গত পয়লা জিলহজ ছিল 'হযরত আলী (আ) ও খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমার (সা.আ) শুভ বিয়ের ১৪৩৭ তম বার্ষিকী'। ইরানে এ দিবসটি পালন করা হয় পরিবার দিবস হিসেবে। এ উপলক্ষে সবাইকে অনেক সালাম ও শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি পেশ করছি বিশ্বনবী (সা) ও তার পবিত্র আহলে বাইতের শানে বিশেষ করে হযরত আলী (আ) ও ফাতিমা জাহরা (সা.আ)'র শানে অশেষ দরুদ ও সালাম।

ইসলাম ধর্ম পরিবার গঠন ও পরিবার রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে মহানবীর পরিবারের পর আলী ও ফাতিমার পরিবার হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিবার। বিশ্বনবী (সা)'র বংশধারা রক্ষাকারী এ পরিবার থেকেই জন্ম নিয়েছেন বেহেশতি যুবকদের দুই সর্দার হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (মহান আল্লাহর অশেষ দরুদ বর্ষিত হোক তাদের ওপর চিরকাল)। মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদিসহ (আ) মোট ১১ জন ইমামের জন্ম হয়েছে এই মহতী পরিবারে। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন। এরপর মহান আল্লাহর নির্দেশে গোপনে তিন বছর মানুষকে ধর্মের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন। তিন বছর পর তিনি প্রকাশ্যে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও মক্কাবাসীকে ধর্মের পথে দাওয়াত দেন। রাসূলের গোত্র বনু হাশিমের মধ্য থেকে তাঁর চাচা আবু লাহাব তাঁর বিরোধিতা করতে থাকে। আর মক্কার নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের প্রায় সবাই রাসূলের সাথে শত্রুতা শুরু করে।

এরমধ্যে রাসূলের পুত্রসন্তানরা মারা গেলে কাফির-মুশরিকরা রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে। আস ইবনে ওয়ায়েল রাসূলকে ‘আবতার’ (লেজকাটা) বা নির্বংশ বলে গালি দেয়। সে বলত, ‘আরে মুহাম্মাদের তো কোন পুত্রসন্তান নেই, সে মরে গেলে তার নাম নেয়ার কেউ থাকবে না।’ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এ কথায় খুব কষ্ট পেতেন। মহান আল্লাহ তাঁর এ কষ্ট দূর করার জন্য যে অমূল্য নেয়ামত তাঁকে দান করেন তিনিই হলেন হযরত ফাতিমা (আ.)। এর প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনের সূরা কাওসার নাযিল হয়।

আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বলেন, হযরত ফাতিমার শানে এ সূরা নাযিল হয়েছে। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, অনেক অত্যাচার সত্ত্বেও হযরত ফাতিমার বংশধারা পৃথিবীতে টিকে আছে, অন্যদিকে বনু উমাইয়্যা ধ্বংস হয়ে গেছে। পরবর্তী কালে বনু আব্বাসও রাসূলের পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল। অবশেষে তারাও ধ্বংস হয়ে গেছে। যারা রাসূলের বিরুদ্ধে কথা বলত তাদের বংশধরদের কোন খবর পৃথিবীর মানুষ জানে না, নেয় না। রাসূলের বংশধরদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সকল ধরনের চেষ্টা করেও তারা সফল হয়নি।

আবু জাহেল, আবু সুফিয়ানরা চেয়েছিল রাসূলকে হত্যা করতে। আবু সুফিয়ানের সন্তান আমীরে মুয়াবিয়া চেয়েছিল হযরত আলীকে হত্যা করতে, তার রাজত্বকালেই ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। মুয়াবিয়ার ছেলে ইয়াযীদ কারবালায় নৃশংসভাবে ইমাম হুসাইনকে সপরিবারে শহীদ করে। পরবর্তীকালে একের পর এক রাসূলের বংশধরকে হত্যা করা হয়। তারপরও যারা পুত্রসন্তান নিয়ে গর্ব বোধ করত তাদের কোন খবর আজ বিশ্ববাসী জানে না, অথচ রাসূলের বংশধারা হযরত ফাতিমার মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত বজায় থাকবে। এ বংশধারাতেই শেষ জামানায় ইমাম মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন এবং তিনি সারা বিশ্বে আল্লাহর ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। সেদিন আল্লাহ তা‘আলার সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হবে যা তিনি সূরা তওবায় বলেছেন : ‘তিনি তো সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য-ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে সেটিকে (নিজ ধর্মকে) সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন; যদিও অংশীবাদীরা তা অপছন্দ করে।’

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব নারীর সন্তানদের তাদের পুরুষদের সাথে সংযুক্ত করা হয় শুধু ফাতিমা ছাড়া। ফাতিমার সন্তানদের আমার সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে।’ আর সেজন্যই আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই যে, হযরত ফাতিমার সন্তানদের মানুষ ‘ইয়াবনা রাসূলিল্লাহ’ অর্থাৎ 'হে রাসূলের সন্তান' বলে সম্বোধন করত। 

হযরত ফাতিমার জন্মের মাধ্যমে রাসূল অপরিসীম মানসিক শান্তি অনুভব করেন। তিনি তাঁকে কতটা ভালবাসতেন তা তাঁর কথায় বারবার প্রকাশিত হয়েছে। এ ভালবাসা অকারণ ছিল না। হযরত ফাতিমার তাকওয়া, তাঁর দুনিয়াবিমুখতা, তাঁর দায়িত্বশীলতা সব মিলিয়ে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর যে অবস্থান সে কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ভালবাসতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হযরত ফাতিমা আসলে তিনি তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানাতেন। এটি কি শুধু একজন কন্যার প্রতি পিতার ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল? আলেমরা বলেছেন, কখনই নয়। কারণ, অন্য কোন সন্তানের ক্ষেত্রে রাসূল এমন কাজ করতেন না। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল বেহেশতের নারীদের নেত্রীর প্রতি মহান আল্লাহর রাসূলের সম্মান বা ভালবাসা প্রদর্শন।

হযরত ফাতিমা এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেন যখন সারা বিশ্বে নারীদের মানুষ বলে গণ্য করা হত না। তাদেরকে নানাভাবে নির্যাতন করা হত। খ্রিস্টানরা নারীকে ‘শয়তানের দোসর’ বলত এবং নারী জাতিকে সব পাপের উৎস বলে মনে করত। আরবরা কন্যা-সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাকে জীবন্ত কবর দিত।

পবিত্র কুরআনে সেই জাহেলিয়াতের যুগের কথা এভাবে বর্ণিত হয়েছে : ‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার মুখ কালো হয়ে যায়, অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে তাকে অপমান সহ্য করে থাকতে দেবে, না তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে।’ হযরত ফাতিমা সেই অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ নারী জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে নারী জাতিকে সম্মানিত করেন। পরে নিজ কন্যা ফাতিমার প্রতি দায়িত্ব পালন করেও নারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত ফাতিমার মর্যাদা সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। যেমন : তিনি বলেন, ‘চারজন নারী সমগ্র নারী জাতির মধ্যে সর্বোত্তম : মারইয়াম বিনতে ইমরান, আসিয়া বিনতে মুযাহিম, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ফাতিমা।’

রাসূল (সা.) বলেন, ‘বেহেশতে সর্বপ্রথম আমার কাছে যে পৌঁছবে সে হচ্ছে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ।’

বুখারী শরীফের একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, ‘ফাতিমা আমার অস্তিত্বের অংশ। যে তাকে রাগিয়ে দেয় সে আমাকেও রাাগিয়ে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফাতিমা কোন ব্যাপারে রাগ করলে আল্লাহও রাগ  করেন এবং ফাতিমার আনন্দে আল্লাহও হন আনন্দিত ।’
 
হযরত ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা) বেহেশতি নারীদের সর্দার তথা খাতুনে জান্নাত। তাঁর অসাধারণ নানা গুণ, অতি উচ্চ স্তরের খোদাভীতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব তথা মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসুলের (সা) কন্যা হওয়ার বিষয়টি সবাই জানতেন। তাই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলিফাসহ সাহাবিদের অনেকেই এই মহামানবীকে বিয়ে করার জন্য মহানবীর কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বনবী (সা) তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। মহানবী বলতেন, ফাতিমার ব্যাপারটি আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ ফাতিমার বিয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে সম্পন্ন হবে।

আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাসূলের কাছে গিয়ে বলেন, ‘যদি ফাতিমাকে আমার সাথে বিয়ে দেন তাহলে মূল্যবান মিশরীয় কাপড় বোঝাই এক হাজারটি উট এবং আরও এক হাজার দিনার তথা এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মোহরানা হিসাবে প্রদান করব।’ রাসূল (সা.) এ প্রস্তাবে খুব অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, ‘তুমি কি মনে করেছ আমি অর্থ ও সম্পদের গোলাম? তুমি সম্পদ ও অর্থ দিয়ে আমার সাথে বড়াই করতে চাও?’

হযরত ফাতিমার বিয়ে প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর ফেরেশতা আমার কাছে এসে বললেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, তিনি আপনার কন্যা ফাতিমাকে আসমানে আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আপনিও তাঁকে জমিনে তাঁর সাথে বিয়ে দিন। বলা হয় ৪০ হাজার ফেরেশতা ছিলেন বেহেশতে অনুষ্ঠিত এই শুভ বিয়ের সাক্ষী।

দ্বিতীয় হিজরিতেই হযরত ফাতিমার সাথে হযরত আলীর বিয়ে হয়। তাঁর বিয়ের বিষয়ে ইতিহাসে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে তাঁর মর্যাদা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীকালে বলেন, ‘আলীর জন্ম না হলে ফাতিমার সুযোগ্য স্বামী পাওয়া যেত না।’ (হযরত মারইয়ামের কোনো সুযোগ্য স্বামী সৃষ্টি করেননি মহান আল্লাহ। তাই তিনি চিরকুমারীই হয়ে আছেন) 

বিয়ের সময় হযরত ফাতিমার বয়স ছিল মাত্র দশ-এগারো বছর। অথচ ফাতিমার এ বয়সেই রাসূল বলছেন, ‘আলীর জন্ম না হলে ফাতিমার সুযোগ্য স্বামী পাওয়া যেত না।’- এ কথার মধ্যে কত বড় রহস্য লুকিয়ে ছিল তা পরবর্তীকালে প্রকাশ হয়েছে। ইসলামের জন্য হযরত আলী (আ.)-এর ত্যাগ ও অবদান কিংবদন্তীতুল্য অমর ইতিহাস হয়ে আছে। বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারসহ অন্য অনেক যুদ্ধে তাঁর অতুলনীয় বীরত্বের কথা ইতিহাসের পাতায় পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। অন্যদিকে তিনিই হলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জ্ঞানের ভাণ্ডার।

রাসুলে খোদা যখন নবুয়্যত পান, তখন কিশোর আলীই তাঁর প্রতি প্রথম ইমান আনেন। শুধু তাই নয়, নবীজিকে তিনি সবসময় ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। তাঁর বীরত্ব, জ্ঞান গরিমা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও সাহসিকতায় রাসুল (সা.) ছিলেন মুগ্ধ। আর সেজন্যই তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমাকে প্রাণপ্রিয় আলীর সাথেই বিয়ে দিয়েছিলেন।

একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও হযরত আলীর প্রশান্তির মাধ্যম হযরত ফাতিমার অবদানও অনন্য বা অতুলনীয়। তিনি রাসূলের ওফাতের পর ক্রান্তিকালে মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাঁর ভূমিকার মাধ্যমে সত্যের আলো প্রজ্বলিত করেই এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ দু’টি ভাষণ আমাদের হেদায়াতের পথনির্দেশ করে। তাই এটা স্পষ্ট কেন রাসূল সেই দশ বছরের বালিকা ও বাইশ বছরের যুবক সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন!

হযরত আলী (আ) ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য মহানবীর (সা)  কাছে আসলেও মহানবীর সামনে শ্রদ্ধার কারণে ও লজ্জায় তা বলতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় মহানবী (সা) আঁচ করতে পারেন যে আলী ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছেন। তবুও তিনি বিষয়টা তা-ই কিনা জানতে চাইলে আলী (আ) জানান যে, 'হ্যাঁ, আমি এ উদ্দেশ্যেই এসেছি'।

হযরত ফাতিমা (সা.আ) তাঁর বাবা তথা মহানবীর (সা) পর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ  আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলীর (আ) সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হবেন- এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবুও মহানবী (সা) নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধার আদর্শ তুলে ধরার জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে হযরত ফাতিমার মতামত জানতে চান। চাচাত ভাই আলীকেও তিনি জানান যে ফাতিমার মতামত জেনে আসি। মহানবী প্রিয় কন্যা ফাতিমাকে বলেন: আমি তোমাকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির স্ত্রী করতে চাই। তোমার কি মত?

[মহানবীর (সা) এ বাণী থেকে বোঝা যায় হযরত আলীর মর্যাদা ছিল হযরত ফাতিমার চেয়েও বেশি। কারণ মহানবীর (সা) পর আলী (আ) হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। অন্যদিকে তিনি বেহেশতি নারীর নেত্রীরও ইমাম বা নেতা।] 

ফাতিমা লজ্জায় মাথা নুইয়ে থাকেন এবং হ্যাঁ ও না-বোধক কিছুই না বলে চুপ করে থাকেন। এ অবস্থায় মহানবী বলেন: আল্লাহু আকবর! তাঁর নীরবতা সম্মতিরই প্রমাণ।
 
তাই এটা স্পষ্ট মেয়েদের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মত নেয়া জরুরি। জোর করে কোনো নারীকে কোনো পুরুষের কাছে বিয়ে দেয়া বৈধ নয়। অন্যদিকে ইসলামী আইন অনুযায়ী কোনো কুমারী নারী পিতা বা বৈধ অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া কোনো পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না।

দ্বিতীয় হিজরির ১ জিলহাজ্জ রোজ শুক্রবার হযরত আলীর সাথে হযরত ফাতিমার শুভ-বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ সময় হযরত আলীর বয়স ছিল প্রায় ২২ অথবা ২৩। এ বিয়ের চুক্তি চূড়ান্ত করেছিলেন মহানবী (সা) নিজেই।  এ বিয়ের অনুষ্ঠানে আনসার ও মুহাজিরদের সবাই উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মহানবী (সা:) সাহাবীদের বলেছিলেন,আল্লাহর আদেশে আমি ফাতিমার সাথে আলীর বিয়ে দিচ্ছি এবং তাদের বিয়ের মোহরানা ধার্য করেছি চারশ মিসকাল রৌপ্য। এরপর মহানবী (সা.) হযরত আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আলী তুমি কি এতে রাজী আছ? হযরত আলী সম্মতি জানিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি রাজী। তখন নবীজী দু'হাত তুলে তাঁদের জন্য এবং তাঁদের অনাগত বংশধরদের সার্বিক কল্যাণের জন্য দোয়া করেন।
 
বিয়েতে বরের পক্ষ থেকে কনেকে দেনমোহর পরিশোধ করা ফরজ। আর হযরত আলী (আ.) নিজের ঢাল বিক্রি করে তা পরিশোধ করেছিলেন। হযরত আলী তাঁর বর্মটি বিক্রি করে ৫০০ দিরহাম বা রৌপ্য মুদ্রা পেয়েছিলেন। একটি উট, একটি তরবারি ও একটি বর্ম এবং কয়েকটি খেজুরের বাগান ছাড়া হযরত আলীর কাছে আর কোনো সম্পদই ছিল না।

কোনো কোনো হাদিসে বলা হয়, হযরত ফাতিমা (সা. আ) তাঁর বিয়ের একমাত্র মোহরানা হিসেবে বিচার-দিবস তথা কিয়ামতের দিনে তাঁরই বাবার পাপী উম্মতের শাফায়াত তথা তাঁদেরকে ক্ষমা করার অধিকার চেয়েছিলেন। আর মহান আল্লাহ তাঁর এই দাবি কবুল হওয়ার কথা জানিয়ে দেন জিবরাইলের মাধ্যমে।

অথচ আজকাল মুসলমান নর-নারীর বিয়ের মোহরানা নিয়ে কত বাড়াবাড়ি হচ্ছে। মোহরানার অংক বা সম্পদ নিয়ে বস্তুগত প্রতিযোগিতা হচ্ছে!  ভাবখানা এমন যে যার বিয়ের মোহরানা যত বেশি তার মর্যাদা যেন ততই উপরের!

হযরত ফাতিমার বিয়ে উপলক্ষে নব-দম্পতির জন্য যেসব উপহার কেনা হয়েছিল মোহরানার অর্থ দিয়ে সেসব ছিল: একটি আতর, কিছু জামা-কাপড় ও কিছু গৃহস্থালি সামগ্রী। বর্ণনা থেকে জানা যায় যে মোট ১৮টি উপহার কেনা হয়েছিল: এসবের মধ্যে ছিল: চার দিরহাম দামের মাথা ঢাকার একটি বড় রুমাল বা স্কার্ফ। এক দিরহাম দামের একটি পোশাক-সামগ্রী। খেজুর পাতা ও কাঠের তৈরি একটি বিছানা। চারটি বালিশ। বালিশগুলো ছিল আজখার নামক সুগন্ধি ঘাসে ভরা। পশমের তৈরি একটি পর্দা। একটি ম্যাট বা পাপোশ। হাত দিয়ে গম পেশার একটি যাঁতাকল। খাবার পানি রাখার জন্য চামড়ার তৈরি একটি মোশক। তামার তৈরি একটি বেসিন বা হাত ধোয়ার পাত্র। দুম্বা বা উটের দুধ দোহনের জন্য একটি বড় পাত্র। সবুজ রং-করা একটি বড় মাটির পাত্র বা জগ।

ইসলামের দুই মহীয়সী নারী উম্মে আইমান ও উম্মে সালামাহ হযরত ফাতিমাকে খুব ভালবাসতেন। ফাতিমার বিয়ের সময় তাঁরা মহানবীর (সা) কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর সম্মানিত রাসুল! আজ যদি খাদিজা (সা. আ) বেঁচে থাকতেন তাহলে এ বিয়ের আয়োজনে তিনি খুবই খুশি হতেন! তাই নয়কি?

এমন একটি শুভক্ষণে ইসলামের জন্য সর্বস্ব-ত্যাগী ও সর্বপ্রথম মুসলমান বিবি খাদিজার নাম শোনা মাত্রই মহানবীর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি খাদিজার সব ত্যাগ-তিতিক্ষা ও মহানুভবতার কথা স্মরণ করতে করতে বললেন: 'খাদিজার মত একজন নারী আর কোথায় পাওয়া যাবে? সেই দিনগুলোতে যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল সে সময় কেবল খাদিজাই আমাকে সুনিশ্চিতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাঁর সব সম্পদ ও জীবন আমার হাতে ছেড়ে দিয়েছিল যাতে আল্লাহর ধর্ম ইসলাম প্রচার করা যায়। খাদিজা হচ্ছে সেই নারী যাকে এই খবর দিতে মহান আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দেন যে, বেহেশতের অতি উচ্চ বা সম্মানজনক স্থানে খাদিজার জন্য মহামূল্য সবুজ পান্নার তৈরি একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে।'

এরপর ফাতিমাকে আলীর ঘরে পাঠানোর জন্য অনুমতি চান হযরত উম্মে সালামাহ। এ অবস্থায় মহানবী বললেন, আলী নিজেই কেনো এ প্রস্তাব নিয়ে এল না আমার কাছে? লজ্জার কারণে আলী তা বলতে পারছে না বলে তিনি জানান। এ অবস্থায় মহানবী তাঁকে আসতে বললেন।  আলী (আ) মহানবীর সামনে এসে মাথা নিচু করে রাখলেন। মহানবী তাকে বললেন, তুমি কি তোমার স্ত্রীকে ঘরে নিয়ে যেতে চাও? আলী মাথা নিচু রেখেই বললেন:  জি, আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হউক। সে রাত বা তার পরের দিনই এ জন্য ব্যবস্থা করবেন বলে মহানবী জানান।

হযরত আলী জানান এ বিয়ের উৎসবের জন্য বর্ম বিক্রির অর্থ থেকে কিছু অর্থ সংরক্ষণের জন্য আলাদা করে উম্মে সালামাহ'র কাছে দেয়া হয়েছিল। মহানবী (সা) তার  থেকে দশ দিরহাম নিয়ে আমায় বলেন:  কিছু তেল, খেজুর ও 'কাশ্ক' ('কাশ্ক' হচ্ছে দুধ বা দই থেকে তৈরি করা বিশেষ খাদ্য) কিনে আন এই অর্থ দিয়ে। সেসব আনা হলে মহানবী তাঁর জামার হাতাগুলো গুটিয়ে সেগুলো মেশানো শুরু করেন নিজ হাতে। ওই তিন খাদ্যের মিশ্রণে তৈরি হল বিয়ের অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য হালুয়া জাতীয় বিশেষ মিষ্টি খাবার।

খাবার তৈরির পর মহানবী আলীকে বললেন, দাওয়াত দাও যতজনকে তুমি ইচ্ছে করছ! আলী বললেন, আমি মসজিদে গিয়ে দেখলাম সেখানে অনেক সাহাবি সমবেত রয়েছেন। আমি তাদের বললাম: মহানবীর (সা) দাওয়াত কবুল করুন। তারা রওনা দিলেন মহানবীর (সা) দিকে। আমি মহানবীকে (সা) বললাম: মেহমানের সংখ্যা তো বিপুল। তিনি বিশেষ খাবারটি ঢাকলেন একটি শিট দিয়ে এবং বললেন: তাদেরকে আসতে বল একসাথে দশ-দশ জন করে। ফলে দশ জনের এক একটি গ্রুপ এসে খেয়ে বেরিয়ে গেলে দশ জনের অন্য গ্রুপ আসছিল। এভাবে বহু মেহমান এসে খাবার খাওয়া সত্ত্বেও তা যেন মোটেও কমছিল না। সাতশত নারী-পুরুষ মহানবীর (সা) বানানো সেই বরকতময় মিষ্টি খাবার খেয়েছিলেন।

মেহমানরা সবাই চলে গেলে মহানবী (সা) আলীকে ডানে ও ফাতিমাকে নিজের বাম দিকে বসিয়ে তাঁদের জন্য দোয়া করেন। তিনি নিজের মুখ থেকে কিছু লালা বের করে তা ফাতিমা ও আলীর ওপর ছড়িয়ে দেন। এরপর আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলেন: হে আল্লাহ! তারা আমার থেকে ও আমি তাদের থেকে! হে প্রভু! আপনি যেমন আমার থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা ও কদর্যতা দূর করেছেন, তেমনি তাদের কাছ থেকেও সেসব দূর করে তাদের পবিত্র করুন। এরপর বর-কনেকে বললেন: ওঠো এবং ঘরে যাও। তোমাদের ওপর মহান আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।

বলা হয় বিয়ের দিন বা রাতে হযরত ফাতিমার কাছে এসে একজন দরিদ্র ব্যক্তি কিছু সাহায্য চাইলে তিনি তার বিয়ের পোশাক দান করে দেন ওই ব্যক্তির কাছে যাতে তা বিক্রি করে ওই ব্যক্তি কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। ফলে একটি পুরনো পোশাক পরেই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন হযরত ফাতিমা (সা.আ)। 
 
হযরত ফাতিমা ও আলীর বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই সাদামাটা। তাই হযরত উম্মে আইমান এসে মহানবীর কাছে দুঃখ করে বললেন, সেদিনও তো আনসারদের এক মেয়ের বিয়ে হল। সে অনুষ্ঠানে কত জাঁকজমক ও আনন্দ-ফুর্তি হল! অথচ বিশ্ববাসীর নেতা মহানবীর মেয়ের বিয়ে কিনা এতো সাদাসিধেভাবে হচ্ছে! এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, এ বিয়ের সাথে পৃথিবীর কোন বিয়ের তুলনাই হয় না। পৃথিবীতে এ বিয়ের কোন জাঁকজমক না হলেও আল্লাহর আদেশে আসমানে এ বিয়ে উপলক্ষে ব্যাপক জাঁকজমক হচ্ছে। বেহেশতকে অপূর্ব সাজে সাজানো হয়েছে। ফেরেশতারা, হুর-গিলমান সবাই আনন্দ করছে। বেহেশতের গাছপালা থেকে মণি-মুক্তা ঝরছে! আর সেগুলো সংগ্রহ করছেন বেহেশতের হুরিরা। কিয়ামত পর্যন্ত তারা সেগুলো সংগ্রহ করতেই থাকবেন যাতে সেগুলোর বিনিময়ে পুরস্কার পাওয়া যায়। একথা শুনে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার মুখ খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

বিয়ের পর সাংসারিক কাজের দায়িত্ব ও শ্রম-বিভাগ:

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) আলী ও ফাতিমাকে বলে দিয়েছিলেন যে বাইরের কাজগুলো করবে আলী আর ঘরোয়া (গৃহস্থালী ও মেয়েলি) কাজগুলো করবে ফাতিমা। হযরত ফাতিমা এতে খুশি হয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, এই শ্রম-বিভাজনের ফলে যেসব কাজ করতে ঘরের বাইরে যেতে হয় ও বার বার পর-পুরুষদের সামনে পড়তে হয় তা থেকে তিনি নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ) বলেছেন, হযরত আলী পানি ও জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করতেন। অন্যদিকে হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ) আটা পিষতেন ও রুটি বানাতেন।

অবশ্য ইসলাম স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতে পুরুষকে উৎসাহ দেয় যাতে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। হযরত আলীও অনেক সময় ঘরের কাজে ফাতিমাকে সাহায্য করতেন। 

ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দেয় বলে এ ধর্ম কখনও নারীকে সামাজিক ভূমিকা পালনে বিরত রাখে না। শালীনতা বজায় রেখে ও সংসারের মূল দায়িত্বগুলো পালনের পাশাপাশি নারী সামাজিক দায়িত্বও পালন করতে পারেন। মহানবীর (সা) ওফাতের পর হযরত ফাতিমাকে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ফাদাকের বাগান থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং খেলাফতের ব্যাপারেও মহানবীর (সা) নির্দেশ অমান্য করা হয় বলে হযরত ফাতিমা মসজিদে নববীতে গিয়ে হযরত আলীর নেতৃত্বের অধিকার সম্পর্কে ভাষণ দিয়েছিলেন। গৃহস্থালী ও সাংসারিক দায়িত্ব ছাড়াও সব ধরনের সামাজিক দায়িত্বও পুরোপুরি পালন করে গেছেন হযরত জাহরা (সা.আ)। তাই  হযরত আলী (আ) বলেছিলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি কখনও ফাতিমাকে অসন্তুষ্ট করিনি অথবা তাকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করিনি। অন্যদিকে ফাতিমাও আমাকে কখনও রাগিয়ে দেয়নি বা আমাকে অমান্য করেনি। বস্তুত যখনই আমি তাঁর দিকে তাকাতাম আমার অন্তর থেকে সব বেদনা বা দুঃখ দূর হয়ে যেত।' 

এই মহা-শুভদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আবারও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।    #

পার্সটুডে/এমএএইচ/১৩

ট্যাগ

২০১৮-০৮-১৩ ১৪:০৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য