আগস্ট ১৪, ২০২২ ১৯:১৬ Asia/Dhaka
  • ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ভোটাধিকার না দেওয়ার প্রস্তাব, বিশ্লেষকের প্রতিক্রিয়া

ভারতে প্রস্তাবিত হিন্দু রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান তৈরি করেছে ধর্ম সংসদ। বারাণসীতে ৩০ জন বিশিষ্ট সাধু ও পণ্ডিতের একটি দল হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম খসড়া তৈরি করেছেন। হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধানের খসড়ায় ভারতে বসবাসকারী মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ভোটাধিকার না দেওয়াসহ অনেক নয়া নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত ধর্ম সংসদে এটি প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার ও দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ধর্ম সংসদে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয়টি স্থিমিত না হওয়ার মধ্যে এবার প্রস্তাবিত হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধানের খসড়া প্রকাশ্যে এলো।

এ প্রসঙ্গে আজ (রোববার) দৈনিক ‘আপনজন’ পত্রিকার সম্পাদক জাইদুল হক, রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘আগামী বৎসর অর্থাৎ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গম শহরে প্রয়াগরাজ ধর্ম সংসদে নতুন যে সংবিধানের খসড়া প্রস্তাব রাখা হচ্ছে তা সত্যিই উদ্বেগের! ভারতীয় সংবিধান যে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আদর্শ বহন করে চলেছে, এই ধরনের উদ্যোগ তাকে কুঠারাঘাত করবে। এই ধরনের প্রচেষ্টার শুরু হয়েছে দেশের মসনদে বিজেপি সরকার আসার পর থেকে। এর ফলে বোঝা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ যে হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছিল তা বাস্তবায়নের এটি একটি চক্রান্ত ব্যতীত অন্য কিছু নয়। দেশের বর্তমান সরকার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই দেশের শহর ও ঐতিহাসিক স্থানের যেসব নাম মুসলিম সম্পর্কিত ছিল সেগুলো পরিবর্তন করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল তারা কোন পথে এগোচ্ছে। সেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ করার জন্যই সংবিধান পাল্টানোর ছক কষা হচ্ছে।’  

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে ভারতীয় সংবিধানের যে ঐতিহ্য রয়েছে, বৈচিত্রের মধ্যে যে ঐক্যর বার্তা রয়েছে তা নষ্ট করে ভারতের সম্মান ভূলুণ্ঠিত করার জন্যই এই প্রয়াস। হরিদ্বার ধর্ম সংসদের সাধু আনন্দ স্বরূপ যে খসড়া সংবিধান তৈরি করেছেন তা বাস্তবায়িত হলে ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের আর কোনও বাঁচার অধিকার থাকবে না। দেশের স্বাধীনতার ৭৫ বছর বর্ষ পূর্তির সময় তাই সংবিধান পাল্টানোর যে কোনও ধরনের প্রয়াস অবশ্যই দেশের জন্য যে বিপদ তাতে সন্দেহ নেই’ বলেও মন্তব্য করেন ‘আপনজন’ পত্রিকার সম্পাদক জাইদুল হক। 

মাঘ মেলায় ৩২ পৃষ্ঠার খসড়া উপস্থাপন করা হবে 

২০২৩ সালে উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজের সঙ্গম শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ধর্ম সংসদে হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধানের ৩২ পৃষ্ঠার খসড়া উপস্থাপন করা হবে। প্রথম খসড়ায় শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, ভোটদান ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। 

বারাণসী হবে রাজধানী, হবে ধর্ম সংসদ    

হিন্দুত্ববাদীদের প্রস্তাবিত সংবিধান অনুযায়ী, দেশের রাজধানী হিসেবে নয়াদিল্লির পরিবর্তে হবে বারাণসী। কাশীতে (বারাণসী) 'ধর্ম সংসদ' করারও প্রস্তাব রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিশেষ বিষয় হল- মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ভোটাধিকার দেওয়া হবে না বলেও একটি প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক নাগরিককে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং কৃষিকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হবে।

প্রয়াগরাজে পাস হয়েছিল প্রস্তাব

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ভারতকে 'হিন্দু রাষ্ট্র' করার জন্য প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত ধর্ম সংসদে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়েছিল এবং একটি সংবিধানের ধারণা এসেছিল। সে অনুযায়ী সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। খসড়া প্রণয়নে অবদান রেখেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের ত্রিশজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। 

খসড়া সংবিধান কমিটির পৃষ্ঠপোষকরা

খসড়া সংবিধান কমিটির পৃষ্ঠপোষক হলেন শঙ্করাচার্য পরিষদের সভাপতি স্বামী আনন্দ স্বরূপ,  কামেশ্বর উপাধ্যায়,  সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট বিএন রেড্ডি, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ আনন্দ বর্ধন, সনাতন ধর্মের পণ্ডিত চন্দ্রমণি মিশ্র,  ড. বিদ্যা সাগর প্রমুখ। 

সংবিধানের কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে  স্বামী আনন্দ স্বরূপ বলেন, এটি একটি নির্বাহী ব্যবস্থা হবে যেখানে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈন সকলেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার পাবে। রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রত্যেকটি বর্ণের মানুষের সুবিধা ও নিরাপত্তা থাকবে। 

মুসলিম ও খ্রিস্টানরা ভোট দিতে পারবে না

স্বামী আনন্দ স্বরূপ বলেন, মুসলমান ও খ্রিস্টানরা ভোটাধিকার ছাড়া সাধারণ নাগরিকের সব অধিকার পাবে। ব্যবসা করা, চাকরি, শিক্ষা এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য উপলব্ধ সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য তারা দেশে স্বাগত, তবে তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হবে না বলেও সাফ জানান স্বামী আনন্দ স্বরূপ।

হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধান হবে ৭৫০ পৃষ্ঠার

স্বামী আনন্দ স্বরূপ বলেন, হিন্দু রাষ্ট্রের সংবিধান হবে ৭৫০  পৃষ্ঠার। এবং এর খসড়াটি এখন ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হবে। সেখানে ধর্মীয় পণ্ডিত, বিদ্বান, ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক হবে। এর ভিত্তিতে, সংবিধানের অর্ধেক ২০২৩ সালে প্রকাশ করা হবে প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিতব্য মাঘ মেলায়, যে জন্য ধর্ম সংসদের আয়োজন করা হবে।    

ইতোপূর্বে হরিদ্বারে অনুষ্ঠিত ‘ধর্ম সংসদ’ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছিল। ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়া ইয়েতি নরসিংহানন্দ গিরিসহ অনেক সাধু-সন্ত মুসলমানদের বিরুদ্ধে খুব উত্তেজক ও আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছিলেন। ওই ইস্যুতে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগ জানানো হয়। সাবেক তিন সেনাপ্রধানসহ ১০০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে বিষয়টি আমলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, আমলা ও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব শামিল ছিলেন।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/এমবিএ/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

  

   

 

ট্যাগ