গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে শুরু করছি 'মানবজাতির মুক্তি ও সর্বোত্তম উন্নয়নের দিশারী বিশ্বনবী (সা)' শীর্ষক বিশেষ আলোচনা।

২৮ সফর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ দিন। কারণ দশম হিজরির এই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)। শুধু তাই নয় চল্লিশ বছর পর ৫০ হিজরির একই দিনে শাহাদত বরণ করেন মহানবীর প্রথম নাতি ও তাঁরই আদর্শের অন্যতম প্রধান সুরক্ষক তথা ইসলাম-তরীর অন্যতম সফল কাণ্ডারি  হযরত ইমাম হাসান (আ)।

বিশ্বনবী (সা) ছিলেন শান্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামী ঐক্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার। তিনি ছিলেন 'মানবজাতির মুক্তি ও সর্বোত্তম উন্নয়নের দিশারী। মানবজাতির নৈতিক উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়নকে পরিপূর্ণতা দিতেই ঘটেছিল তাঁর আবির্ভাব।  

বিশ্বনবী (সা.)'র আবির্ভাব ঘটেছিল মানব জাতির এক চরম দুঃসময়ে যখন বিশ্বজুড়ে বিরাজ করছিল হানাহানি, জাতিগত সংঘাত, কুসংস্কার, অনাচার এবং জুলুম ও বৈষম্যের দৌরাত্ম্য। নারী জাতির ছিল না কোনো সম্মান। শির্ক ও কুফরির অন্ধকারে গোটা পৃথিবী হয়ে পড়েছিল আচ্ছন্ন। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.) তাঁর শুভ জন্মের ৪০ বছর পর নবুওতি মিশন তথা ইসলামের বৈপ্লবিক নানা বাণী নিয়ে অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং সব ধরনের উন্নত নৈতিক গুণ-বিবর্জিত মূর্তি পূজারী বর্বর আরব জাতির মধ্যে এমন পরিবর্তন সৃষ্টি করেন যে তারা মানব জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতাসহ নানা ক্ষেত্রে সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা উপহার দিতে সক্ষম হয়।

বিশ্বনবী (সা)’র বহু মু’জিজার মধ্যে সবচেয়ে বড় মু’জিজা বা অলৌকিক সাফল্য হল, অসভ্য ও বর্বর আরব জাতির চরিত্রকে বিস্ময়করভাবে বদলে দেয়া। 

বিশ্বনবী (সা)’র আহ্বানে এক আল্লাহতে বিশ্বাসী তথা মুসলমান হওয়ার আগে কেমন ছিল আরবরা? আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ)’র বর্ণনাসহ নানা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, সে যুগে আরবরা এমন কোনো অনাচার নেই যা তারা করত না। তারা নিজেরা নানা মূর্তি বানিয়ে সেইসব মূর্তির পূজা করত। এক আরব গোত্রের লোকদের সখ হল তারা মিষ্টি দিয়ে মূর্তি বানিয়ে সেই মূর্তির পূজা করবে! তাই খেজুরের সঙ্গে তেলসহ নানা উপাদান মিশিয়ে বানানো হল মূর্তি! এরপর শুরু হল পূজা। কিন্তু একই সময়ে শুরু হল দুর্ভিক্ষ। খাদ্যাভাব ও ক্ষুধার চাপ সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সেই মিষ্টি ‘খোদাকে’ই খেয়ে ফেলে তারা!

বিশ্বনবী (সা)'র নেতৃত্বে আরব বিশ্বে সংস্কার হওয়ার আগে আরবরা সাপ ও ইঁদুরসহ নানা ধরনের অখাদ্য ও কুখাদ্য খেত (মহানবীর পূর্বপুরুষদের একটি ধারা ছাড়া প্রায় সবাই)। প্রায় সব ধরনের প্রাণীই তারা খেত! আরবরা উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ থাকত।

মহানবীর নেতৃত্বে মুসলিম সমাজ গঠনের আগে আরব দেশে রক্তপাত ও যুদ্ধ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আরবদের বেশিরভাগই তখন জীবিকা নির্বাহ করতে চুরি-ডাকাতি ও লুটপাটের মাধ্যমে। একবার এক আরব গোত্র গেল অন্য এক গোত্রের ঘর-বাড়ি লুট করতে। লুটপাট করা শেষ করে নিজেদের আবাসে এসে দেখল যে তাদের ঘর-বাড়ি লুট করে গেছে অন্য কোনো গোত্র!

আরবদের মধ্যে ব্যভিচার ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। পতিতা নারীরা তাদের ঘরে বিশেষ পতাকা উড়িয়ে রাখত যাতে খদ্দেররা সহজেই তাদের চিনতে পারে। তাদের মধ্যে নানা ধরনের অদ্ভুত বিয়ের প্রথাও প্রচলিত ছিল। যেমন, এক নারীর সঙ্গে দশজন বা তার চেয়েও বেশি পুরুষের বিয়ে! এক্ষেত্রে যেসব অবৈধ সন্তান জন্ম নিত তার পিতা কে- সেটা নির্বাচন করত ওই নারী!

বিশ্বনবী (সা)'র নেতৃত্বে আরব বিশ্বে মুসলিম সমাজ গঠনের আগে কোনো কোনো পুরুষের যখন আর সন্তান হত না তখন তারা নিজ স্ত্রীকে পাঠাত অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে রাত্রি যাপন করতে। এটাকে বিশেষ ধরনের বৈধ বিয়ে বলে মনে করা হত! অনেকে নিজ স্ত্রীকে সুদর্শন কোনো যুবকের সঙ্গে শয্যা-সঙ্গী করতে দিত এই আশায় যে তাতে তারা সুদর্শন শিশুর অধিকারী হবে!

আরবরা তখন কন্যা শিশু হওয়াকে লজ্জাজনক বলে মনে করত এবং কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দিত। যারা নিজ সন্তানের সঙ্গে এমন নৃশংস আচরণ করতে পারত তারা অন্য পরিবার, প্রতিবেশী ও অন্য গোত্রের সঙ্গে কেমন আচরণ করত তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

বিশ্বনবী (সা) তাঁর শ্রেষ্ঠ চরিত্র ও রিসালাতের আহ্বানের মাধ্যমে আরব জাতির মধ্যে আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আরব নও-মুসলিমদের আগের আর পরের চরিত্রের মধ্যে পার্থক্যকে তুলনা করলে তাতে আসমান ও জমিনের মত ব্যবধান দেখা যাবে। এই আরবরাই মুসলমান হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে জখম হয়ে চরম পিপাসায় যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হত তখন কেউ তাদের পানি দিতে চাইলে সে বলত: আমার অমুক আহত ভাই সম্ভবত আরো বেশি তৃষ্ণার্ত, তাকে আগে দিন! অন্য আহত আরব মুসলমানও বলতেন একই কথা!

আর এ ধরনের ইসলামী বৈশিষ্ট্যের কারণেই এক সময় মুসলিম উম্মাহ বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। জ্ঞান-অর্জনের প্রতি ইসলাম ও মহানবীর অশেষ গুরুত্ব আরোপের কারণে বহু জ্ঞানী- গুণী, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, দার্শনিক ও মহামনীষী উপহার দিতে সক্ষম হয় মুসলমানরা। ইবনে সিনা, রাজি, আল-বিরুনি, ফারাবি, আল-আরাবি, নাসির উদ্দিন তুসি, রুমি, সাদি, হাফিজ ওমর খৈয়ামই এর দৃষ্টান্ত।

কিন্তু গত কয়েক শ বছরে মুসলমানরা নানা দুর্বলতার কারণে এবং বিশেষ করে ইসলামের শিক্ষাকে জীবনের সবক্ষেত্রে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ নানা ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। গোটা মুসলিম জাহানের বেশির ভাগ অঞ্চলই শিকার হয় পশ্চিমা উপনিবেশবাদের। ফলে ইসলাম আজও বিশ্বের ওপর তার প্রত্যাশিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কিন্তু মুসলমানরা যদি আজো ইসলাম ও কুরআনের আসল শিক্ষার পথে ফিরে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালায় তাহলে তারা সব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকে মুক্ত হয়ে আবারো সব দিকে কর্তৃত্বশালী হতে পারবে এবং গোটা মানবতাই পাবে প্রত্যাশিত সার্বিক মুক্তি ও অপার কল্যাণ।

পবিত্র কুরআনে মুসলমানদের বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহর রজ্জু শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে মুসলমানরা এক আল্লাহ, এক বিশ্বনবী (সা.), অভিন্ন কুরআন ও ইসলামের মূল নীতিগুলো মেনে নেয়া সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদীদের নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরস্পরের মধ্যে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত ঐক্য গড়ে তুলতে পারছে না। অথচ মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্য অমুসলিমদের সুদৃঢ় ঐক্য লক্ষ্যণীয়।

বিশ্বনবী (সা.) যে সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন সেখানে ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা জাতিগত পার্থক্যের কারণে কারো অধিকার বেশি বা কম ছিল না। বরং খোদাভীরুতাকেই ধরা হত শ্রেষ্ঠত্বের বা মর্যাদার মানদণ্ড। একজন নিঃস্ব কালো বর্ণের ক্রীতদাসও পেত অন্য যে কোনো মুসলমানের মত স্বাভাবিক মর্যাদা এবং খোদাভীরুতার মত যোগ্যতার বলে সে সেনাপতি বা মুয়াজ্জিন হওয়ার মত উচ্চ পদেরও অধিকারী হত। আর এগুলোই হল সব ধরনের ঐক্যের মহাসূত্র যার বাস্তবায়ন আজো মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য ও একান্তই জরুরি বিষয়।

পবিত্র কুরআন বলেছে, মুসলমানরা পরস্পরের ভাই। ইসলাম দু-জন মুসলমানের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে দেয়া এবং তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব জোরদারকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.) তাঁর সহনশীলতা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে বহু গোত্র এবং বিবদমান মুসলমানদের মধ্যে শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ফেতনাবাজদের কঠোর হাতে দমন করার শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। বিবাদমান দুই মুসলিম গ্রুপের মধ্যে যে ন্যায়বিচারপূর্ণ শান্তির আহ্বানে সাড়া দেবে না, তাকে ফেতনাবাজ হিসেবে ধরে নিতে হবে। যদি উভয় পক্ষই ফেতনা জিইয়ে রাখতে চায় তাহলে উভয় পক্ষকেই বর্জন করতে হবে এবং তাদের কাউকেই সমর্থন করা যাবে না।

বিশ্বনবী (সা.)'র এই আদর্শ অনুসারেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) বলেছেন, যারা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধাতে চায় তারা শিয়াও নয় সুন্নিও নয়, বরং তারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। তিনি শিয়া ও সুন্নি মাজহাব সমর্থনের নামে এই উভয় মাজহাবের ফেতনাবাজদের বয়কট করার উপদেশ দিয়ে গেছেন।

পবিত্র কুরআন বলেছে, মুহাম্মাদের প্রকৃত সঙ্গী বা অনুসারীরা পরস্পরের প্রতি দয়ার্দ্র এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর।

মুসলিম নেতাদের বেশিরভাগই আজ ইসলামের চেয়েও জাতীয়তাবাদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের অনেকেই মনে করেন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ইসলাম কায়েম করা সম্ভব! অধিকাংশের ঐক্যমত্যের নামে অনেক অদূরদর্শী ও ভুল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যা ছিল পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের শিক্ষার সুস্পষ্ট বিপরীত। ইসলামের সবচেয়ে নির্ভুল ব্যাখ্যাদাতা তথা বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের অনেক সদস্য তথা পবিত্র ইমামদেরকে কোণঠাসা করে বা গোপনে হত্যা করে ইসলামের আলোকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে খলিফা নামধারী একদল রাজা-বাদশাহ।

কথিত খাঁটি ইসলাম প্রচারের নামে সক্রিয় খারিজি এবং ওয়াহাবিদের মত বিভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলো সব সময় অন্যদের ওপর জোর করে তাদের মত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। যারাই এক্ষেত্রে বিরোধিতা করতে চেয়েছে তাদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়ে তারা এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নানা অঞ্চলে এবং পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট এইসব গোষ্ঠী আজো একইভাবে সেই সন্ত্রাসের রাজত্ব বিস্তারের পাঁয়তারা করছে।

অথচ বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন অন্যদের মতামতের ব্যাপারে সহনশীল। তিনি ছিলেন যুক্তি, মত-বিনিময় বা সংলাপের আদর্শ। মদীনায় যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাতে অমুসলিমদেরও পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার দেয়া হয়েছিল। নানা গোত্র ও ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে শান্তি-চুক্তির মাধ্যমে তিনি তাদের আপন করে নিয়েছিলেন। ফলে মুসলমানরা তখন অপর মুসলমানকে মনে কত করত ধর্মের ভাই আর অমুসলমানদের মনে করত আদমের সন্তান হিসেবে জ্ঞাতি ভাই। আসলে একটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু বা অমুসলমানরা যতটা নিরাপদ ও সর্বোচ্চ অধিকার পান অন্য কোনো রাষ্ট্রেই অমুসলিম বা সংখ্যালঘুরা এতটা নিরাপদ নন এবং এত বেশি মর্যাদা ও অধিকারও পান না।

বিশ্বনবী (সা.) মদীনা সনদ লঙ্ঘনের দায়ে এবং ঐক্যের চুক্তি লঙ্ঘন করে মুশরিকদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের আওতায় মুসলমানদের ক্ষতি করার বা তাদেরকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র করার কারণে মদীনার বিশ্বাসঘাতক ইহুদিদের শাস্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে যারা ছিল মুনাফিক বা বর্ণচোরা তাদের সঙ্গে বাহ্যিক সম্প্রীতির সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়েছিল মহানবী (সা.)-কে। অবশ্য এই মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ার পর তিনি তাদের কঠোর শাস্তি দিতেন। তিনি মুনাফিকদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত 'জেরার মসজিদ' নামের মসজিদ পর্যন্ত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। তাই বর্তমান যুগের মুসলিম নামধারী মুনাফিকদের ব্যাপারেও আমাদের একই ধরনের নীতি বজায় রাখতে হবে।

বিশ্বনবী (সা.)  হিজরতের পর মদীনার আনসার ও  মক্কা থেকে আসা মুহাজিরদেরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। তিনি প্রত্যেক মুহাজির ও আনসারকে  একে-অপরের জন্য ভাই বেছে নিতে বলেন এবং প্রতি একজন আনসার একজন মুহাজিরের সঙ্গে তাদের ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধনের জন্য শপথ নেন। অবশ্য বিশ্বনবী (সা.) নিজের জন্য ভাই হিসেবে বেছে নেন হযরত আলী (আ.)-কে। ইসলামী ঐক্যের এক বড় শিক্ষা রয়েছে এই ঘটনায়।  

একবার মদীনার মসজিদে নববীতে এক মজলিসে কুরাইশ বংশের একদল গণ্যমান্য মুসলমান নিজ নিজ বংশ ও গোত্রীয় আভিজাত্য নিয়ে বড়াই করছিল। সেই আসরে যখন হযরত সালমান ফার্সির কথা বলার পালা এল তখন বিশ্বনবী (সা.)'র প্রচারিত ইসলামের খাঁটি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত এই সাহাবি সবিনয়ে বলেন: 'আমার নাম সালমান। আমি আল্লাহর একজন দাসের পুত্র। আমি ছিলাম বিভ্রান্ত। মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা.)'র মাধ্যমে আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন। আমি ছিলাম দরিদ্র, আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা.)'র উসিলায় আমাকে অভাবমুক্ত করেছেন। আমি ছিলাম একজন দাস, মুহাম্মাদ (সা.)'র মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে মুক্ত করেছেন। আর এটাই হল আমার মূল শেকড় ও বংশের পরিচয়।'

এ ঘটনার পর সেখানে আসেন বিশ্বনবী (সা.)। তিনি সালমান (রা.)'র কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে বললেন: 'হে কুরাইশ! রক্তের আভিজাত্যটা আবার কি? বংশ মানে কি? কারো গর্ব করার মত বংশীয় বা ব্যক্তিত্বের দিকটি হল তার ধর্ম। কারো পৌরুষত্ব বা আভিজাত্য হল তার উন্নত স্বভাব-চরিত্র ও সৎ কাজের আধিক্য।'

এভাবে বিশ্বনবী (সা.) মিটিয়ে দিয়েছিলেন জাতিগত গরিমা বা বংশীয় ভেদাভেদের সীমারেখা। আজো কেবল ইসলামের ধর্মীয় বন্ধনই পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থিত বা দূরতম অঞ্চলে অবস্থিত মুসলমানের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির একমাত্র কার্যকর বন্ধন। একমাত্র ভ্রাতৃত্বের চেতনার কারণেই নানা অঞ্চলের এবং নানা ভাষা ও জাতিগত পরিচিতির অধিকারী মুসলমানরা পরস্পরের সুখ ও দুঃখে প্রভাবিত হয়। সুদূর আমেরিকা থেকে শুরু করে, আফ্রিকার সুদান, ইউরোপের কোসোভো বা বসনিয়া, এশিয়ার কাশ্মির, ফিলিস্তিন, মিয়ানমার কিংবা ইরান, ইরাক ও আফগানিস্তানের ভৌগলিক দূরত্ব এবং ভাষা ও বর্ণের ব্যবধান মুসলমানদের এই ঐক্য আর ভ্রাতৃত্বের পথে কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আর ইসলামী আদর্শই যদি হয় মুসলমানদের ঐক্যের মূল সূত্র তাহলে তাদের কখনও হতাশ হওয়া উচিত হবে না। কারণ, সব সংকটে সকল সড়কে ঘূর্ণাবর্তে ও বজ্রকড়কে প্রলয়-তুফানে ঝঞ্জাবর্তায় শহীদি রক্তে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.)'র আদর্শ নিয়েই আমাদেরকে আঁকতে হবে মুক্তির ছবি। মিয়ানমারসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলের নিপীড়িত মানুষরা আজও হয়তো সেই বুক-ভরা আশা নিয়েই বলেছেন:

এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,

এখানে এখন প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠেছে কেঁপে,

এখানে এখন অজস্র ধারায় উঠেছে দু' চোখ ছেপে

তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজতোরণ

বিশ্বনবী (সা)'র ওফাত-বার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আবারও গভীর শোক ও সমবেদনা এবং আল্লাহর সর্বশেষ এই নবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ আর সালাম।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/১৭

২০১৭-১১-১৭ ১৫:৫৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য