জানুয়ারি ২৫, ২০২২ ১২:১০ Asia/Dhaka

গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের দায়ে বাংলাদেশের আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন- র‍্যাবকে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে না নেওয়ার জন্য ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যে চিঠি দিয়েছে, এতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

আজ (মঙ্গলবার) বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু লোক দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাদের দেশের প্রতি কোনো মমত্ববোধ নেই। তবে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো লাভ হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

১২ সংস্থার চিঠি যাচাই করছে জাতিসংঘ

ওদিকে, শান্তিরক্ষা মিশনে র‍্যাবকেকে নিষিদ্ধ করতে ১২ শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠনের চিঠি প্রসঙ্গে জাতিসংঘ জানিয়েছে, তারা চিঠিটি দেখেছে, পড়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফ্রিংয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং র‍্যাবের নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে উত্থাপিত দুইজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্থোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডোজারিক  এমন মন্তব্য করেন। তিনি  জানান, মানবাধিকার বিষয়টিকে জাতিসংঘ সবচাইতে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের দায়ে জাতিসংঘ মিশনে র‍্যাবের ওপর  নিষেধাজ্ঞার যে দাবি উঠেছে পিসকিপিং ডিপার্টমেন্ট তা অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে  যাচাই করবে বলেও উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিবের এ মুখপাত্র।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে চিঠি

এবার মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার, র‍্যাব এবং পুলিশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলকে চিঠি দিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির সদস্য স্টেফানেক ইভান।

স্লোভাকিয়ার এমপি স্টেফানেক ইভান গত ২০ জানুয়ারি এ চিঠিতে বাংলাদেশে আইনের শাসন না থাকা, বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলোর উল্লেখ করে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করেছেন।

আজ গণমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মানবাধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে।

সম্প্রতি র‍্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কথা তুলে ধরে স্টেফানেক ইভান লিখেছেন, অনেক বছর ধরে র‍্যাবের বিরুদ্ধে বার বার নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সিনেট পরিষদ।

তাছড়া, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের অমানবিক আচরণ নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট করেছে। এর মধ্যে আছে নির্বাচনের ফল জালিয়াতি করা অথবা রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনপীড়ন করা। বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্নীতি রয়েছে। আর পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। দুর্ভাগ্যজনক হলো- আরেকটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। তা হলো বাংলাদেশি বহু নাগরিক নিখোঁজের তথ্য। এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। 

ইভান স্টেফানেক

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এই সদস্য উল্লেখ করেছেন, এর আগে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে মুক্তভাবে কথা বলার স্বাধীনতার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছে। অনলাইনে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধী বানানো হয়েছে এবং লঙ্ঘন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন।

এক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটসের বিবৃতি উদ্ধৃত করে স্টেফানেক ইভান উল্লেখ করেছেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ১১৩৪ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় নির্যাতনকে।

স্টেফানেক ইভান বলেছেন, ২০২৬ সালের মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশের তকমা থেকে উন্নতি ঘটবে বাংলাদেশের। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশকে পিছনে ফেলছে এ দেশটি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, দেশটির এই উন্নতির সঙ্গে চিহ্নিত হয়ে আছে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতি। বেদনার সঙ্গে আমাকে বলতেই হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল সরকারে  আসার পর থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দমন করা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যম আতঙ্কে রয়েছে।  রাজনৈতিক বিরোধীদের অপমান করা হচ্ছে। ফলে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। আর এ জন্যই আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে।

'যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ৫৬৭ জনের নাম '

এদিকে, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ-জানিপপ চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ র‍্যাবের কর্মকর্তাদর  ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বার্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় পুলিশ এবং র‍্যাবর  ৭ জনের নাম জানা গেলেও এই তালিকায় সর্বমোট ৫৬৭ জনের নাম রয়েছে। তিনি বলেন, এই সংখ্যাটি এখানেই যে সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই সংখ্যা ৩ হাজার বা এর থেকেও বেশি হতে পারে। 

আজ ঢাকায় প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেছেন, বছর দু’য়েক পরে দেশে জাতীয় নির্বাচন। আসলে নির্বাচনের ময়দান সমতল করার অংশ হিসেবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।   

তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারা লবিষ্ট নিয়োগ না করে এঙ্গেজড হতে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার মনে হয় সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের চেষ্টা করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু হবে না। আমাদের উচিত হবে নিজেদের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সেইভাবে সমাধানের দিকে যাওয়া।#

এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) বাদ দিতে চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক ১২টি মানবাধিকার সংগঠন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-সহ ওই ১২টি মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যাঁ পিয়েরে ল্যাকরোইক্সকে এই চিঠি দেয়। র‌্যাবের হাতে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়কে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। এই বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ