মে ২২, ২০২২ ১৭:৪৮ Asia/Dhaka

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে প্রবর্তিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের (ডিএসএ) বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং নাগরিক সমাজের চলমান প্রতিবাদের মুখে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ আইনটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে নমনীয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

শনিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষে (বিআইসিসি) গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) ও পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এই নির্দেশনা দেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, “এখানে আপনারা যারা পিপি ও জিপি মহোদয়রা আছেন তাদের কাছে অনুরোধ যে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে যদি কোনো মামলা হয়, তাহলে দয়া করে আপনারা আগে খুঁজে বের করুন যে ,ওইটা আদৌ ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা হয় কি না। যদি না হয় তাহলে আপনারা সেইভাবে পদক্ষেপ নিবেন।” তবে  আইনমন্ত্রী এ  আইনটি বাতিলের দাবী গ্রহণযোগ্য বলে মানতে রাজী নন।

দেশের সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি ও উদ্বেগের মধ্যে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইনটি কার্যকর করার পর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এর অপপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আবশ্যক বলে দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।

এ প্রসঙ্গে গতকালও আইনমন্ত্রী বলেছেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য করা হয় নাই। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে কিছু সমস্যারও সৃষ্টি হয়েছে। এই সমস্যা হচ্ছে সাইবার ক্রাইম। আমাদেরকে এই সাইবার ক্রাইমও মোকাবেলা করতে হবে।

তবে,  আইনটির সমালোচকগণ বলছেন, এটি একটি ড্রাকোনিয়ান আইন, অর্থাৎ অত্যন্ত কঠোর আইন। এই আইনে এমন কিছু ধারা আছে, যা খুব অস্পষ্ট। আইনটিতে পুলিশকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি যাকে খুশি তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে  সরকার বা তার তল্পিবাহক যে কেউ মামলা করে দিতে পারে এবং পুলিশ তাৎক্ষনিকভাবে গ্রেপ্তার করতে পারে! সংগত কারণেই দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বুদ্ধিজীবী-সমাজ, প্রযুক্তিমনা তরুণ নেটিজেনসহ সমাজের ব্যাপক অংশ অত্যন্ত সোচ্চার কণ্ঠেই আইনটির বিরোধিতা করে আসছে। আইনটির বাতিল চেয়ে গত প্রায় পাঁচ বছর ধরেই বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ প্রতিবাদে মুখর।

এ আইনের বাতিল চেয়ে সচরাচর যে যুক্তি দেখান হচ্ছে তা হলোঃ আইনটি নিবর্তনমূলক, ‘মুক্তবুদ্ধির’ চর্চার পরিপন্থী এবং বাংলাদেশে ‘বাক্‌স্বাধীনতার’ পরিসরকে সংকুচিত করছে। অনেকের বিশ্লেষণে আইনটির উদ্দেশ্যই একটা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ উৎপাদন করা, যাতে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সরকারের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে বা অভিযোগ তুলতে বা সমালোচনা করতে ভয় পায়। আইনটিতে সরকারের সমালোচনা আর রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনাকে এক করে দেখা হয় বলেও কেউ কেউ মত দিয়েছেন। এর ফলে সরকারের সমালোচনাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ কাতারে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, কেবল গত বছরেই এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার বা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন ৭৫ জন সাংবাদিক। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে এই আইনে সাইবার ট্রাইবুনালে ১৯৯টি মামলা হয়েছে। আইনটির সবচেয়ে ঘৃণ্য দিক হলো, এখানে মানহানিকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যা তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার বা জামিন এড়াতে খুব কম সুযোগই দেয়।

কত মামলা

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দী লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশে এ আইন নিয়ে বিতর্ক এবং সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ এ আইন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়রানির এবং অপব্যহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসবের মধ্যেই প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। গত মাসে (২৩ এপ্রিল) রাজধানীতে আয়োজিত ‘অন্তহীন দুঃস্বপ্ন-বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-২০১৮’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে মুখ্য আলোচক হিসবে অংশ নিয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখক আলী রীয়াজ, জানান, এ আইনে প্রতি মাসে গড়ে ৩৪টি মামলায় ৮৬ জনের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 তিনি জানান, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৮৯০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২ হাজার ২৪৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৪২ জনকে আটক করা হয়।লেখক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এই আইনে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকেরা সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে এই আইনের শিকার হচ্ছেন ছাত্র ও ব্যবসায়ীরা। এই আইনে এখন পর্যন্ত ১০৮টি মামলায় ২০৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত এবং আটক ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় সাংবাদিকদের সংখ্যা বেশি। রাজধানীর বাইরে যারা সাংবাদিকতা করছেন, এই আইন তাঁদের জন্য একটি বড় রকমের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

এসব মামলা প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, যারা এই মামলাগুলো করছেন, তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারদলীয় রাজনীতিবিদের সংখ্যাই বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা মোট ১৫৪টি মামলা করেছেন। এগুলো কোনো না কোনোভাবে সরকারের অনুমোদন বা ইঙ্গিত পেয়েই করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এ ছাড়া সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন ব্যক্তিগত মামলা হয়েছে ২০৬টি।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/বাবুল আখতার/২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

 

ট্যাগ