জুলাই ০৪, ২০২২ ২০:১৭ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা ঠিক হবে না কারণ এতে ক্রটি আছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, বিশিষ্ট লেখক ও পর্যালোচক অব.ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি আরও বলেছেন, বড় দল নির্বাচনে অংশ না নিলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশিষ্ট এই পর্যালোচক বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সর্বসম্মত না হলে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও প্রযোজনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

২১ জুন নির্বাচন কমিশন দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় ১৩ টি দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কিন্তু বিএনপিসহ ৫ টি রাজনৈতিক দল ইসির ডাকে সাড়া দেয় নি। ৮ টি দলকে নিয়ে ইসি বৈঠক করেছে।

ইভিএমে জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গ

এ প্রসঙ্গে বলে রাখছি-ইভিএম নিয়ে ইতোমধ্যে দেশ সেরা প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করে মতামত নিয়েছে ইসি। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় নির্বাচন কমিশন। তবে তার আগে সবার মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। আর ইসির হাতে বর্তমানে ১ লাখ ৫৪ হাজার ইভিএম রয়েছে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ আসনে ভোট করা যাবে। ৩০০ আসনে এই ভোটযন্ত্র ব্যবহার করতে হলে আরও তিন লাখের মতো মেশিনের প্রয়োজন। তো আমরা এবার সাক্ষাৎকারে যাব। জনাব ড. এম সাখাওয়াত হোসেন রেডিও তেহরানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

রেডিও তেহরান: জনাব ড. এম সাখাওয়াত হোসেন,  বাংলাদেশে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম যাচাইয়ের জন্য নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় ১৩ দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে ইসির আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি বিএনপিসহ ৫ রাজনৈতিক দল। এরইমধ্যে কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোট হয়ে গেল। তো কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কেবলমাত্র ইভিএম নিয়ে আলোচনা হয় নি; সার্বিকভাবে আলোচনা হয়েছে। তারমধ্যে ইভিএম একটি প্রসঙ্গ ছিল। ইভিএম নিয়ে আমার মত হচ্ছে- জিনিষটি খারাপ না কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের জন্য জটিল একটি বিষয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোট দিতে বেশ দেরি হয়। দ্বিতীয় যে সমস্যাটির কথা বলব সেটি হচ্ছে- এটি অডিট করা সম্ভব না। কাজেই ইভিএমে যে ভোট হয় তাতে চ্যালেঞ্জ করার কোনো উপায় নেই। ইভিএমে যদি জালিয়াতিও হয় সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। যেমনটি আমরা কুমিল্লাতে দেখলাম। সেখানে ভোট হলো-রায় হলো। কিন্তু সেখাতে জালিয়াতির যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়টি নিয়ে চ্যালেঞ্জ হলেও কিভাবে সেটা ধরবে তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। কারণ অডিটের বিষয়টি না থাকলে এই চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব না। ইভিএমে যে রেজাল্ট দেয়া হবে সেটাকেই মানতে হবে।  এটি অত্যন্ত ধীরগতি সম্পন্ন। বেশ সময় লাগে ইভিএমে। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করাটা ঠিক হবে না। এর ক্রটি বিচ্যুতি ঠিক না করা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন

রেডিও তেহরান:  ইভিএম যাচাইয়ের প্রথম সভায় ১৩ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ১০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৯টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেয়। তো এ বিষযে আপনি কি বলবেন?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, যদি কোনো একটি বিষয়ে সর্ব সম্মতি না হয় তাহলে সেটিকে ব্যবহার করা ঠিক না। যদি সর্ব সম্মতি না হয় অথচ নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র তার সুবিধা দেখবে এরকম তো হয় না। নির্বাচন হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনের প্রধান স্টেক  হোল্ডার হচ্ছে রাজনৈতিক দল। যদি বড় রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য দল ইভিএম না চায় তাহলে সেটি হতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে আরো আলোচনা হতে পারে। আমি আগেই বললাম ইভিএমের বেশ কিছু ক্রুটি আছে। সেগুলো সমাধান না করা পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এতে টেকনিক্যাল সমস্যা রয়ে গেছে। তারপরও যদি ইভিএমে জোর করে ভোট করাতে চায় তাহলে তো নির্বাচন নিয়ে কথা উঠবেই।

রেডিও তেহরান: জনাব, ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, রাজনৈতিক দলগুলোই ইভিএম চায় না। তারপরও কেন ইভিএম-এ নির্বাচন করার বিষয়ে বেশ তোড়জোড় দেখা যায়?

নির্বাচন ( ফাইল ফটো)

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, নির্বাচন কমিশন কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না যদি রাজনৈতিক দলগুলো না চায়। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনা করার মানে কি? কতগুলো বিষয় আছে নির্বাচনের ক্ষেত্রে যা এককভাবে চাপাতে পারে না নির্বাচন কমিশন। তারা আইন বা বিধি করতে পারে কিন্তু নির্বাচনি প্রক্রিয়া তো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। চাপাচাপি করে বা জোর করে এটা করা যায় না। যদি এসব বিষয় নিয়ে জোর করা হয় তাহলে বড় ধরণের বিতর্কের জন্ম দেবে।

শ্রোতাবন্ধুরা! আপনারা ইসির সাথে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিকদলগুলোর বৈঠক সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের সাক্ষাৎকার শুনছেন। ফিরছি খুব শিগগিরি। আমাদের সাথেই থাকুন।

রেডিও তেহরান: মিউজিক বিরতির পর আবারও ফিরে এলাম সাক্ষাৎকারে। জনাব ড, এম সাখাওয়াত হোসেন,  নির্বাচন কমিশনের এই সভায় বিএনপির যোগ না দেয়ার একটি কারণ হচ্ছে- তারা এই কমিশনকে নিরপেক্ষ মনে করে না। আর নির্বাচন তো রাজনৈতিক দলেগুলোকে নিয়েই। সেখানে বিএনপির মতো একটি দলের নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে এখন যদি তারা নির্বাচনে অংশ না নেয়  তাহলে আগামী নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হবে?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন:  না, সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। সেই নির্বাচন সার্বজনীন হবে না, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বড় দল নির্বাচনের বাইরে থাকলে সে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না। এর আগেও দেখা গেছে এধরনের নির্বাচন সঠিক হয় নি। আবার বড় দল নির্বাচনে আসলেও যদি নির্বাচন সঠিক না হয়, কারচুপি হয় তাহলে কে  নির্বাচনে আসলো কি আসলো না সেটি বড় কথা নয়। নির্বাচন নির্ভর করবে সরকার কীভাবে নির্বাচনটা করাবে তার ওপর। বলা হচ্ছে সংবিধানে যেভাবে আছে সেভাবে নির্বাচন হবে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়। তবে সব দল নির্বাচনে না আসলে সেই নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য এবং সার্বিক বলা যায় না।

রেডিও তেহরান: নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্প্রতি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেলো। কতটা গহণযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম হলো নতুন এই কমিশন?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: কুমিল্লার নির্বাচন ভালোই হয়েছে। কিন্তু শেষের দিকে এসে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন সৃষ্টি করেছে। যদি চ্যালেঞ্জ করে কেউ তাহলে বিষয়টি কোটে যাবে। কোট যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই হবে। কিন্তু সার্বিকভাবে কুমিল্লা নির্বাচন ভালো হয়েছে। রেজাল্ট দেয়ার সময় একটা সন্দেহ ঢুকে আছে।

তো অব.ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ইভিএম যাচাই বাছাই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের অংশ না নেয়া এবং নির্বাচনের অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৪

ট্যাগ