• ইরাকের কুফায় হযরত মেইসাম তাম্মারের (রা) পবিত্র মাজার
    ইরাকের কুফায় হযরত মেইসাম তাম্মারের (রা) পবিত্র মাজার

১৩৭৮ চন্দ্রবছর আগে ৬০ হিজরির ২২ জিলহজ খোদাদ্রোহী জালিম শাসক ইয়াজিদের নিযুক্ত কুফার গভর্নর ওবায়দুলল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশে বর্বরোচিতভাবে শহীদ করা হয় প্রখ্যাত বিপ্লবী মুসলমান মেইসাম আত তাম্মারকে (রা) (মেইসাম আত তাম্মার নামের অর্থ খেজুর বিক্রেতা)।

ইরানি বংশোদ্ভূত এই বিপ্লবী মুসলমান জন্ম নিয়েছিলেন নাহরাওয়ানের কাছে। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে একটি আরব পরিবারের দাসে পরিণত হতে বাধ্য করে এবং তারা তার নাম বদলে দিয়ে তাকে সালেম বলে অভিহিত করত।

আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) তাকে কিনে নন এবং তার আসল নাম পুনরায় ফিরিয়ে দেন। তিনি তাকে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর সঠিক অর্থ, ব্যাখ্যা, আধ্যাত্মিক নানা মূল্যবোধ এবং তাকে সাধারণ ও অসাধারণ বিষয়ের নানা জ্ঞান শিক্ষা দেন। তাকে যে একটি গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হবে এবং তার হাত, পা ও জিহ্বা কাটা হবে সেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন হযরত আলী (আ)। ইসলামের পক্ষে এবং মহানবীও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মর্যাদার পক্ষে বক্তব্য রাখার দায়েই যে তাকে এভাবে শহীদ করা হবে তা তিনি মেইসামকে জানিয়েছিলেন। মেইসাম (রা)-কে ঠিক সেভাবেই শহীদ করেছিল খোদাদ্রোহী উমাইয়া শাসকগোষ্ঠী।

এর আগে মহাবীর মুখতারের সঙ্গে কারাগারের একই প্রকোষ্ঠে ছিলেন মেইসাম। সে সময় তিনি মুখতারকে জানিয়েছিলেন যে তাকে (মেইসামকে) কিভাবে শহীদ করা হবে। মুখতার যে ইমাম হুসাইন (আ)সহ কারবালার মহান শহীদদের রক্তের বদলা নেবেন ঘাতকদের কাছ থেকে তাও মেইসাম মুখতারকে জানিয়েছিলেন।   

কারবালা বিপ্লবের ইতিহাস বিষয়ক বই (আল্লামা আব্বাস বিন মুহাম্মাদ রেজা আল কুম্মির লেখা) 'নাফাসুল মাহমুম' বা  'শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস' শীর্ষক বইয়ে হযরত মেইসামের পরিচয় ও শাহাদত প্রসঙ্গে যে বর্ণনা রয়েছে তা এখানে তুলে ধরছি: 

মেইসাম বিন ইয়াহইয়া আত-তাম্মারের শাহাদাত

(মহররম মাসের আগেই জিলহজ মাসে কুফার উদ্দেশে পাঠানো ইমাম হুসাইন (আ)'র দূত ও চাচাতো ভাই) মুসলিম বিন আক্বীলের শাহাদাতের সময়ে আরও যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিলো তা হচ্ছে আত-তাম্মার ও রুশাইদ আল হাজারির শাহাদাত। এছাড়া এখানে হুজর বিন আদি এবং আমর বিন হুমাক্বের শাহাদাতের ঘটনা উল্লেখ করাও যথাযথ হবে।

মেইসাম ছিলেন আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) এর একজন বিশিষ্ট ও পছন্দনীয় সাথী ; প্রকৃতপক্ষে তিনি , আমর বিন হুমাক্ব , মুহাম্মাদ বিন আবু বকরএবং ওয়েইস ক্বারনি ছিলেন তার শিষ্য। তাদের মেধা ও যোগ্যতা খেয়াল রেখে ইমাম আলী (আ.) তাদেরকে ইলমে লাদুন্নি (লুকানো জ্ঞান) এবং রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন যা তাদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে প্রকাশিত হতো।

একবার আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে মেইসাম, যিনি ইমাম আলী (আ.) এর ছাত্রদের একজন ছিলেন এবং তার কাছ থেকে কোরআনের তাফসীর শিখেছিলেন এবং যাকে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া‘ জাতির একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব’ বলে উল্লেখ করেছিলেন , বলেছিলেন যে ,“ হে আব্বাসের সন্তান, আমাকে কুরআনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস করো যেহেতু আমি কুরআনের আয়াতসমূহ ইমাম আলী (আ.) এর সামনে তিলাওয়াত করেছি এবং এর ব্যাখ্যা তার কাছ থেকে গ্রহণ করেছি।” আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস তার কাজের মহিলাকে বললেন ,“ আমার জন্য একটি কাগজ ও কলম নিয়ে এসো।” এরপর লিখে নিতে শুরু করলেন ।

বর্ণিত হয়েছে যে , যখন মেইসামকে ক্রুশে ঝোলানোর আদেশ দেয়া হলো তিনি চিৎকার করে বললেন ,“হে জনতা, যে চায় বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) এর রহস্যময় উক্তিগুলো শুনতে , সে যেন আমার কাছে আসো।” এ কথা শুনে জনতা তার চারদিকে জড়ো হলো এবং তিনি বিস্ময়কর হাদীসগুলো বর্ণনা করতে শুরু করলেন । এ সম্মানিত ব্যক্তি (আল্লাহর রহমত হোক তার উপর) রোযা রাখতেন এবং তা এমন ছিলো যে অতিরিক্ত ইবাদত ও রোযা রাখার কারণে তার চামড়া শুকিয়ে গিয়েছিলো।

‘ কিতাব আল গারাত’ -এ ইবরাহীম সাক্বাফি বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আলী (আ.) মেইসামকে প্রচুর জ্ঞান ও গোপন রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন যা তিনি মাঝে মাঝে লোকদের বলতেন। কুফার লোকেরা এগুলো শুনে সন্দেহে পড়তো এবং ইমাম আলী (আ.) এর বিরুদ্ধে যাদু ও ধোঁকার অভিযোগ তুলতো (কারণ তারা তা হজম করতে পারতো না এবং বুঝতেও পারতো না)।

একদিন ইমাম আলী (আ.) তাঁর সত্যিকার অনুসারী ও সংশয়ে ভোগে এমন একটি বড় দলের সামনে বললেন ,“ হে মেইসাম , আমার মৃত্যুর পর তোমাকে ধরা হবে এবং ক্রুশে ঝোলানো হবে। আর এর আগের দিন তোমার মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে যা তোমার দাড়িকে রাঙিয়ে দিবে। তৃতীয় দিন একটি অস্ত্র তোমার পাকস্থলীর ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হবে যা তোমার মৃত্যু ঘটাবে। তাই সেই দিনটির দিকে তাকিয়ে থাকো। যে জায়গায় তোমাকে ঝোলানো হবে তা আমর বিন হুরেইসের বাড়ির দিকে মুখ করা। তুমি সে দশ জনের একজন হবে যাদেরকে ঝোলানো হবে এবং তোমার ক্রুশের কাঠ হবে সবচেয়ে খাটো এবং তা মাটির নিকটবর্তী থাকবে ; আমি তোমাকে সেই খেজুর গাছটি দেখাবো যার কাণ্ডে তোমাকে ঝোলানো হবে।”

এর দুদিন পরই তিনি তাকে খেজুর গাছটি দেখালেন। এরপর থেকে সব সময় মেইসাম গাছটির কাছে আসতেন এবং দোআ পড়তেন , আর বলতেন ,“ কী বরকতময় একটি খেজুর গাছ তুমি , কারণ তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তুমি বড় হচ্ছো আমার জন্য।”

ইমাম আলী (আ.) এর শাহাদাতের পর মেইসাম প্রায়ই খেজুর গাছটি দেখতে যেতেন ঐ সময় পর্যন্ত যখন তা কেটে ফেলা হলো। এরপর তিনি গাছের কাণ্ডের অংশগুলো দেখাশোনা করে রাখতেন। তিনি আমর বিন হুরেইসের কাছে যেতেন এবং বলতেন ,“ আমি তোমার প্রতিবেশী হবো , তাই এলাকার অধিকার ভালোভাবে পূর্ণ করো।” আমর এর অর্থ বুঝতে না পেরে বলতো ,“ তুমি কি ইবনে মাসউদ অথবা ইবনে হাকীমের বাড়ি কিনতে চাও ?”

কিতাবুল ফাযায়েলে লেখা আছে , ইমাম আলী (আ.) মাঝে মাঝেই কুফার মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসতেন এবং মেইসামের কাছে বসতেন এবং তার সাথে কথা বলতেন। একদিন তিনি যথারীতি মেইসামের কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আমি কি তোমাকে সুসংবাদ দিবো ?”

মেইসাম জিজ্ঞেস করলেন , তা কী ? তিনি বললেন ,“ একদিন তোমাকে ঝোলানো হবে।”

তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে মাওলা (অভিভাবক) , আমি কি মুসমলান হিসেবে মৃত্যুবরণ করবো ?” ইমাম (আ.) হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন।

আক্বিক্বি বর্ণনা করেন যে , আবু জাফর ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বীর (আ.) মেইসামকে খুব ভালোবাসতেন , আর মেইসাম ছিলেন একজন বিশ্বাসী , সমৃদ্ধির সময় কৃতজ্ঞ এবং বিবাদে সহনশীল।

হাবীব বিন মুযাহির ও মেইসাম আত-তাম্মারের সাক্ষাৎ

‘ মানহাজুল মাক্বাল’ -এ শেইখ কাশশি থেকে বর্ণিত হয়েছে , যিনি তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন ফযল বিন যুবাইর পর্যন্ত , যিনি বর্ণনা করেন যে: একদিন মেইসাম তার ঘোড়ায় বসা ছিলেন এবং তিনি হাবীব বিন মুযাহির আসাদির (কারবালার অসম যুদ্ধে ইমাম হুসাইন-আ'র বৃদ্ধ সেনাপতি) পাশ দিয়ে গেলেন , তখন তিনি বনি আসাদ গোত্রের কিছু লোকের মাঝে ছিলেন। তারা পরস্পরের সাথে এমনভাবে কথা শুরু করলেন যে তাদের ঘোড়াগুলোর মাথাগুলো একসাথে হলো। হাবীব বললেন ,“ নিশ্চয়ই আমি একজন টাকওয়ালা বৃদ্ধ মানুষকে দেখছি , যার একটি বড় পেট রয়েছে , যে দারুর-রিযক্বের কাছে তরমুজ বিক্রি করে। তাকে ক্রুশে ঝোলানো হবে নবীর আহলুল বাইত (পরিবার) (আ.) এর প্রতি তার ভালোবাসার কারণে এবং ক্রুশেই তার পেট ফুটো করা হবে।” 

মেইসাম বললেন ,“ আমিও একজন লাল চেহারার মানুষকে চিনতে পারছি যার লম্বা সিঁথি রয়েছে যে নবী (সা.) এর নাতিকে রক্ষায় এবং সাহায্য করতে যাবে এবং নিহত হবে ; আর তার ছিন্ন মাথা কুফায় প্রদর্শিত হবে।” এ কথা বলে দুজনেই পরস্পরকে ছেড়ে গেলেন। যে লোকগুলো সেখানে ছিলো তারা তাদের কথাবার্তা শুনলো এবং তারা বললো ,“ আমরা এ দুজনের চেয়ে বড় মিথ্যাবাদী কখনো দেখি নি।” তারা তখনও চলে যায় নি এমন সময় রুশাইদ হাজারি এলেন তাদের (মেইসাম ও হাবীবকে) খুঁজতে এবং লোকদেরকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বললো তারা চলে গেছে এবং তাদের কথাবার্তা বর্ণনা করলো।

রুশাইদ বললেন , আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক মেইসামের ওপরে , সে একটি বাক্য বলতে ভুলে গেছে ,“ যে ব্যক্তি ছিন্ন মাথা কুফায় নিয়ে আসবে সে একশ দিরহাম পুরস্কার পাবে।” এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। যখন লোকেরা তার কাছে এ কথা শুনলো তারা বললো ,“ নিশ্চয়ই এ হচ্ছে তাদের দুজনের চেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।” পরে এ লোকগুলো বলেছে যে , কিছুদিন পরই আমরা মেইসামকে আমর বিন হুরেইসের বাড়ির কাছে ক্রুশে দেখলাম এবং হাবীব বিন মুযাহিরের ছিন্ন মাথা কুফায় ঘোরাতে দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে তাকে শহীদ করার পর। এভাবে আমরা নিজের চোখে তা ঘটতে দেখলাম যা ঐ ব্যক্তিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

মেইসাম বলেন যে, একদিন ইমাম আলী (আ.) আমাকে ডাকলেন এবং বললেন ,“ সে সময়ে তোমার কী অবস্থা হবে, হে মেইসাম, যখন ঐ ব্যক্তি, যার পিতার পরিচয় জানা যায় না (জারজ সন্তান), কিন্তু বনি উমাইয়া তাকে নিজেদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করেছে (অর্থাৎ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ), তোমাকে ডাকবে এবং তোমাকে আদেশ করবে যেন তুমি আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও ?”

আমি বললাম ,“ হে বিশ্বাসীদের আমির , আল্লাহর শপথ আমি কখনই আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবো না।” তিনি বললেন ,“ সে ক্ষেত্রে তোমাকে হত্যা করা হবে এবং ক্রুশে ঝোলানো হবে।” আমি বললাম ,“আল্লাহর শপথ, আমি তা সহ্য করবো এবং তা হবে আল্লাহর রাস্তায় খুবই কম।”

ইমাম আলী (আ) বললেন,“ হে মেইসাম, তুমি (বেহেশতে) আমার সাথে থাকবে আমার মর্যাদায়।”

সালেহ বিন মেইসাম বর্ণনা করেন যে, আবু খালিদ তাম্মার আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে: একদিন আমি এক শুক্রবারে ফোরাত নদীতে মেইসামের সাথে ছিলাম যখন একটি ঝড় শুরু হলো। মেইসাম, যিনি যিয়ান নামে একটি নৌকাতে বসা ছিলেন, বের হয়ে এলেন এবং ঝড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন ,“ নৌকাকে শক্ত করে বাঁধো। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি একটি ভীতিকর ঝড় শুরু হবে। আর মুয়াবিয়া এইমাত্র মারা গেছে।” যখন পরবর্তী শুক্রবার এলো , সিরিয়া থেকে এক দূত এলো , আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার কাছে কী সংবাদ আছে জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো ,“ সেখানে জনগণ ভালো অবস্থায় আছে , মুয়াবিয়া মাত্র মারা গেছে এবং জনগণ ইয়াযীদের কাছে আনুগত্যের শপথ করছে।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোন দিন সে মারা গেছে , সে বললো , গত শুক্রবার। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/১৩

 

২০১৭-০৯-১৪ ০০:৪৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য