বা বরকতপ্রাপ্ত,আত-ত্বাহিরা বা পবিত্র,আল-মারজিয়া বা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, বাতুল বা শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে  অতুলনীয় আদর্শ, আ জাকিয়া বা সতী, মুহাদ্দিসাহ বা হাদিসের বর্ণনাকারী, সাইয়্যিদাতুন নিসায়িল আলামিন বা নারীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, খাতুনে জান্নাত বা বেহেশতি নারীদের নেত্রী, আ যাহরা বা দ্যুতিময় ইত্যাদি আর পিতা মহানবীর প্রতি অশেষ ভালোবাসা ও সেবার কারণে তাকে বলা হত উম্মে আবিহা বা পিতার মাতা।

 

হযরত ফাতিমা যখন নামাজের জন্য দাঁড়াতেন তখন তাঁর জ্যোতি আকাশের ফেরেশতা ও অন্যান্যদের দিকে ছড়িয়ে পড়ত। আর এ কারণে তাঁকে যাহরা উপাধি দেয়া হয়।

রাসুল (সা)র ওফাতের পর তাঁকে সান্ত্বনা দিতে আসতেন ওহির ফেরেশতা।  ওহির ফেরেশতা তাঁকে ভবিষ্যত বিষয়ে অনেক কিছু জানান। আর তার থেকে সেসব বিষয় লিখে রাখেন হযরত আলী (আ)। আর এ জন্যই ফাতিমাকে বলা হয় মুহাদ্দিসা।

 

হযরত ফাতিমা খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। সংসারের যাবতীয় কাজ তিনি নিজের হাতে করতেন। মশক দিয়ে পানি তুলতে তুলতে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি যাঁতার মাধ্যমে এত পরিমাণ আটা তৈরি করতেন যেতাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। আর সেই আটা দিয়ে রুটি তৈরি করে সেগুলো মদীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করতেন। হযরত ফাতিমার কাপড়ের পোশাকে থাকতো তালিপার্থিব কোন বস্তুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারত না। আর এজন্যই রাসূল (সা.) তাঁকে বাতুল উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

 

তিনি সারারাত জেগে নামায পড়তেন, মহান আল্লাহর যিকির করতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের জন্য দো‘আ করতেন। তিনি এত বেশি নামায পড়তেন যে, তাঁর পা ফুলে যেত। সংসারের কাজ করার সময়ও তাঁর মুখে আল্লাহর যিকির থাকত।

 

রাসূলের স্ত্রী হযরত উম্মে সালামাহ্ বলেন : রাসূলের ওফাতের পর ফাতিমাকে দেখতে যাই এবং তাঁর অবস্থা জানতে চাই। তিনি জবাব দিলেন : অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টে দিন অতিবাহিত হচ্ছে।

 

এ রকম কষ্টের মধ্য দিয়েই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাতের অল্প কিছুদিন পরই হযরত ফাতিমা এ পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। রাসূল (সা.) ওফাতের আগে হযরত ফাতিমার কানে কানে বলে গিয়েছিলেন যেতিনিই তাঁর সাথে প্রথম মিলিত হবেন। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে এও জানিয়েছিলেন যেকীভাবে হযরত ফাতিমা তাঁর সাথে এত  তাড়াতাড়ি মিলিত হবেন। আর সেজন্যই কি রাসূল (সা.) বারবার তাঁর উম্মতকে সতর্ক করছেন যে,তারা যেন হযরত ফাতিমাকে কষ্ট না দেয়,তাঁকে অসন্তুষ্ট না করে?

হযরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ)’ পিতার শারীরিক বিদায়ের জন্যই কি খুব বেশি কাতর হয়ে পড়েছিলেন? না,বরং পিতার আদর্শ তথা ইসলামের শিক্ষা ম্লান ও বিকৃত হয়ে পড়ার নানা অশুভ লক্ষণও তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে তুলেছিল। রাসুলে খোদার কাছেই তিনি শুনেছিলেন তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওপর অনেক বিপদ ও মুসিবত তথা ইসলামের ওপরই অনেক দুর্যোগ নেমে আসবে। আর সেইসব বিপদের মুকাবিলা করার মত কঠিন ধৈর্যের খোদায়ী পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সর্বকালের সেরা মহামানবী হযরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ) ঠিক যেভাবে সিফফিন ও কারবালা প্রান্তরসহ যুগে যুগে নানা বিপদ, সংকট ও শত্রুতার মোকাবেলায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বিশ্বনবী (সা)র পবিত্র আহলে বাইতের অন্যান্য সদস্য

অনেকেই মনে করেন শত্রুতার প্রেক্ষাপটে হযরত ফাতিমা (সা.আ)-কে দাফন করা হয়েছিল মধ্যরাতে গোপনীয়ভাবে  অতি গোপন স্থানে যা আজো গোপন রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত গোপন থাকবে। হযরত ফাতিমার ওসিয়ত অনুযায়ী গোপনীয়তা বজায় রাখতে তাঁর দাফন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয় মাত্র কয়েকজন অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে।

 

হযরত ফাতিমা (সা.আ) জানতেন কখন তাঁর মৃত্যু হবে। আর এ জন্য তিনি নিজে গোসল করে নতুন ও পরিস্কার পোশাক পরে কিবলামুখী হয়েছিলেন।

তিনি তাঁর দুই প্রিয় সন্তান  ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন কিভাবে মারা যাবেন সেই তথ্যসহ ভবিষ্যত ইতিহাসের অনেক খবর রাখতেন। হুসাইন (আ.)'র হত্যাকারীদের অভিশাপ দিয়ে গেছেন তিনি। মদিনার নারী সমাজ ধর্মীয় বিষয়সহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করত হযরত ফাতিমা র কাছ থেকে। ফাদাক ও মানজিল শীর্ষক তাঁর ভাষণ এই মহামানবীর অতুল জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং দূরদর্শিতাকেই তুলে ধরে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ আলী, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের সন্তানদেরকে মানুষের জন্য হুজ্জাত বা দলিল করেছেন এবং তাঁরা হল জ্ঞানের দরজা।

 

'মাসহাফই ফাতিমা' নামে খ্যাত গ্রন্থটির সমস্ত তথ্য সন্নিবিশিত হয়েছে জিবরাইল ফেরেশতার সঙ্গে ফাতিমা (সা. আ.)'র কথোপকথনের মাধ্যমে যা লিখে গেছেন হযরত আলী (আ.)।

নবী-নন্দিনী বলেছেন, পৃথিবীতে তিনটি জিনিস আমার খুবই প্রিয়। আল্লাহর পথে ব্যয়,রাসূলে খোদা (সা.)র চেহারার দিকে তাকানো এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত। পবিত্র কুরআনের আয়াত শ্রবণ মুসলমানদেরকে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেয়। 

 

হযরত ফাতিমার শাহাদত উপলক্ষে সবাইকে আবারও গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের শানে পাঠাচ্ছি অশেষ দরুদ ও সালামহযরত ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)র একটি বক্তব্য তুলে ধরে শেষ করবো আজকের এই আলোচনা। তিনি বলেছেন, নারীদের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে, তারা যেন কোনো অচেনা পুরুষকে না দেখে এবং কোনো অচেনা পুরুষও তাদের না দেখে। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৩০

২০১৮-০১-৩০ ২১:০৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য