পবিত্র 'হজের তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য' সম্পর্কিত বিশেষ আলোচনা 'চল রে কাবার জিয়ারতে,চল নবীজীর (সা) দেশ' শীর্ষক আলোচনার প্রথম পর্বে আপানাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

একটি পরিপূর্ণ,বিশ্বজনীন,সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্ম মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রেই দেয় স্পষ্ট বিধি-বিধান ও শ্রেষ্ঠ নির্দেশনা। সর্বশেষ ও একমাত্র খোদায়ি ধর্ম ইসলাম মানুষের পরিচিতির পাশাপাশি তার বিশ্বাস,অনুভূতি ও আচরণকে গুরুত্ব দেয় এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রসহ জীবনের সবক্ষেত্রে মানুষকে গড়ে তুলতে চায় মহান আল্লাহর প্রকৃত প্রতিনিধির মর্যাদা দিয়ে। খোদায়ি মহৎ গুণগুলোর রঙ্গে মানুষকে রাঙ্গিয়ে তোলার জন্যই ইসলামে রয়েছে নানা ধরনের ইবাদত। ইসলামের নানা ইবাদত বিশেষ করে হজের মধ্যেও ইসলাম ধর্মের সামগ্রীকতা বা পরিপূর্ণতা ফুটে উঠে। হজ ইসলামের চিন্তা ও বিশ্বাসগত দিক ছাড়াও রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিকেরও প্রকাশ।

মহান আল্লাহর আন্তরিক ও সার্বিক দাসত্ব হল ইসলামী ইবাদতগুলোর মূল শিক্ষা। নিজেকে আল্লাহর জন্য পুরোপুরি খালেস করার মধ্যেই রয়েছে মুসলমানদের ইবাদতের প্রকৃত সাফল্য। আল্লাহকে জানা এবং আল্লাহর প্রিয়জন তথা মানব জাতির মহান শিক্ষকদেরকে ভালোভাবে জানা ও এসবের আলোকে নিজের দায়-দায়িত্বকে জানা ছাড়া কোনো মানুষ আল্লাহর প্রকৃত বা ভালো দাস হতে পারে না। আল্লাহর প্রকৃত দাস হওয়ার জন্য যেসব আত্মত্যাগ ও ধৈর্য দরকার তারই অন্যতম প্রশিক্ষণ আর অনুশীলনের ক্ষেত্র হচ্ছে পবিত্র হজব্রত।  

হজ হচ্ছে পথ-হারাদের পথ থেকে সুপথে বা আলোর উৎস তথা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। হজ হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব-মুখী বা অন্য সব ধরনের প্রবণতা ত্যাগ করা এবং শুধু আল্লাহর সান্নিধ্য চাওয়া। 

নামাজী যেমন নামাজ পড়ার আগে অজুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করেন, তেমনি হজযাত্রীকে পবিত্রতা অর্জনের লক্ষ্যে বৈধ-উপায়ে অর্জিত ইহরামের পোশাক পরতে হয় এবং গোসলের মাধ্যমে সবধরনের বাহ্যিক ও আত্মিক গোনাহ ধুয়ে ফেলার বা বর্জনের অঙ্গীকার করতে হয়। মৃত্যু-পথযাত্রী যেমন সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং সবার পাওনা বুঝিয়ে দেন বা ওসিয়তনামা লেখে যান, তেমনি হজযাত্রীকেও এই একই কাজ করতে হয়, অতীতের গোনাহ বা পাপের জন্য ক্ষতিপূরণ বা প্রায়শ্চিত্তও করতে হয়। তাকে ভাবতে হয় যে এটাই তার অন্তিম সফর। এ মুসাফির বা হজযাত্রী মৃত ব্যক্তির মত এমন এক স্থানে যাচ্ছেন যেখানে সবাই সমান, শুধু যার সৎকর্ম বেশী তিনিই সেখানে আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়, কিন্তু দুনিয়াতে আল্লাহর সৃষ্টি মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই সমান। হজের মধ্যে সবাই পবিত্রতার প্রতীক শ্বেত-শুভ্র কাফনের পোশাক পরে ইসলামের সাম্যের চেতনাই তুলে ধরেন।

হজযাত্রী সেলাইবিহীন এই সাদা পোশাক পরে কেবল আল্লাহর আনুগত্যের পোশাক পরার ও গোনাহ বা সব ধরনের আনুগত্যহীনতা থেকে দূরে থাকার শপথ নেন। সেলাইবিহীন ও সাদা কাপড় পরে এটা বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে যে মৃত্যুর পরে এ পোশাক পরেই আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে হবে। সৎকর্ম ছাড়া গর্বের রংবেরংয়ের পোশাক, পদমর্যাদা, আভিজাত্য ও অহংকার সেখানে কোনোই কাজে আসবে না। এভাবে হজের মধ্যে বিচার-দিবস ও কিয়ামত তথা পুনরুত্থানের মহড়া তথা হাশরের ময়দানের মহড়া দেয়া হয়।

হজের মধ্যে তালবিয়া উচ্চারণের তাৎপর্য হল,হে আল্লাহ! আমি যা সত্য ও সঠিক তা-ই যেন বলি, অন্যায় কথা বা অন্যায় সাক্ষ্য থেকে যেন দূরে থাকি। এভাবে জিহ্বা ও চিন্তার পবিত্রতা তথা আত্মিক-পবিত্রতা অর্জন হজের অন্যতম লক্ষ্য। ইহরামের তাৎপর্য হল, আল্লাহর নির্দেশিত হালাল ও হারামকে সব সময় মেনে চলার অঙ্গীকারে অটল থাকা। আল্লাহর ঘর তাওয়াফের অর্থ হল, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই মানুষের সমস্ত তৎপরতার লক্ষ্য হওয়া উচিত,দুনিয়ার ঘর-বাড়ী নয়,আল্লাহর ঘরই মানুষের প্রকৃত ঠিকানা।

হাজরে আসওয়াদ বা পবিত্র কালো পাথরে হাত রাখা বা চুমো দেবার তাৎপর্য হলো আল্লাহর প্রতীকী হাতে হাত রেখে তাঁর নির্দেশ পালনের অঙ্গীকার করা ও তাঁর নিদের্শকেই শিরোধার্য মনে করা। সাঈ বা সাফা ও মারওয়াতে দৌড়ানোর অর্থ হলো ভয় ও আশার মাঝামাঝি অনুভূতি নিয়ে ইহকালীন এবং পারলৌকিক কল্যাণ লাভের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা। এর সাথে জড়িয়ে আছে সন্তানের পিপাসা মেটানোর জন্য বিবি হাজেরার প্রচেষ্টার পূণ্য-স্মৃতি।

আরাফাতে অবস্থানের তাৎপর্য হল আল্লাহ সম্পর্কে জানা, আল্লাহ যে সর্বশক্তিমান এবং সব জানেন ও সব-কিছুই যে তাঁর কাছেই চাওয়া উচিত- এইসব বিষয়ে চেতনাকে শানিত করা। আরাফাতে অবস্থিত জাবাল আর রাহমাত নামক পর্বত মুমিন বা বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতের প্রতীক। মোটকথা আরাফাতের ময়দান শাহাদত, মারেফাত তথা আল্লাহকে জানা ও খোদাপ্রেমের রহস্য বা ইরফানকে উপলব্ধির ক্ষেত্র। হজযাত্রীরা এখানে স্মরণ করেন অনেক মহামানবের অমর কীর্তিকে।

আরাফাত ও মীনার মধ্যবর্তী স্থান মাশআরুল হারাম নামক স্থানে রাত্রি যাপন হজ্বের আরেকটি বড় দিক। এখানে রাত্রি যাপনের দর্শন হল নিজের মধ্যে খোদাভীতির চেতনা ও শ্লোগানকে বদ্ধমূল করা। এখানে থেকে হাজিরা শয়তানকে পাথর মারার জন্য পাথরের নুড়ি সংগ্রহ করেন। শয়তানকে মোকাবেলার জন্য তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন পূর্ব শর্ত।

মীনায় শয়তানকে পাথর বা কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে জড়িয়ে আছে হযরত ইব্রাহীম (আ.) 'র স্মৃতি। তিনি যখন একমাত্র সন্তান ঈসমাইল (আ.) কে কুরবানী করতে উদ্যত হন তখন শয়তান মানুষের ছবি ধরে তাঁকে এ কাজে বিরত রাখার জন্য কূমন্ত্রণা দেয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় তিনি শয়তানকে তাড়ানোর জন্য কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন। নিজের মনকে ও সমাজকে শয়তানের বা তাগুতি শক্তিগুলোর হাত থেকে রক্ষার মহাশিক্ষা রয়েছে এ ঘটনায়।

শয়তানকে পাথর ছোঁড়া বলতে মানুষের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ কূপ্রবৃত্তি দমন করার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের শোষক এবং তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করাকে বোঝায়। বর্তমান যুগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোই শয়তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাই তাদের দোসর ও অনুচরদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হবার শপথ নেয়া এবং সমাজে প্রকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও প্রয়োজনে সামরিক সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া হজের অন্যতম শিক্ষা।

সন্তান-সন্ততি মানুষের সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু প্রয়োজনে তা-ও আল্লাহর জন্য বিলিয়ে দেয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন হযরত ইব্রাহীম ও হযরত ঈসমাইল (আ.) । কাবা ঘর তাওয়াফ শেষ করার পর হাজিকে মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়। এর প্রতীকী তাৎপর্য হল,হাজিকে ইব্রাহিম (আ.) 'র মত পবিত্র হতে হবে এবং একনিষ্ঠ একত্ববাদী হয়ে নামাজ পড়তে হবে। এভাবে নিজেকে শুদ্ধ, পবিত্র ও যোগ্য করার পরই হাজি বা ঈমানদার মানুষ সমাজ-সংস্কারে নিয়োজিত হতে পারেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/২০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন

২০১৮-০৮-২০ ১৫:৩১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য