সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২ ১৮:৫৬ Asia/Dhaka
  • 'বাংলাদেশের নদী সবচেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত, এটা একটা ট্র্যাজেডি'

আজ উদযাপন করা হচ্ছে ‘বিশ্ব নদী দিবস’। বাংলাদেশে দিবসটির গুরুত্ব হচ্ছে- নদীকে দখল ও দুষণ মুক্ত করে প্রকৃতি ও জনসাধারণে অবাধ ব্যবহারের সু্যোগ করে দেওয়া এবং নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা।  

এ প্রসঙ্গে 'পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন' পবা'র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান রেডিও তেহরানকে বলেন, পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলনে ফলে দেশে একটি জাতীয় নদী  কমিশন গঠন করা হয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান নন-নদী বিশেষ করে বড় শহরগুলোর চারিদিকের নদ-নদী দখলদার এবং দুষণকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে,  দখল-দুষণ মুক্ত করতে বেশ কিছু অভিযানও চালানো হয়েছে। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালত থেকেও ইতিবাচক নির্দেশনা পাওয়া গেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।  

২০১৯ সালে ঢাকার চারপাশের নদীর দখলদার উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। ওই সময়ে নদীর জমিতে গড়ে ওঠা বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এসব কার্যক্রম চালিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা কুড়ায় নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ। সম্প্রতি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, বরিশাল, আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নওয়াপাড়া ও ঘোড়াশাল নদীবন্দর এলাকায় ১২ হাজার ২৪৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে ৩৮৯ দশমিক ৬২ একর নদীর তীরভূমি উদ্ধার করা হয়। এসব এলাকায় ৬ হাজার ২২২টি সীমানা চিহ্নিতকারী পিলার বসানো হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ-এর বন্দর বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান পরিচালনা এখন বন্ধ রয়েছে। ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই সময়ে এক হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা  হয় ও ৩১ একর জমি উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গত ২২ ও ২৩ জুন মোহাম্মদপুরের বছিলা ও আশপাশ এলাকায় বিক্ষিপ্ত অভিযান চালায় ঢাকা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ নদীবন্দর এলাকার অনেক অংশে দখলদাররা ফিরে এসেছে।

নদীর সীমানা নির্ধারণে ঢাকার চারপাশের নদীতে ৭ হাজার ৫৬২টি পিলার স্থাপনের কথা থাকলেও এ পর্যন্ত বসানো হয়েছে ৬ হাজার ২২২টি। যদিও এসব পিলার স্থাপন নিয়েও রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ-এর ৩৭টি নদীবন্দর রয়েছে। সাতটি বাদে বাকি ৩০ নদীবন্দর এলাকায় অবৈধ দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়নি। এছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধ ও নাব্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সও অকার্যকর হয়ে আছে। ওই টাস্কফোর্সে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মেয়র, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদপ্তরের প্রধানরা সদস্য হিসবে রয়েছেন। জানা যায়, নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে প্রধান করে টাস্কফোর্স গঠনের পর থেকে মাত্র দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে এ টাস্কফোর্স মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টাস্কফোর্সের কোনো সভা ডাকা হয় না।

দখল হয়ে যাচ্ছে নদী 

এদিকে, আজ গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে নদীকে সবচেয়ে বেশি আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর এদেশেই নদী সবচেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত। এটা একটা ট্র্যাজেডি। কারণ আইন বাস্তবায়ন করা হয় না। আইন বাস্তবায়ন হলে তো নদীর এ অবস্থা হতে পারে না। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখেছি, আইন মানা হয় না; আইন প্রয়োগ হয় না।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন,  নদী দখল ও দূষণ রোধে সততা এবং সাহসের সঙ্গে কাজ করা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শাস্তি দিলে কীভাবে নদী রক্ষা হবে? বিআইডব্লিউটিএ তো নিজেই অনেক জায়গায় অবৈধভাবে বালু ফেলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বহু জায়গায় নদীতে বাঁধ দিয়ে মেরে ফেলেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ছোট নদীকে টুকরো টুকরো করে জলমহাল বানিয়ে মাছ চাষ করছে। নদীগুলো মারা যাচ্ছে। ছোট নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। দখল-দূষণের পরও বড় নদীগুলো নিজেরাই নিজেদের বাঁচিয়ে রাখছে। মানুষের নির্লজ্জ উদাসীনতায় ছোট ছোট নদী মরে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নদীদূষণ করা যে অপরাধ এটা অনেকে জানেও না- এটাও বাস্তবতা। কিছু লোক আছে, ইচ্ছাকৃতভাবে নদী দখল করে শিল্প-কারখানা করছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে কমপক্ষে ছয় মাসের জেল সঙ্গে জরিমানাও। কিন্তু জেল তো দেওয়া হয় না।

তিনি হতাশার সাথে জানান, কমিশনের লোকবল মাত্র ৪২ জন। ৫ কোটি টাকার মতো বাজেট। আমাদের কোনো নৌযান নেই। আমাদের তো নদীতে যেতে হবে, আমি বা আমার সহকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে বাল্কহেডের মধ্যে ট্রলারে চেপে যাই। আইনে আছে প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করবে, কিন্তু করে না। কমিশন মূলত সুপারিশ করে। এটাকে অনেকে বিশেষ করে এনজিওগুলো দুর্বলতা ভাবে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পদ খালি নেই, সেখানে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় না। এ অবস্থায় কমিশনের কার্যক্রম মূলত সেভাবে এনফোর্সমেন্টে যায় না।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ