ডিসেম্বর ২৫, ২০২১ ১৯:৩২ Asia/Dhaka

তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব এবং বাংলা ও ফার্সির মধ্যে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায় শীর্ষক অর্ধদিবসব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনার।

তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য একাডেমি’র যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইরানের সাবেক সংসদ স্পিকার জনাব হাদ্দাদ আদেল।

কুরআন তিলাওয়াত ও দু’দেশের জাতীয় সংগীতের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল কালাম আব্দুল মোমেনর ভিডিও বার্তা পর্দায়িত হয়। ভিডিওবার্তার শুরুতেই সেমিনারের সভাপতি জনাব হাদ্দাদ আদেলসহ উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন: "বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি বিশেষ একটি বছর। কেননা এ বছর আমরা একইসঙ্গে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি।"  পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার ভিডিওবার্তায় বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি বাঙ্গালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী অবদান এবং তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি তার সরকারের নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়ন বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ধারনা দেন। এছাড়া করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে তার সরকারের সাফল্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন ড. মোমেন। তিনি বলেন, সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে দেশে বর্তমানে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। ভিডিও বার্তার শেষ অংশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ফার্সী ভাষার আগমনের ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেন।  (তাঁর পুরো বক্তব্য ভিডিওচিত্রে দ্রষ্টব্য)

গওসোল আজম সরকার  (ডানে) হাদ্দাদ আদেল (বামে)

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভিডিওবার্তার পর সভাপতির স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য একাডেমি'র নিজস্ব সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয় সেমিনার। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তেহরানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ. এফ. এম. গওসোল আজম সরকার।

রাষ্ট্রদূত এ. এফ. এম. গওসোল আজম সরকার

বাংলাদেশের স্থপতি মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- শান্তিতে নোবেলজয়ী জুলিও কুরির বিখ্যাত এই বাণীর ভিত্তিতে প্রণীত তাঁরই পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেন, আমাদের অফিস আদালতসহ দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত  বেশিরভাগ বাংলা শব্দই ফার্সি প্রভাবিত। তিনি এক্ষেত্রে বেশ কিছু শব্দের উদাহরণ তুলে ধরেন। জনাব সরকার বলেন, কেবল ফার্সি ভাষাই নয় বরং ফার্সি সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রীতি আচারেরও ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির ওপর। এর প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তিনি তুলে ধরেন তাঁর গবেষণাধর্মী দীর্ঘ প্রবন্ধে। বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের দৃঢ়তা ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন তিনি। 

বক্তব্য রাখছেন ড. হাদ্দাদ আদেল

বালাদেশের পররাষ্টমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেনের ভিডিও বার্তা প্রচারের পর ড. হাদ্দাদ আদেল উপমহাদেশের দেশগুলোতে ফার্সি ভাষার উপস্থিতির ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন: ফার্সি ভাষা হৃদয়গুলোকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। অভিন্ন এই ভাষার ভিত্তিতে বিচিত্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যুগে যুগে ফার্সি ভাষা বিভিন্ন দেশের রাষ্টীয় ভাষা এবং দরবারি ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। আইন-আদালতের ভাষা এবং পণ্ডিত ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা এই ভাষা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

ইরানে ইসলাম আসার পর ফার্সি ভাষার ব্যবহারের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন: আরবির পর ফার্সি ছিল মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। ফার্সি ভাষা তখন উপমহাদেশের দেশগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এমনকি নেপালেও বাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল এই ভাষা। এসব দেশে ফার্সি ভাষার সাহিত্য ও বইপুস্তক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আজও আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে সাদি, রুমি এবং হাফিজের মতো ফার্সি কবিদের স্মরণে সেমিনার সিম্পোজিয়াম করা হয়। ফার্সি ভাষার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ড. আদেল।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনার

সাদি ফাউন্ডেশনেরও প্রধান ড. আদেল উপমহাদেশীয় দেশগুলোর ফার্সি শিক্ষানীতি সম্পর্কে বলেন: গত বছর ভারতীয় সংসদে একটি নয়া নীতি পাস হয়েছে। ওই নীতি অনুসারে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অপশনাল বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ফার্সি পড়তে পারবে। ভারত সরকার দশটি ভাষাকে ভারতের ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ফার্সি ওই দশটি ভাষার একটি। সাদী ফাউন্ডেশন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে উপমহাদেশে ফারসি শিক্ষার একটি বই গ্রন্থণা করেছে। "তুতি" বা তোতা পাখি নামের ওই বইয়ের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে এবং আরও তিনটি খণ্ড মুদ্রণের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সাদি ফাউন্ডেশনের প্রধান উল্লেখ করেন। এই বইটি ফার্সি ভাষা শেখানোর জন্য খুবই উপযোগী হবে বলে ড. হাদ্দাদ আদেল আশা প্রকাশ করেন।

ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য একাডেমি

সেমিনারে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে  বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্বাস ওয়ায়েজি উপমহাদেশে ফার্সি ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন: বাংলা ভাষায় ফার্সি ভাষার প্রভাব কতোটা আমি তার বাস্তব সাক্ষী। তিনি বলেন: আরবি ভাষা যেমন কোরআনের ভাষা তেমনি ফার্সি ভাষাও আধ্যাত্মিকতা বা এরফানি ভাষা। ফারসি ভাষাকে তিনি উদার ভাষা বলেও মন্তব্য করেন। আব্বাস ওয়ায়েজি আরও বলেন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফার্সি ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। 

সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ

ঢাকা চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানি চলচ্চিত্রের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন: শিল্প উপাদান ও উপকরণ ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম ক্ষেত্র। আইএসআইএল গঠনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. ওয়ায়েজি বলেন বাংলাদেশের মতো একটি শান্তিপ্রিয় দেশে ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠি কখনই স্থান পায় নি।

সেমিনারের বিভিন্ন অংশে বাংলাদেশি বহু অধ্যাপকসহ কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভিডিও বার্তাও প্রচার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কবি কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ ফরিদ আল-আলম, সাবেক সিজিএ কবি ডঃ শাহেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ফিশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক, লেখক মনিশ রায় এবং 'ভ্রমণ' ম্যাগাজিনের সম্পাদক আবু সুফিয়ান। ড. কে. এম. সাইফুল ইসলাম খান এবং ডঃ বাহাউদ্দিনের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয় সেমিনারে।

রাষ্ট্রদূত জি.এ. সরকারকে ফার্সি বিশ্বকোষ উপহার দিচ্ছেন ড. আদেল 

এছাড়াও এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে ইরানি স্কলারদের মধ্য থেকে আলোচনায় অংশ নেন ডঃ মোহাম্মদ কাজেম কাহদুয়ি, ডঃ হোসেইন আলী রাহিমি, ডঃ সুরাইয়া পানাহি, ডঃ ফারহদ দরুদগারিয়ান এবং ডঃ আহমাদ তামিমদরি। ড. হোসাইন আলি রাহিমি বলেন: বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক উন্নতি করেছে। এই অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি বিকাশের পথও সুগম হয়েছে।

ড. মুহাম্মাদ কাজেম বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন ১৯৯৪ সনে তিনি প্রথম ঢাকায় যান। ২৫ বছর পর পুনরায় ঢাকা সফরে গিয়ে তিনি হতবাক হয়ে যান বলে মন্তব্য করেন। এ সময়ের বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নই তাঁকে হতবাক করেছে। ঢাকার চেইন মার্কেটগুলো দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন বলে জানান। সেইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশে ফার্সি কবিদের কবিতা চর্চার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন।

ডঃ মোহাম্মদ কাজেম কাহদুয়ি,

ইরানের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আহমাদ কালামদদি বলেন: বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা তিনি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছেন।

অর্ধদিনের সম্মেলন শেষে ড. গোলাম-আলি হাদ্দাদ আদেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের গ্রন্থাগারের জন্য ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিশ্বকোষের একটি সেট রাষ্ট্রদূত গওসোল আজম সরকারকে উপহার দেন।

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইরানের ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী মিসেস সাদিয়া আজম, দূতালয় প্রধান ওয়ালিদ ইসলাম, কমার্শিয়াল কাউন্সেলর ড. জুলিয়া মঈন ও দূতাবাসের কর্মকর্তা মোঃ গোলাম রাব্বানীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

ট্যাগ