জানুয়ারি ২১, ২০২২ ১৪:৫০ Asia/Dhaka

বাংলাদেশে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংবিধানসম্মত একটি আইন প্রণয়নের দাবিকে সময় স্বল্পতার অজুহাতে সম্ভব নয় বলে এর আগে যুক্তি দেখালেও এখন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়া আইনের খসড়া সংসদের চলতি অধিবেশনে পাস করার প্রচেষ্টা করা হবে।

গতকাল (বৃহস্পতিবার) ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের শেষ দিনে  আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এই কথা বলেন।

আনিসুল হক বলেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে চলমান অধিবেশনে পাস করার। কিছুটা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ওপর নির্ভর করছে।’

এর আগে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

খসড়া অনুযায়ী,প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। ছয় সদস্যের এই অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাবরক্ষক ও নিরীক্ষক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।

কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটি যাদের নাম প্রস্তাব করবে তাদের মধ্য থেকে থেকে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

এসব পদের নিয়োগে কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। ওই ব্যক্তিদের কমপক্ষে ৫০ বছর বয়স হতে হবে। এ ছাড়া সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি বা বিচার বিভাগীয় পদে ওই ব্যক্তিদের কমপক্ষে ২০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

 ‘দুরভিসন্ধি দেখছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো  

নির্বাচনী আইন নিয়ে সরকারের হঠাৎ উদ্যোগের মাঝে ‘দুরভিসন্ধি’দেখতে পাচ্ছে  বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। তাদের ধারণা- সরকার তাদের সুবিধামতো নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন করতে যাচ্ছে। যে কারণে কারও সঙ্গে আলোচনা না করে ‘চুপিসারে’ আইনের খসড়া করা হয়েছে এবং ‘হঠাৎ’ বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। অথচ আইনের মাধ্যমে নতুন ইসি গঠনের জন্য সর্বমহলের দাবি ওঠার পর সরকার এত দিন ‘সময় নেই’ বলে ওই দাবি এড়িয়ে আসছিল।

বিএনপিসহ চারটি রাজনৈতিক দল মনে করে, অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠনের কাজটি এত দিন প্রশাসনিক কায়দায় হয়েছে, এখন একই কাজ আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে করবে সরকার।

গত সোমবার সকালে মন্ত্রিসভা ইসি আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়। আর রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ইসি আইনের বিষয়ে পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, মন্ত্রিসভা যে খসড়া অনুমোদন করেছে, তা ‘অনুগত ও অপদার্থ’ নির্বাচন কমিশন গঠনের চলমান প্রক্রিয়াকে দলীয় স্বার্থে আইনি রূপ দেওয়ার সরকারি অপপ্রয়াস। এর ফলাফল হবে ‘যেই লাউ, সেই কদু’।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, এই আইনে কোনো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ থাকতে পারবেন না। দুনিয়ার কোথাও এই নিয়ম নেই। সারা জীবন সরকারি আদেশ মেনে চলা যাঁদের অভ্যাস, সেই কর্মকর্তাদের নিয়ে এই কমিশন হবে। তিনি বলেন, এই সরকার ও তাদের গঠিত কোনো কমিশনের অধীন বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি মনে করে, নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের নৈতিক সামর্থ্য আছে শুধু একটি নির্বাচিত সরকারের।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর এক সদস্য মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে নির্বাচন কমিশন আইন পাস করতে যাচ্ছে সরকার।

বৃহস্পতিবার সকালে নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, সরকার কী করতে যাচ্ছে বিএনপি বোঝেনি। কিন্তু আমি বলব, বিএনপি ভালো করে বুঝেছে। আপনারা বাকশালকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন।’

বিনা ভোটে সরকার কোনো আইন পাস করতে পারে না বলে মন্তব্য করে  মির্জা আব্বাস বলেন, এই আইন দেশের  মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

'পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার নীলনকশা মাত্র'

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের কথা বলছে, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা এই আইনের প্রয়োজনীয়তা এবং ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনের দাবি জানিয়েছেন, তখন কাউকে না জানিয়ে কারও মতামত না নিয়ে চুপিসারে আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে।

এই আইন ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হবে বলে মনে করে বাসদ। দলটি সরকারের ‘অনৈতিক’ কৌশলের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পুনরায় কীভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়, এটি তারই নীলনকশা মাত্র।

ছেলে ভোলানো সান্ত্বনা পুরস্কার

প্রস্তাবিত ইসি আইনকে বিষয়ে ছেলেভোলানো ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। গতকাল এক বিবৃতিতে দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, প্রস্তাবিত আইন অতীতের নীলনকশার সার্চ কমিটিকে আইনগত বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। সৎ, দক্ষ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক ইসি গঠনে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে প্যানেল তৈরির লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই, গণবিজ্ঞপ্তি এবং গণশুনানির যে ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটাই সরকার বিবেচনায় নেয়নি।

নতুন সংকট সৃষ্টি করবে: ইসলামি আন্দোলন

এদিকে, চরমোনাই পীরের দল ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, সরকারে প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করে বলেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের তোয়াক্কা না করে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। দলের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের ব্যবস্থা রেখে এবং সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

হতাশা ব্যক্ত করেছে টিআইবি

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রধানসহ কমিশনার নিয়োগে সরকার আকস্মিক যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাকে ইতিবাচক বললেও প্রস্তাবিত আইনে নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সুপারিশ আমলে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি না করায় হতাশা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটি বলেছে, ওই নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার যে মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে গড়পড়তা সাধারণ কিছু মানদণ্ডের বাইরে তাঁদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। এর ফলে এই আইনের পেছনে যে সাংবিধানিক চেতনা অন্তর্নিহিত এবং একে নিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা তা পূরণ হবে না।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে গতকাল (বৃহস্পতিবার) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করছি, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর সাংবিধানিক অতিগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এমন একটি আইন যেনতেনভাবে পাসের একটি প্রক্রিয়া চলছে; যেখানে বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজ এবং অংশীজনদের পক্ষ থেকে দেওয়া সুপারিশমালার বেশির ভাগই আমলে নেওয়া হয়নি।

নির্ভরযোগ্য অনানুষ্ঠানিক সূত্রে প্রাপ্ত খসড়াটিতে বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা নির্ধারণে যে তিনটি ধারা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে তাঁদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, সৎসাহস ও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়ায় নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির কোনো বিধানও রাখা হয়নি। এমনকি অযোগ্যতা নির্ধারণে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে দুই বছরের কম যেকোনো মেয়াদে ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলেও কমিশনার হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে! এ ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে তাঁদের দলনিরপেক্ষতা তথা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা ঋণখেলাপী ও দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি নিরূপণ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই! এমনকি গুরুতর অসংগতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের অপসারণেও সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই, যা হতাশাজনক।’#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ