জুন ২২, ২০২২ ১৯:১০ Asia/Dhaka
  • উজানি ঢলে লণ্ডভণ্ড সিলেটের সীমান্ত উপজেলা! 

উজানের প্রবল ঢলে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে সিলেটের  সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো। আসামের প্রবল বন্যার পানি নামছে বরাক দিয়ে। এর সাথে যোগ হয়েছে রাতের বৃষ্টি ।

ফলে গত রাত থেকে কুশিয়ারা নদীর তীব্র স্রোত দুকুল ছাপিয়ে বাণের পানি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে।  এতে অন্তত ৭ লাখ মানুষ নতুন করে পানি-বন্দি হয়ে পড়েছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহু এলাকায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের  কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- বরাক দিয়ে আসা পানিতে তলিয়ে গেছে সীমান্তবর্তী ছ’টি  উপজেলা। কানাইঘাট ও সিলেটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর ঢল নামার কারণে কুশিয়ারা নদীর অমলসীদ, শ্যাওলা, ফেঞ্চুগঞ্জ, শেরপুর পয়েন্টে বিপদসীমার এক থেকে দেড় মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ভাটির এলাকা সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ থাকার কারণে পানি নিচের দিকে নামছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,  গতকাল রাতভর হাজার হাজার মানুষ জকিগঞ্জের কুশিয়ারা তীরবর্তী এলাকায় রাত-জেগে বাঁধ পাহারা দিয়েছেন। কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে তীব্র বেগে পানি ঢুকছে। কোথা কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে। এতে করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জকিগঞ্জের পৌর কাউন্সিলর রিপন আহমদ জানিয়েছেন- এতো প্রবল বেগে ঢল জকিগঞ্জের মানুষ আগে কখনো দেখেননি। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে। প্রায় ৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে জায়গা হচ্ছে না মানুষে। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। 

জকিগঞ্জের ভাটির এলাকা বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার শতাধিক গ্রামে শ্যাওলা নদী  দিয়ে তীব্র বেগে পানি ঢুকছে। ফলে  দুটি উপজেলায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানি-বন্দি হয়ে পড়েছেন। অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে মানুষ। নদী ও তীরবর্তী এলাকায় ঢল অব্যাহত থাকার কারণে অনেক এলাকায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব নয়। ঢলের কারণে উদ্ধার কাজও  ব্যাহত হচ্ছে। 

ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দুই উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ পানি-বন্দি। বিভিন্ন স্থানে নদী উপচে ঢুকছে বানের পানি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বহু এলাকায়। সিলেটের সঙ্গে বালাগঞ্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানি বেড়ে  দুটি উপজেলার অন্তত ৯০ ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ সদরে বুক সমান পানি। 

ওসমানীনগরে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানি-বন্দি। সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ অবস্থা সাদিপুর, পশ্চিম পৈলনপুর, উসমানপুর, গোয়ালাবাজার, খাদিমপুর এলাকার। স্থানীয় জাকির হোসেন জানিয়েছেন- ওসমানীনগরের উপজেলার সদরের সঙ্গে প্রায় সব এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন ইউনিয়নের রাস্তার উপর সাঁতার পানি। উদ্ধার কাজে নৌকাও পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষজন টিনের চালে, মাচাংয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে ওসমানীনগরে। পানির কারণে হাওর এলাকার চিত্র জানা যাচ্ছে না। 

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সারাদিন সিলেটের আকাশ অনেকটা পরিষ্কার থাকলেও গতকাল দিবাগত রাত তিনটার পর থেকে আজ বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত সিলেটে বৃষ্টি হয়েছে। 

সিলেট নগরে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতি গত বুধবার থেকে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে নগরসহ আশপাশের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য স্বজনদের বাসাবাড়িতে অবস্থান করেন।

স্থানীয় সাংবাদিকরা  জানিয়েছেন, সিলেট  নগরের তালতলা, মির্জাজাঙ্গাল, লামাবাজার, কুয়ারপাড়, লালাদীঘির পাড়, শিবগঞ্জ, তেররতন, শাহজালাল উপশহর এলাকায় পানি আগের অবস্থানে রয়েছে। বন্যাকবলিত নগরের বাসিন্দাদের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে। নগরের শাহজালাল উপশহর এলাকায় পানি কিছুটা নামলেও সেখানে নৌকা চলাচল করছে। 

সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের অভ্যন্তরে সিটি কর্পোরেশনের ৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোতে প্রায় ৭ হাজার বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পানি সরবরাহ করার পাম্পগুলো বন্যার পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পানি সরবরাহ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পানি সরবরাহের ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকের মাধ্যমে নগরের বাসিন্দাদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া চাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

টানা ভারি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সিলেটে চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে সেখানে আরও বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগের অনেক জায়গায়ও বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় (৫১ থেকে ৭৫ শতাংশ স্থানে) এবং রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় (২৬ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানে) অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়ার সঙ্গে প্রবল বিজলি চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে।

কুলাউড়ার রেললাইনে বন্যার পানি 

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল ইউনিয়নের ফানাই ব্রিজের এলাকায়  প্রায় ২০০ মিটার  রেললাইনে বন্যার পানি উঠেছে। ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে রেললাইন। সোমবার বিকেল থেকে কুলাউড়া শহরতলী এলাকার আশপাশেও কয়েকটি স্থানে পানি উঠতে শুরু করেছে।  
কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার হরিপদ সরকার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গত  ৩ দিন ধরে ওই স্থানটিতে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন  রেল লাইনের ১ ইঞ্চি উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির স্রোত কম থাকায় এখনো গতি কমিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। তবে স্রোত বাড়লে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা যাবে কিনা তা আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। তাদের পরামর্শনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত কয়েক দিনের পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি কারণে ইতোমধ্যেই  কুলাউড়া থেকে সমশেরনগর ও কুলাউড়া থেকে মাইজগাঁও পর্যন্ত গতি কমিয়ে ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের হাওর  এলাকার  পানি এখন  ভাটির  টানে  কিশোরগঞ্জের দিকে আসছে, ফলে সেখানকার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যায় ডুবতে শুরু করেছে। তবে ওই পানি আগামী দু–এক দিনের মধ্যে নেমে যেতে পারে। 

পানি বাড়ছে মধ্যাঞ্চলে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ভারতের আসামে বৃষ্টি কমতে শুরু করেছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যার পানি স্থিতিশীল আছে। তবে  গঙ্গার উজানে বৃষ্টি বাড়ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি যমুনা হয়ে পদ্মায় এসে পড়ছে। এ ভাবে দুই দিক থেকে আসা পানি পদ্মায় এসে পড়ায় রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরের নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। আগামী কয়েক দিন পদ্মার পারের জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। উজানে বৃষ্টি চলবে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে। 

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ১০৯টি পয়েন্টের মধ্যে ৬৮টিতে পানি বাড়ছে। আর ৩৪টিতে পানি কমতে শুরু করেছে। ১৮টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি

ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে রয়েছে। ফুলগাজীতে বন্যার কারণে উপজেলার ৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণী-কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পরশুরামে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশ নিয়ে প্রবেশ করা পানি গ্রাম থেকে নামতে শুরু করলেও নিচু এলাকায় মানুষ এখনও পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নুরুল ইসলাম জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফুলগাজীতে বন্যার কারণে উপজেলার ৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণী-কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। স্কুল আঙ্গিনায় পানি নেমে গেলে শ্রেণী-কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে। 
এদিকে পরশুরামে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে শফিকুর রহমান (৪৫) নামের এক বাহরাইন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চিথলিয়া ইউনিয়নে পশ্চিম অলকা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। শফিকুর রহমান গত ১০ জুন ছুটিতে বাহরাইন থেকে দেশে এসেছিলেন।#

পার্সটুডে/এআরকে/ এমএএইচ/ ২২

ট্যাগ