প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! রাসুলে খোদা (সা) এর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে আপনাদের প্রতি রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আল্লাহর প্রতি জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা কেননা তিনি আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন সর্বোত্তম আদর্শবান মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মাদ (সা) কে। পবিত্র কুরআনের সুরা আহযাবে বলা হয়েছে:

"আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে"

কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)।

মুহাম্মদ ( সাঃ) যদি এ পৃথিবীতে না আসতেন তাহলে জগতবাসীর কী অবস্থা হতো সে সম্পর্কে বাংলাদেশের ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন:

"তুমি না আসিলে মধুভান্ডার ধরায় কখনো হত না লুট, 

তুমি না আসিলে নার্গিস কভু খুলত না তা পর্ণপুট

বিচিত্র আশা-মুখর মাশুক খুলত না তার রুদ্ধ দিল

দিনের প্রহরী দিত না সরায়ে আবছা আঁধার কালো নিখিল"।

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! পবিত্র কুরআনের সুরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: 'হে নবী! আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতরূপে প্রেরণ করেছি।

যাঁকে এতো বড় সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরায়ে আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর ব্যবস্থাও করেছেন।

আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাও।

আসুন আমরা সেই মহান নবীর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করে আমাদের প্রিয় নবীর প্রতি জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বিশ্বনবী (সা.)’র জন্ম সমকালে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। 

রাসুল (সা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন বারো রবিউল আউয়াল সোমবারে। মতান্তরে সতেরো রবিউল আউয়ালে। জন্মের দিন ভোর বেলায় বিশ্বের সবগুলো মূর্তি মাটির দিকে নত হয়ে পড়ে। সেদিনই ইরানের রাজার বিশাল প্রাসাদের বারান্দা কেঁপে ওঠে এবং  ছাদের ১৪টি প্রাচীর ধসে পড়ে। ইরানের সভে অঞ্চলে একটি হ্রদ ছল। বহু বছর ধরে ওই হ্রদের পূজা করা হত। মহানবীর জন্মকালে ওই হ্রদটি তলিয়ে শুকিয়ে যায়। কুফা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী সামাভে অঞ্চলটি বহু বছর ধরে প্রচণ্ড খরায় শুকিয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়েছিল। নবীজীর জন্মের সময় সেখানে পানির প্রবাহ সৃষ্টি হয়। বর্তমান ইরানের শিরাজ শহর সংলগ্ন ফার্স অঞ্চলের অগ্নি উপাসনালয়ের আগুন সেই রাতে নিভে যায়। অথচ ওই আগুন এক হাজার বছর পর্যন্ত প্রজ্বলিত ছিল। ইরানি সম্রাটের প্রাসাদের খিলান আকৃতির তোরণ ভেঙ্গে যায় মাঝখান দিয়ে। ফলে তা দুই টুকরো হয়ে যায়।  

রাসুলের জন্মের রাতে হিজাজ বা বর্তমান সৌদি আরব থেকে একটি আলো দৃশ্যমান হয় এবং তা পূর্বাঞ্চলসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভোরে বিশ্বের সব সম্রাটের সিংহাসন উল্টে পড়েছিল।

সেদিন গণকদের সব জ্ঞান লুপ্ত হয় এবং যাদুকরদের যাদুগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই যে অলৌকিক সব ঘটনা সেই দৃশ্যটি কবি নজরুলের কল্পনারাজ্যে যে চিত্ররূপে ধরা দিয়েছে, তা লক্ষ্য করা যাবে তাঁর একটি গানে। চিত্রকল্পটি এরকম: একদিকে মা আমেনার কোলে মধুপূর্ণিমার চাঁদের মতো শিশু নবী দুলছেন। আর-

কূল মখ্‌লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এলো ঐ

কলেমা শাহাদাতের বাণী ঠোঁটে কে এলা ঐ

খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এলো ঐ

আকাশ-গ্রহ-তারা পড়ে লুটে, কে এলা ঐ

পড়ে দরুদ ফেরেশ্‌তা, বেহেশ্‌তে সব দুয়ার খোলে....

কবি আরও লিখেছেন:

আসিছেন হাবীবে খোদা,

আরশ পাকে তাই উঠেছে শোর,

চাঁদ পিয়াসে ছুটে' আসে আকাশ- পানে যেমন চকোর,

কোকিল যেমন গেয়ে উঠে ফাগুন আসার আভাস পেয়ে,

তেমনি করে হরষিত ফেরেশতা সব উঠলো গেয়ে:

দেখ আজ আরশে আসেন মোদের নবী কামলীওয়ালা ….

বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী (সা) এর জন্মের আগের আরব সমাজ ছিল বর্বরতা, জুলুম, নির্যাতন, ব্যভিচার ইত্যাদিতে ভরপুর। সে সময়কার সমাজকে বলা হতো "আইয়্যামে জাহেলিয়্যাত"। রাসূল এলেন। ধীরে ধীরে সেই জাহেলি সমাজকে পরিবর্তিত করে ফেললেন সোনালি সমাজে। কেবল এই পার্থিব পৃথিবীর জন্যই নয় তিনি পরকালীন জীবনের মুক্তির জন্যও আমাদের কাছে আবির্ভূত হয়েছেন। এ জন্যই তাঁকে পবিত্র কুরআনে "রাহমাতুল্লিল আলামিন" বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

তাই রাসুলে কারিম (সা) এর সীরাত অর্থাৎ তাঁর আদর্শের দিকে ফিরে যেতে হবে আমাদের। কেননা তিনিই আমাদের জন্য সবোর্ত্তম আদর্শ। এই আদর্শের কথা নবুয়্যত লাভের আগেই জনমনে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাসুল যখন পূর্ণ যৌবনে পদার্পন করেন তখন তাঁর চারিত্রিক সুষমায় মুগ্ধ ছিল সবাই। সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে একজন অসামান্য মহান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন তিনিআসলে আল্লাহ যাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে, শ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে পাঠাবেন তাঁকে সেভাবেই গড়ে তুলবেন এটাই স্বাভাবিক। এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে আমাদের জন্য। তা হলো, নবুয়ত কোনো শিক্ষা, যোগ্যতা বা অর্জনযোগ্য কোনো পদের নাম নয়। দক্ষতা, মেধা বা প্রতিভা দিয়ে নবী হওয়া যায় না। নবুয়ত সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তায়ালার মনোনয়ন। আল্লাহ তায়ালার পয়গম মানব জাতির কাছে বহন করে আনা এবং তা প্রচার প্রসার করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মধ্যে থেকে যাকে পছন্দ করেন তাকেই নবুয়তের মনোনয়ন দান করেন।

সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী রাসুলে খোদা হযরত মুহাম্মাদ (সা) কে ভালোবাসা, আল্লাহর ভালোবাসা লাভের পূর্বশর্ত। রাসুলে (সা) কে ভালোবাসার অর্থ কি? কিভাবে বুঝা যাবে অন্তরে রাসুল সা:-এর প্রেম ভালোবাসা আছে কি না? সেই প্রেম ভালোবাসার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য লাভে ধন্য হবে। এর উত্তরে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, হে নবী আপনি বলে দিন যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমাকে অনুস্মরণ কর। যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপগুলো মার্জনা করে দেন। উপরন্তু আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।

এই আয়াতের আলোকে রাসুল (সা) এর অনুকরণ অনুসরণকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর অনুকরণ অনুসরণ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে বস্তুত রাসুল (সা) এর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মুহূর্ত, এক কথায়, প্রতিটি বিষয়ের অনুকরণ অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে উম্মতের চরম সফলতা। রাসুলে খোদা (সা) পাপ পঙ্কিলতাপূর্ণ সমাজে এসে সেই সমাজকে সর্বোত্তম সমাজে পরিণত করেছিলেন যে সমাজে গোত্রে গোত্রে কলহ-বিবাদ লেগেই ছিল, সামান্য কোনো বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সংঘাত লেগে থাকতো সেই দ্বন্দ্বমুখর সমাজে রাসুল (সা) শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আল্লাহর রজ্জুকে তিনি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার কথা বলেছেন, কোনোভাবেই পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন

বিশ্বজুড়ে আজ মুসলমানদের ভেতরে অনৈক্যের বীজ রোপন করেছে বিধর্মীরা। যারা মুসলমানদের শত্রু, তারা এই বিচ্ছিন্নতা বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থই হাসিল করে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে যে অরাজকতা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে, তার সকল অর্জনই সাম্রাজ্যবাদ, ইহুদিবাদের গোলায় যাচ্ছে এই সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে নবী আমাদের ইহকাল এবং পরকালীন মুক্তির সোপান সেই নবীকে যিনি প্রেরণ করে আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন,আসুন তাঁর প্রতি জানাই আমাদের আন্তরিক ভালোবাসা

রাসুলের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করলে আল্লাহকে ভালোবাসা হয় কীরকম হতে হবে এই ভালোবাসা? হুমম তা সত্যিই ভাববার বিষয় শেখ সাদি (রহ) এর ঐতিহাসিক ঘটনাটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য শেখ সাদী (রহঃ) একটি চতুষ্পদী লিখেছিলেন:

বালাগাল উলা বি-কামালিহি

কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি

হাসুনাৎ জামিয়ু খিসালিহি

সাল্লু আলায়হে ওয়া আলিহি.....

এই দরুদের প্রথম তিন লাইন লেখার পর চতুর্থ লাইন মেলাতে পারছিলেন না কবিঅনেক সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। শেখ সাদী (রহঃ) চতুর্থ লাইন মেলাতে ব্যর্থ হন। এসময় তিনি রাসুলুল্লা­হ (সাঃ)কে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে রাসুলুল্লা­হ (সাঃ) তাঁকে এই চতুর্থ লাইনে লিখে দিতে বলেন:  সাল্লু আলায়হে ওয়া আলিহি।

এই দরুদের অর্থ হলো:

সুউচ্চ শিখরে সমাসীন  তিনি নিজ মহিমায়

তিমির-তমসা কাটিল  তার রূপের প্রভায়

সুন্দর আর সুন্দর তার স্বভাব চরিত্র  তামাম

জানাও তাঁর ও তাঁর বংশের পরে দরূদ-সালাম।

(অনুবাদ: ঈসা শাহেদী)

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! আবারও আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী আমাদের প্রিয় হাবিবের প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠিয়ে বিদায় নিচ্ছি আজকের এই মহতী আলোচনা থেকে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/২

 

২০১৭-১২-০২ ১৫:০৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য