জুন ১৭, ২০২২ ১৫:২২ Asia/Dhaka

বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের সিলেট নগরীসহ কয়েকটি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি  অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে  ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মানুষ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন নগরীসহ পাঁচ উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। আড়াইশ বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ।

আজ (শুক্রবার) কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বেশিরভাগ এলাকাই পানিতে তলিয়ে গেছে। জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলারও বিস্তীর্ণ এলাকাও পানিবন্দি। পানি বাড়ছে সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, জকিগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলায়। নগরীর অনেক এলাকা এখন পানির নিচে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং সিলেট পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

সারি নদীর পানি বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার উপরে রয়েছে। পানির উচ্চতা বেড়েছে কুশিয়ারা ও লোভা নদীরও। কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপরে বইছে।

সেনাবাহিনী মোতায়েন

বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করায় বানভাসি মানুষকে উদ্ধারে কাজ শুরু করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আজ দুপুরে সিলেটের ১৭ পদাতিক ডিভিশনের হেডকোয়ার্টারে এ নিয়ে ব্রিফিং করেন ডিভিশন প্রধান মেজর জেনারেল হামিদুল হক। তিনি জানান, সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রথমে গিয়ে উদ্ধার কাজ চালাবে। এরপর খাদ্য সহায়তা দেবে। প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবাও প্রদান করা হবে। পাশাপাশি কুমারগাঁও বিদ্যুৎ স্টেশন, সুনামগঞ্জের খাদ্য গুদামগুলো কীভাবে বন্যা থেকে রক্ষা করা যায় সে ব্যাপারে মাঠে থাকা সেনা সদস্যরা কাজ করবেন।

সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, আশ্রয় কেন্দ্র আরো বাড়াতে বাসা কিংবা সরকারী স্থাপনা খোঁজা হচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ চলছে।

সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি

সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত থেকে পানি তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তাঘাট, দোকানপাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এদিকে, বাসা-বাড়িতে অনেক মানুষ কোমরপানি, গলাপানি পর্যন্ত বন্দি থাকার পর আজ শুক্রবার ভোরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বের হয়ে পড়ে। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে অনেকে। তবে, কোনোমতে আশ্রয়ের জায়গা পেলেও চরম খাদ্য ও পানি সংকটে পড়েছে অনেক মানুষ। এমন সংকটের পরেও প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা না পেয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

সুনামগঞ্জে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আপাতত মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আহ্বান করা হয়েছে।

জামেয়া মারকাজুলউলূম বর্মা উত্তর-রামনগর-বাণীপুর সুনামগঞ্জ-এর বর্তমান অবস্থা

অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা অব্যাহত পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী নদীর পানি বাড়ায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা সদরের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে যায়।

উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সদর, উলিপুর ফুলবাড়ী, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলার অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। চর ও দ্বীপচরগুলো প্লাবিত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার নয় সেন্টিমিটার, দুধকুমারের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার নয় সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

১২ নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে: পাউবো

এদিকে, দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

আজ শুক্রবার পাউবো'র বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশের ১২টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো-তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার, দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার, ধরলা নদী কুড়িগ্রাম পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদী চিলমারী পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার, সুরমা নদী কানাইঘাট পয়েন্টে ১০৮ সেন্টিমিটার, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১২০ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার, সোমেশ্বরী নদী কমলাকান্দা পয়েন্টে ৫৬ সেন্টিমিটার, সারিগোয়াইন নদী সারিঘাট পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার, পুরাতন সুরমা নদী দেরাই পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার, যাদুকাটা নদী লরেরগড় পয়েন্টে ১৫৪ সেন্টিমিটার এবং ভুগাই নদী নাকুয়াগাও পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত

সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ১৯ জুন থেকে এসব পরীক্ষা শুরু হবার কথা ছিল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার আজ শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ সব পরীক্ষা শুরুর পরিবর্তিত তারিখ পরে জানানো হবে।

এর আগে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের কারণে ২৫ জুনের পরীক্ষা একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে এখন বন্যার কারণে সব পরীক্ষাই স্থগিত হয়ে গেল।

এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন সারা দেশের ২৯ হাজার ৫১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ২০ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ জন শিক্ষার্থীর  এসএসসি, দাখিল এবং এসএসসি (ভকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গত বছরের চেয়ে প্রায় সোয়া দুই লাখ পরীক্ষার্থী কমেছে।

ওদিকে, করোনা পরিস্থিতিতে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান বিঘ্নিত হবার কারণে এবার মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সময় তিন ঘণ্টা থেকে কমিয়ে দুই ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নপত্রের এমসিকিউ অংশের জন্য ২০ মিনিট এবং সৃজনশীল অংশের জন্য ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বরাদ্ধ রাখা হয়েছে।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

 

 

ট্যাগ