২০১৯-০৪-২৮ ১৯:২০ বাংলাদেশ সময়

বাংলাদেশের নাগরিকদের নিজ দেশে গুম হয়ে যাবার ঘটনা এখন একটি  নিত্যদিনের আতঙ্ক এবং দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বামী, সন্তান বা আপন ভাই গুম হয়ে যাবার অসংখ্য ঘটনার শিকার পরিবারগুলোতে কান্না আর আহাজারি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘গুম ও গণতন্ত্রের অব্যাহত সংকট’ শীর্ষক আলোচনায় অনুষ্ঠানে গুম হওয়া নাগরিকদের স্বজনদের আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে মিলনায়তনের পরিবেশ। 

এসব পরিবারের গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তির পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী সন্তান বছরের পর বছর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাদের স্বজনকে। আর বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা বা আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে গণমাধ্যমের সামনে তাদের অশ্রু বিসর্জন করছেন। করুণ আকুতি জানিয়ে যাচ্ছেন তাদের স্বজনকে ফেরত পাবার।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য আনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত দশ বছরে ৬,৬৬০ জন নাগরিক গুম হয়েছেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হচ্ছে এসব গুমের সাথে তারা জড়িত নয়। কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেছেন, সরকার কোনোপ্রকার বিচারবহির্ভূত হত্যাও করে না।   

এর আগে অনুরূপ এক অনুষ্ঠানে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একটি স্বাধীন দেশে এভাবে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা চলতে পারে না।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, এদেশে এসব গুম ও হত্যার বিচান না হলে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইবেন।

এদিকে, গতকাল প্রেস ক্লাবে উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিকরা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, গুমের বিচার অবশ্যই একদিন হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তারা আরো বলেছেন, গুমের ঘটনায় থানা পুলিশ কিংবা র‍্যাব যদি অভিযোগ গ্রহণ না করেন তাহলে বুঝতে হবে তারাই এর সাথে জড়িত।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন, দেশের গুম আর খুনের সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সরাসরি জড়িত। অথচ সরকার এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করছে। এই সরকার মিথ্যার উপর ভর করে চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

গুম হওয়া ব্যক্তিতে ফিরে পেতে চায় স্বজনরা

তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকা নিয়ে সেই জনগণের সঙ্গেই হাসিঠাট্টা করছে প্রশাসনের লোকজন। গুম হওয়া সদস্যের পরিবারের লোকজন যদি থানায় গিয়ে জিডি বা মামলা করতে চান, কিংবা র‍্যাবের খাতায় অভিযোগ দিতে চান আর সেখানে র‍্যাব বা পুলিশ যদি অভিযোগ না দিয়ে উল্টো হয়রানি করেন তাহলে বুঝতে হবে এসবের সাথে তারাই জড়িত।

আনু মুহাম্মদ আরো বলেন, সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে উচ্চ পদের প্রত্যেকেই গুম খুন নিয়ে অব্যাহতভাবে মিথ্যাচার করছে। গুম পরিবারের অনেক সদস্য অভিযোগ করেছেন, র‍্যাবের পোশাক পড়েই তুলে নিয়ে পরে গুম করা হচ্ছে। এর জবাবে যদিও র‍্যাব বলছে, কালো পোশাক নাকি গুলিস্তানেও পাওয়া যায়। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই কালো পোশাকের বিক্রেতাকে র‍্যাব ধরছে না কেন?

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানেও ড. শাহদীন মালিক দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, দিনক্ষণ বলতে পারছি না, তবে প্রতিটি গুম খুনের বিচার এদেশে অবশ্যই একদিন হবে। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট জেল হত্যা আর ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যদি ৪০/৪৫ বছর পরে হতে পারে তাহলে গত কয়েক বছরে যেভাবে গুম আর বিচারবহির্ভুত হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার বিচারও একদিন হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

শাহদীন মালিক বলেন, ১৯৭১ সালেও অনেকে গুম হয়েছেন। কিন্তু সেই গুমের সাথে জড়িত ছিল পাকিস্তানি আর্মি। কিন্তু এখন একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিকরা গুম হবেন এটা মেনে নেয়া যায় না।

দীর্ঘ সাত বছর আগে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদী লুনা অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামীকে ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার সাথে স্রেফ নাটক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি অনেকবারই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মঞ্চে গিয়ে আমার স্বামীর সন্ধান চেয়েছি। আশা করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী যেহেতু আমাকে কথা দিয়েছেন হয়তো আমার স্বামীকে আমি ফেরত পাব। কিন্তু পরবর্তীতে মনে হয়েছে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) স্রেফ একটি নাটক করেছেন।

ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদী বলেন, সারা দেশে এখন গুম যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। দেশে তো অনেক রকম দিবসই আছে। তাই এবার একটি গুম দিবসও ঘোষণা করা হোক। 

গুমকে জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি গুমেরই বিচার হবে। আর যতদিন না আমরা আমরাদের স্বজনদের ফেরত পাচ্ছি ততদিন অন্তত বিচারের দাবিতে হলেও এভাবে আমাদের কণ্ঠকে উচ্চকিত করেই দাবি জানিয়ে যাব।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বনানী থেকে গুম হন বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি ইলিয়াস আলী।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৮

 

ট্যাগ

মন্তব্য