আজ হতে ১৪১৩ চন্দ্রবছর আগে ২৬ হিজরির এই দিনে (৪ শাবান) পবিত্র মদীনায় জন্ম নিয়েছিলেন মহান কারবালা বিপ্লবের শীর্ষস্থানীয় সেনাপতি ও পতাকাবাহী নেতা হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)। ইরানসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে তাঁর পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী। এই মহামানবের জন্মদিন ইসলামী ইরানে ‘রুজই জানবজান’ বা যুদ্ধাহতদের দিবস হিসেবেও পালিত হয়।

হযরত আবুল ফজল আব্বাস বিন আলী (আলাইহিসসালাম) ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অশ্রু-ভেজা ও রক্তমাখা নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। অতি উচ্চ পর্যায়ের পৌরুষত্ব, মহানুভবতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি চরম বা একনিষ্ঠ নিরঙ্কুশ আনুগত্যের জন্য ইতিহাসে তাঁর নাম প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে চিরকাল। কারবালায় তাঁর অশেষ ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, বীরত্ব ও মহত্ত্ব হযরত আবুল ফজল আব্বাস ইবনে আলী (আ.)-কে পরিণত করেছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান প্রবাদ-পুরুষে। এই মহামানবের শুভ জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা মুবারকবাদ ও তার মহান সত্তার শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম ।

হযরত আবুল ফজল আব্বাস ছিলেন হযরত আলী (আ.)’র পুত্র ও ইমাম হুসাইন (আ.)’র সৎ ভাই। তাঁর মাতা ছিলেন ফাতিমা বিনতে হাজ্জাম তথা হযরত উম্মুল বানিন (সালামুল্লাহি আলাইহা)। নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.)’র মৃত্যুর পর এই মহীয়সী নারীকে বিয়ে করেছিলেন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)। হযরত আবুল ফজল (আ.)'র মা উম্মুল বানিন ছিলেন  বিশ্বনবী (সা.)'র  পবিত্র আহলে বাইতের জন্য উৎসর্গকৃত-প্রাণ।  অন্যদিকে মহানবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতও এই মহীয়সী নারীকে অত্যন্ত উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী বলে মনে করতেন।

মদিনায় হযরত আলী (আ.)'র স্ত্রী উম্মুল বানিনের গর্ভে জন্ম নেয়া এই মহাপুরুষ যে একদিন জগতের আলোয় পরিণত হবেন তার পূর্বাভাস পাওয়া যায় পিতার একটি বক্তব্যে। ওই বক্তব্যে এসেছে: "আমার সন্তান আব্বাস শিশু থাকা অবস্থায়ই জ্ঞান রপ্ত করত। কবুতরের ছানা যেভাবে মায়ের কাছ থেকে পানি ও খাদ্য নেয়, তেমনি আব্বাসও আমার কাছ থেকে জ্ঞান রপ্ত করত।" 

হযরত আবুল ফজল জীবনের প্রথম ১৪ বছর আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র সান্নিধ্য লাভ করেছেন। নবজাতক আবুল ফজলের কানে আযান দিয়েছিলেন তাঁর মহান পিতা আলী (আ.)। তিনি জানতেন এই শিশু ভবিষ্যতে অনন্য বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য খ্যাত হবেন। আর তাই তিনি নবজাতকের নাম রাখেন আব্বাস। এর অর্থ সাহসী ও বীর। অনেক মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন বলে তাঁকে বলা হত আবুল ফজল তথা গুণের আধার।

সৌন্দর্য ও বীরত্বের জন্য খ্যাত হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.) ছিলেন তাঁর বড় দুই সৎ ভাইয়ের চেয়ে বয়সে প্রায় দুই যুগেরও ছোট। তাঁকে বলা হত বনি হাশিমের চাঁদ। তিনি ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে শ্রদ্ধার কারণে কখনও ভাই বলে সম্বোধন করতেন না, বরং  বড় ভাইকে বলতেন-  সাইয়্যিদি বা আমার কর্তা ও ছোট ভাইকে বলতেন ‘মৌলায়ি’ বা ‘আমার নেতা’।

তিনি কারবালায় ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)’র পাশে ছিলেন অনুগত ছায়ার মত এবং পানি-নিষেধাজ্ঞার শিকার ইমাম শিবিরের জন্য পানি আনতে গিয়ে প্রথমে দুই হাত ও পরে জীবন বিসর্জন দেন। চরম তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পানের সুযোগ  পেয়েও তিনি ইমাম শিবিরের অন্য সব তৃষ্ণার্তদের আগে নিজে পানি পান করতে লজ্জা বোধ করায় সেই পানি পান করেননি।  নবী পরিবারের পিপাসার্ত শিশুদের জন্য পানি আনতে গিয়ে হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.) শত্রুর তীর বৃষ্টি উপেক্ষা করেছেন এবং বহু হামলাকারীকে জাহান্নামে পাঠিয়ে ফোরাতের সুপেয় পানি মশকে ভরতেও সক্ষম হয়েছিলেন। এ সময় কয়েকদিন ধরে পিপাসার্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি কারবালার অন্য সব তৃষ্ণার্ত সঙ্গী ও শিশুদের কষ্টের কথা স্মরণ করে এক ফোটা পানিও পান করা নিজের জন্য সমীচীন বলে মনে করেননি। ফলে পানি হাতে নিয়েও সে পানি ফেলে দেন এই মহাবীর। পানি যেন এই মহাবীরের ধৈর্যের কাছে পরাজিত ও লজ্জিত হয়েছে চিরকালের জন্য।

পানির মশক নিয়ে ইমাম শিবিরের দিকে ফিরে আসার সময় শত্রুর প্রবল বাধার শিকার হন হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)।  চারদিক থেকে ঘিরে থাকা শত্রুরা প্রথমে তাঁর এক হাত কেটে ফেলে। এ সময়ও অন্য হাত দিয়ে পানির মশক ধরে এগিয়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু আবারও তাঁর অন্য হাতটি কেটে ফেলে নরপশুরা। ফলে মুখ দিয়ে মশক ধরে এগিয়ে চলেন এই মহাবীর। অবশেষে নরপশুর দল তীর মেরে ওই মশক ফুটো করে দিলে শেষ হয়ে যায় ইমাম শিবিরে পানি পৌঁছানোর শেষ প্রচেষ্টা।

 শত্রুরা আরও তীর মেরে ও তরবারির আঘাত  হেনে শহীদ করে হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)-কে। এভাবে রক্তের ফোয়ারা বইয়ে শহীদ হন ইমাম শিবিরের পতাকাবাহী অন্যতম প্রধান সেনাপতি। শেষ পর্যন্ত নিজ শরীরে পতাকা ধরে রেখেছিলেন এই মহাবীর। 

হযরত আবুল ফজল (আ.)-কে সম্মান ও স্নেহ করতেন ভাই হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)ও। এ প্রসঙ্গে তাঁর অনেক বক্তব্য রয়েছে।  এসবের মধ্যে বিশেষভাবে আশুরার আগের দিন তথা তাসুয়ার দিনে  উচ্চারিত এই বাক্যটি  যুগে যুগে আন্দোলিত ও উদ্দীপ্ত করে আসছে মানুষকে :  হে ভাই আমার! আমার জীবন উৎসর্গ হোক তোমার জন্য, ঘোড় সাওয়ার হয়ে শত্রুর দিকে যাও। তিনি এমন সময় এ বক্তব্য দিয়েছিলেন যখন কারবালায় উমাইয়া নরপশুরা পশু-পাখীর জন্য ফোরাতের পানি ব্যবহারের সুযোগ রাখলেও নবী পরিবারকে কয়েকদিন ধরে পিপাসার্ত থাকতে বাধ্য করেছিল।

মহাকালের পাখায় চির-অম্লান নাম শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র সেনাদলের পতাকাধারী সেনাপতি হিসেবে ইতিহাসে অমর ও অম্লান হয়ে আছেন তাঁরই সৎ ভাই  হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)। মুক্তি ও স্বাধীনতাকামীদের আদর্শ নেতার পবিত্র মাজারের পাশেই রয়েছে এই মহান বীরের মাজার।  ইমামের প্রতি আনুগত্যের আদর্শ হযরত আব্বাস (আ.) বাবুল মুরাদ বা বাবুল হাওয়ায়েজ তথা মানুষের মুশকিল আসানের দরজা নামেও খ্যাত। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম তার অমর কবিতা‘মহররম’-এ এই মহান বীরকে উল্লেখ করেছেন এভাবে:

দুই হাত কাটা তবু শেরনর আব্বাস

পানি আনে মুখে হাঁকে দুশমনও 'সাব্বাস'!!

বলা হয় হযরত আবুল ফজল আব্বাস ঐতিহাসিক সিফফিন যুদ্ধেও কিছুক্ষণের জন্য অংশ নিয়েছিলেন।  সে সময় যদিও তিনি একজন কিশোর ছিলেন কিন্তু তাকে দেখতে মনে হত দীর্ঘদেহী ও শক্তিমান এক যুবক। তিনি আলী (আ.)' র নির্দেশে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে মুয়াবিয়ার বাহিনীর একদল সেনার এক শক্তিশালী হামলাকে তুলো-ধুনো করার মত উড়িয়ে দেন। মুয়াবিয়ার ওই সেনাদল খুব বিপজ্জনকভাবে হযরত আলী (আ.)'র অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছিল। ইমাম তাঁর এই কিশোর পুত্রকে বলেছিলেন, হৈ-চৈ-এর মত কিছু একটা শোনা যাচ্ছে, তাঁবুর বাইরে দিয়ে দেখোতো ঘটনা কী? ফলে আবুল ফজল তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন শত্রু সেনাদের হটিয়ে দেয়ার জন্য। এ সময় অকুতোভয় ও অচেনা এই কিশোর পাহলোয়ানের অপূর্ব সামরিক নৈপুণ্য দেখে শত্রুরা হতবাক হয়ে যায়। ইমাম আলী (আ.) নিজেই তাঁকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর এই পুত্রকে বেশিক্ষণ যুদ্ধের ময়দানে থাকতে দেননি সম্ভবত এ কারণে যে আশুরার অসম যুদ্ধের দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সহায়তা করার জন্য তাঁকে দরকার হবে।

স্বয়ং হযরত আলী (আ.) নিজের শাহাদতের সময় প্রিয় পুত্র আব্বাসকে কাছে ডেকে এনে তাঁকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেন এবং তাঁর মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, " শিগগিরই কিয়ামত বা পুনরুত্থানের দিনে আমার চোখ তোমার মাধ্যমে উজ্জ্বল হবে।"   

হযরত ইমাম জাফর আস-সাদিক হযরত আবুল ফজল (আ.)'র মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি ইমাম হুসাইন (আ.)'র প্রতি অনুগত ছিলেন, আপনি তাঁর সঠিক অবস্থানের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর এই হুজ্জাত তথা  নিজ ইমামের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন ও তাঁর কল্যাণকামী ছিলেন। আপনার এতসব কষ্ট ও ত্যাগ-তিতিক্ষার জন্য আল্লাহ আপনাকে শহীদদের মধ্যে স্থান দিয়েছেন এবং আপনার আত্মা বা মন-প্রাণকে সৌভাগ্যবান আত্মাদের সঙ্গী করেছেন।"

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) তাঁর অন্যতম পুত্র হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)-কে উন্নত আত্মার ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি একজন সুদক্ষ যোদ্ধা ও শরীরচর্চাবিদ হিসেবেও গড়ে তুলেছিলেন।

ইমাম হুসাইন (আ.)'র প্রতি আবুল ফজল আব্বাস (আ.)'র ভালবাসা ছিল সুউচ্চ ও সুবিস্তৃত পর্বতমালার মতই অবিচল এবং সাগরের মতই কুল-কিনারাহীন। হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)'র মহাবরকতময় সান্নিধ্যও ভাই আবুল ফজলকে উন্নত আত্মার ও মহান চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।

ভদ্রতা ও আদব-কায়দা রক্ষার দিকেও খুবই সচেতন ছিলেন আবুল ফজল(আ.)। তিনি ইমাম ভ্রাতৃদ্বয়ের সামনে পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে চলতেন। কখনও অনুমতি ছাড়া তাঁদের পাশে বসতেন না।

৩৪ বছরের বরকতময় জীবনের অধিকারী আবুল ফজল আব্বাস (আ.) বিয়ে করেছিলেন ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের কন্যা 'লাবাবাহ'কে। এই ঘরে জন্ম নিয়েছিল ওবায়দুল্লাহ নামে তাঁর সুযোগ্য ও প্রথম সন্তান। ইনি মক্কা ও মদিনার বিচারপতি হয়েছিলেন। তাঁর অন্য পুত্র 'ফজল' উচ্চ পর্যায়ের জ্ঞানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং  মুহাম্মাদ নামক সন্তান কারবালার জিহাদে শহীদ হন।

মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যিনি মানবজাতিকে উপহার দিয়েছেন এমন এক মহাবীর।

অশেষ সালাম ও দরুদ পেশ করছি এই মহাবীরের শানে এবং সবাইকে জানাচ্ছি আবারও মুবারকবাদ। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/২১

 

 

 

২০১৮-০৪-২১ ১৬:৩৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য